প্রাণ ছাড়া পৃথিবী কি বাসযোগ্য থাকবে
চোখ বন্ধ করে একটা অদ্ভুত দৃশ্য কল্পনা করুন তো! ধরুন, কোনো এক জাদুবলে এই মুহূর্তেই পৃথিবীর বুক থেকে সমস্ত প্রাণ মুছে ফেলা হলো। মানুষ, পশুপাখি, ঘাসের ডগা থেকে শুরু করে সমুদ্রের অতলে ভাসতে থাকা আণুবীক্ষণিক ব্যাকটেরিয়াসহ সবকিছু! এমন একটি নিষ্প্রাণ পৃথিবীতে কি আদৌ প্রাণের বেঁচে থাকার মতো পরিবেশ অবশিষ্ট থাকবে? এই একটি সাধারণ কিন্তু গভীর প্রশ্নই গ্রহবিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে।
উত্তরটা শুনলে আপনি হয়তো চমকে যাবেন! হ্যাঁ, পৃথিবীতে কোনো প্রাণ না থাকলেও এটি পুরোপুরি বাসযোগ্যই থাকত! আর এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি আমাদের সৌরজগতের বাইরে ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধান করার পুরো হিসাবনিকাশই পাল্টে দিয়েছে।
সমস্যাটা খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব কিন্তু তার নিজের কিছু স্পষ্ট প্রমাণ রেখে যায়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ আমাদের বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন। আমরা জানি, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের প্রায় সমস্ত অক্সিজেনই আসে গাছপালা বা অণুজীবের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। অর্থাৎ, পৃথিবীতে যদি কোনো প্রাণ না থাকত, তবে আমাদের বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ থাকত একেবারেই নগণ্য।
সম্প্রতি একদল গবেষক একটি নিষ্প্রাণ পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত ও বিস্তারিত কম্পিউটার মডেল তৈরি করেছেন। তাঁরা দেখতে চেয়েছেন, জীববিজ্ঞানের কোনো রকম হস্তক্ষেপ ছাড়াই গত সাড়ে ৪০০ কোটি বছরে আমাদের গ্রহটি কীভাবে বিবর্তিত হতো।
পৃথিবীতে যদি কোনো প্রাণ না থাকত, তবে আমাদের বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ থাকত একেবারেই নগণ্য।
তাঁরা এই মডেলে পৃথিবীর ভেতরের অংশের ধীরে ধীরে শীতল হওয়া, আগ্নেয়গিরি থেকে গ্যাস নির্গমন, ধীরে ধীরে বায়ুমণ্ডল তৈরি হওয়া, কার্বন চক্র এবং এমনকি একটি মহাসাগরে ঢাকা গ্রহে সূর্যের আলো কীভাবে প্রতিফলিত হয়, সবকিছুই নিখুঁতভাবে সিমুলেট করেছেন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, এই মডেলটি কোনো জীবন্ত প্রাণীর সাহায্য ছাড়াই শিল্পবিপ্লবের আগের পৃথিবীর ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপ হুবহু মিলিয়ে দিয়েছে! যেমন, তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলের উপাদান এবং সমুদ্রের রসায়ন ইত্যাদি।
এই আবিষ্কারটি আসলে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? এর কারণ লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়। নাসার হ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ডস অবজারভেটরি নামে একটি স্পেস টেলিস্কোপ তৈরির কাজ চলছে। এটি হবে এমন একটি অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ, যা প্রথমবারের মতো সূর্যের মতো নক্ষত্রগুলোকে প্রদক্ষিণ করা পাথুরে গ্রহগুলোর সরাসরি ছবি তুলতে পারবে।
এই টেলিস্কোপ যখন কোটি কোটি মাইল দূরের ওই গ্রহগুলোর আলো সংগ্রহ করবে, তখন বিজ্ঞানীরা সেই আলো বিশ্লেষণ করে বায়ুমণ্ডলে প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজার চেষ্টা করবেন। কিন্তু এই কাজটা নিখুঁতভাবে করতে হলে বিজ্ঞানীদের আগে ঠিকঠাক জানতে হবে, একটি বাসযোগ্য অথচ নিষ্প্রাণ গ্রহ দেখতে ঠিক কেমন হয়! নিষ্প্রাণ গ্রহের আসল চেহারা জানা থাকলেই কেবল তাঁরা সেটিকে কোনো প্রাণবন্ত গ্রহের সঙ্গে আলাদা করতে পারবেন।
গবেষক দলটি দূরের কোনো টেলিস্কোপ থেকে একটি নিষ্প্রাণ পৃথিবীকে দেখতে কেমন লাগবে, তার একটি কৃত্রিম বর্ণালি তৈরি করেছেন। ভবিষ্যতে এইচডব্লিউও টেলিস্কোপ যখন মহাকাশ থেকে তথ্য পাঠাবে, তখন বিজ্ঞানীদের কাছে এটি একটি দারুণ রেফারেন্স পয়েন্ট বা মানদণ্ড হিসেবে কাজ করবে।
পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার পেছনে প্রাণের কোনো হাত নেই! প্রাণ নিজে পৃথিবীকে বাসযোগ্য বানায়নি, বরং সে মহাকাশে একটি প্রস্তুত করা স্থান পেয়েছে এবং সেখানেই নিজের বসতি গড়ে তুলেছে।
এই গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিকটি হলো, এটি বাসযোগ্যতা সম্পর্কে আমাদের এত দিনের প্রচলিত ধারণাকে বড়সড় একটা ধাক্কা দিয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে নিয়েছিলাম, পৃথিবীর পরিবেশকে স্থিতিশীল এবং বাসযোগ্য রাখার পেছনে এখানকার জটিল প্রাণীব্যবস্থার একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু নতুন এই কম্পিউটার মডেল সেই ধারণাকে বাতিল করে দিচ্ছে। মডেলটি প্রমাণ করেছে, জীববিজ্ঞানের কোনো সাহায্য ছাড়াই কেবল ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ওপর ভর করে একটি গ্রহ শত শত কোটি বছর ধরে তার ভূপৃষ্ঠের আরামদায়ক তাপমাত্রা এবং তরল পানি ধরে রাখতে পারে।
অর্থাৎ, পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার পেছনে প্রাণের কোনো হাত নেই! প্রাণ নিজে পৃথিবীকে বাসযোগ্য বানায়নি, বরং সে মহাকাশে একটি প্রস্তুত করা স্থান পেয়েছে এবং সেখানেই নিজের বসতি গড়ে তুলেছে।
এই যুগান্তকারী আবিষ্কার আমাদের সামনে এক রোমাঞ্চকর সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। কোনো গ্রহকে বাসযোগ্য রাখার জন্য যদি সেখানে আগে থেকেই প্রাণের অস্তিত্ব থাকার প্রয়োজন না হয়, তবে মহাবিশ্বে আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক, অনেক বেশি বাসযোগ্য গ্রহ থাকার কথা! মহাবিশ্বের ওই ঘুটঘুটে অন্ধকারের ভেতর হয়তো এমন অসংখ্য গ্রহ লুকিয়ে আছে, যাদের শান্ত মহাসাগরগুলো এখনো শুকিয়ে যায়নি। সেগুলোর তাপমাত্রা হয়তো প্রাণের জন্য একদম উপযোগী। সেই অদেখা ভিনগ্রহগুলো হয়তো অনন্তকাল ধরে শুধু আমাদেরই অপেক্ষায় আছে, কবে আমরা তাদের খুঁজে বের করব!