সৌরজগতের যে গ্রহ নিজেই নিজের চাঁদকে গিলে খেয়েছিল
প্রতিবেশী শুক্র গ্রহ যেন মহাকাশের এক নীরব রাক্ষস! নিজের চাঁদকেই সে আস্ত গিলে খেয়েছে বলে দাবি করছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু কেন? পৃথিবীর মতো দেখতে হওয়া সত্ত্বেও শুক্র কেন তার একমাত্র উপগ্রহকে নিজের বুকেই পিষে মারল? এই ভয়ংকর ঘটনার কোনো প্রমাণ কেন গ্রহটির বুকে এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না?
রাতের আকাশে ঝলমলে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আমরা কতই না মুগ্ধ হই! জোয়ার-ভাটা থেকে শুরু করে পৃথিবীর আবহাওয়ার ভারসাম্যসহ অনেক কিছুতেই আমাদের এই একমাত্র উপগ্রহটির বিশাল ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সৌরজগতের দিকে তাকালে একটি অদ্ভুত খটকা লাগে। আকার, ভর এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোর দিক থেকে শুক্র গ্রহকে বলা হয় পৃথিবীর যমজ বোন। সেই হিসাবে শুক্র গ্রহেরও তো অন্তত একটি সুন্দর চাঁদ থাকার কথা ছিল! কিন্তু বাস্তবে গ্রহটি মহাকাশে একেবারেই একাকী।
বিজ্ঞানীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম বড় রহস্য হয়ে ছিল। শুক্রের কি আসলেই কখনো কোনো চাঁদ ছিল না? নাকি কোনো বিশাল গ্রহাণুর সঙ্গে ভয়ংকর সংঘর্ষে সেই চাঁদ চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেছে? যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি, রিভারসাইডের একদল গবেষক সম্প্রতি এই রহস্যের যে উত্তর দিয়েছেন, তা শুনলে আপনার পিলে চমকে যেতে পারে। তাঁদের দাবি, বাইরের কোনো গ্রহাণু এসে চাঁদকে ধ্বংস করেনি, বরং শুক্র গ্রহ নিজেই নিজের চাঁদকে আস্ত গিলে খেয়েছে!
গবেষক দলের প্রধান ও অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট স্টিভেন কেন জানান, এই ভয়ংকর ধীরগতির ঘূর্ণন ও গ্রহের নিজস্ব মহাকর্ষ বল মিলে এক প্রাণঘাতী ফাঁদের সৃষ্টি করেছিল।
মহাকর্ষ ও অলস ঘূর্ণনের ভয়ংকর ফাঁদ
পৃথিবী নিজ অক্ষে বেশ দ্রুত ঘোরে, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় এর এক দিন পার হয়ে যায়। গ্রহের এই দ্রুত ঘূর্ণনের কারণে একটি অদ্ভুত মহাকর্ষীয় ধাক্কা তৈরি হয়, যা উপগ্রহকে নিজের দিকে না টেনে বরং বাইরের দিকে ঠেলে দেয়। ঠিক এ কারণেই আমাদের চাঁদ গিলে খাওয়ার কোনো ঝুঁকিতে নেই; বরং উল্টো সে প্রতি বছর পৃথিবী থেকে প্রায় দেড় ইঞ্চি করে দূরে সরে যাচ্ছে।
কিন্তু শুক্র গ্রহের ব্যাপারটি একেবারেই আলাদা। সৌরজগতের সবচেয়ে অলস গ্রহ হলো শুক্র। এটি নিজ অক্ষে এতই ধীরে ঘোরে যে, এর এক দিন পার হতে পৃথিবীর হিসেবে পাক্কা ২৪৩ দিন লেগে যায়! অর্থাৎ, শুক্র গ্রহে এক বছরের চেয়ে এক দিনের দৈর্ঘ্য বেশি। অলস না বলে উপায় আছে! যাই-হোক, গবেষক দলের প্রধান ও অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট স্টিভেন কেন জানান, এই ভয়ংকর ধীরগতির ঘূর্ণন ও গ্রহের নিজস্ব মহাকর্ষ বল মিলে এক প্রাণঘাতী ফাঁদের সৃষ্টি করেছিল। শুক্রের চাঁদ বাইরের দিকে ছিটকে যাওয়ার বদলে ধীরে ধীরে একটি সর্পিলাকার পথে গ্রহটির দিকেই ধেয়ে আসতে শুরু করে। একসময় গ্রহটির প্রচণ্ড মাধ্যাকর্ষণের চাপে চাঁদটি টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে এবং আস্ত একটি উপগ্রহ চিরতরে শুক্রের বুকে বিলীন হয়ে যায়।
শুক্র গ্রহের ব্যাপারটি একেবারেই আলাদা। সৌরজগতের সবচেয়ে অলস গ্রহ হলো শুক্র। এটি নিজ অক্ষে এতই ধীরে ঘোরে যে, এর এক দিন পার হতে পৃথিবীর হিসেবে পাক্কা ২৪৩ দিন লেগে যায়!
