ফাঁকা জায়গায় আটকে আছে পৃথিবী!

পৃথিবী হয়তো সুবিশাল এক মহাজাগতিক শূন্যস্থানের মাঝে আটকে আছে। তবে এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বরং এটি হতে পারে মহাবিশ্বের বয়স এবং এর সম্প্রসারণের হার বোঝার মূল চাবিকাঠি। সাম্প্রতিক এক মহাজাগতিক গবেষণা একটি বিতর্কিত তত্ত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে। এই তত্ত্বের দাবি, আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি একটি বড় শূন্য অঞ্চলের কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থিত। গবেষণাটি রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির জাতীয় সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়। সেখানে বলা হয়, বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের উৎপত্তিকালীন শব্দতরঙ্গ এই তত্ত্বের পক্ষে প্রমাণ সরবরাহ করছে। প্রাচীন সেই শব্দতরঙ্গ, যা আজও মহাবিশ্বে ছাপ রেখে গেছে। এটা ইঙ্গিত দেয় যে আমরা হয়তো এক বিশাল শূন্য অঞ্চলের মধ্যে বসবাস করছি। এটি ব্যাখ্যা করতে পারে, কেন আমাদের চারপাশের অনেক নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক দ্রুতগতিতে দূরে সরে যাচ্ছে।

১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে যে মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছিল, সেটিকে যতটা শব্দময় মনে হয়, বাস্তবে তা ততটা ছিল না। কিন্তু এই বিস্ফোরণের ফলে আদিম মহাবিশ্বে একধরনের শব্দতরঙ্গ তৈরি হয়েছিল। তা পরে মহাবিশ্ব ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জমে যায় বা থেমে যায়। আজ তা মহাজাগতিক গবেষণায় খুব গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শুরুর দিকে মহাবিশ্ব ছিল উত্তপ্ত ও ঘন প্লাজমায় পূর্ণ। সেখানে থাকা ঘন পদার্থের পকেটগুলো আশপাশের কণাগুলোকে আকর্ষণ করত। ফোটন কণার সৃষ্ট চাপ এবং মহাকর্ষ বলের টানাপোড়েনের ফলে কণাগুলো দুলত এবং ব্যারিওন অ্যাকুস্টিক অসিলেশন বা বিএও নামে পরিচিত একধরনের তরঙ্গ তৈরি করত।

আরও পড়ুন
শুরুর দিকে মহাবিশ্ব ছিল উত্তপ্ত ও ঘন প্লাজমায় পূর্ণ। সেখানে থাকা ঘন পদার্থের পকেটগুলো আশপাশের কণাগুলোকে আকর্ষণ করত।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইন্দ্রনীল বণিক বলেন, এই শব্দতরঙ্গগুলো খুব অল্প সময়ের জন্যই ভ্রমণ করেছিল। এরপর মহাবিশ্ব যথেষ্ট ঠান্ডা হয়ে নিরপেক্ষ পরমাণু তৈরি হলে সেগুলো জমে যায়। এগুলো যেন একধরনের আদর্শ স্কেল, যার কৌণিক আকার ব্যবহার করে আমরা মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের ইতিহাস পরিমাপ করতে পারি।

এই বিএও তরঙ্গগুলো হাবল টেনশন নামে এক জটিল মহাজাগতিক সমস্যার সমাধানে সহায়ক হতে পারে। হাবল টেনশন বলতে মূলত মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার নির্ধারণের দুটি ভিন্ন পদ্ধতির ফলাফলের মধ্যকার ফারাককে বোঝায়। আদিম মহাবিশ্বের পটভূমি বিকিরণ বা কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড (সিএমবি) পরিমাপ আমাদের ধীরগতির সম্প্রসারণের কথা বলে, অথচ আধুনিক মহাবিশ্বের পরিমাপ দেখায় দ্রুত সম্প্রসারণ। এই ফারাক থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, কেন আধুনিক মহাবিশ্ব এত দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটাচ্ছে?

এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে, আমাদের গ্যালাক্সি বিশাল শূন্য অঞ্চলের কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থান করছে। গবেষক ইন্দ্রনীল বণিকের ভাষায়, যেহেতু এই ফাঁকা অঞ্চলটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে, তাই এর কেন্দ্র থেকে বস্তুগুলোর বাইরের দিকে ছুটে যাওয়ার গতি অনেক বেশি বলে মনে হবে। এই কারণেই স্থানীয় সম্প্রসারণের হারকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বলে মনে হয়।

আরও পড়ুন
হাবল টেনশন বলতে মূলত মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার নির্ধারণের দুটি ভিন্ন পদ্ধতির ফলাফলের মধ্যকার ফারাককে বোঝায়।

এই তত্ত্বটি সঠিক হলে ধরে নিতে হবে, আমাদের পৃথিবী ও সৌরজগৎ প্রায় এক বিলিয়ন আলোকবর্ষ ব্যাসার্ধের এক বিশাল শূন্য অঞ্চলের কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থিত এবং এই অঞ্চলের ঘনত্ব সমগ্র মহাবিশ্বের গড় ঘনত্বের চেয়ে ২০ শতাংশ কম। এই ধারণাটি স্ট্যান্ডার্ড কসমোলজিক্যাল মডেলের একদম বিপরীত। তবে গবেষকেরা গত ২০ বছরের পাওয়া সব বিএও পরিমাপ ব্যবহার করে একটি নতুন মডেল তৈরি করেছেন, যার ফলাফল বেশ চমকপ্রদ। ড. বণিক বলেন, শূন্যস্থানবিহীন একটি মডেলের তুলনায় এই শূন্য অঞ্চলযুক্ত মডেলটির সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১০ কোটি গুণ বেশি।

এই তত্ত্বকে আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে গবেষকেরা এমন কিছু গ্যালাক্সির আলো বিশ্লেষণ করবেন, যেগুলোতে নতুন করে আর কোনো নক্ষত্র তৈরি হচ্ছে না। এর মাধ্যমে তাঁরা গ্যালাক্সির নিখুঁত বয়স নির্ধারণ করতে পারবেন, যা রেডশিফটের সঙ্গে মিলিয়ে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার সম্পর্কে আরও সুনির্দিষ্ট ধারণা দেবে।

লেখক: সহকারী সম্পাদক, দৈনিক মানবজমিন

সূত্র: ডিসকভার ম্যাগাজিন

আরও পড়ুন