সুপারকম্পিউটারের সিমুলেশনে চাঁদের অনিবার্য মৃত্যু
স্টিভেন কেন এবং তাঁর দল কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে এই দাবি করেননি। তাঁরা মহাজাগতিক বস্তুগুলোর মধ্যে মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়া পরীক্ষা করার জন্য একটি শক্তিশালী কম্পিউটার মডেল তৈরি করেন। মডেলটি কতটা নিখুঁত, তা যাচাই করার জন্য প্রথমে তাঁরা পৃথিবীর চাঁদের বিবর্তনটি সেখানে চালিয়ে দেখেন। এরপর তাঁরা শুক্র গ্রহের ঘূর্ণনের গতি এবং উপগ্রহের ভর বারবার পরিবর্তন করে হাজার হাজার সিমুলেশন চালান।
ফলাফল ছিল বিস্ময়কর! স্টিভেন কেন নিজেও এমন ফলাফল দেখে চমকে গিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, উপগ্রহের ভর বা কক্ষপথের আকার বদলালে হয়তো চাঁদটির বেঁচে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাবে। কিন্তু না, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই চাঁদটির কপালে একই করুণ পরিণতি লেখা ছিল—টুকরো টুকরো হয়ে গ্রহের বুকে আছড়ে পড়া। একমাত্র বিজ্ঞানীরা যখন কম্পিউটারে কৃত্রিমভাবে শুক্র গ্রহের ঘূর্ণনের গতি বাড়িয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা করে দিয়েছিলেন, কেবল তখনই একটি উপগ্রহ সাড়ে চারশো কোটি বছর টিকে থাকতে পেরেছিল। কিন্তু বাস্তবে শুক্র গ্রহের বর্তমান যে অলস গতি, তাতে কোনো উপগ্রহের বেঁচে থাকা অসম্ভব।
একমাত্র বিজ্ঞানীরা যখন কম্পিউটারে কৃত্রিমভাবে শুক্র গ্রহের ঘূর্ণনের গতি বাড়িয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা করে দিয়েছিলেন, কেবল তখনই একটি উপগ্রহ সাড়ে চারশো কোটি বছর টিকে থাকতে পেরেছিল।
এখন আপনার মনে হতেই পারে, আস্ত একটা চাঁদ যদি শুক্রের বুকে আছড়ে পড়েই থাকে, তবে সেই ভয়ংকর সংঘর্ষের বিশাল কোনো গর্ত বা চিহ্ন তো গ্রহটির বুকে থাকার কথা! মুশকিল হলো, শুক্র গ্রহ খুব নিখুঁতভাবে নিজের এই ‘অপরাধের’ প্রমাণ লোপাট করে দিয়েছে।
আমাদের সৌরজগতের জন্ম হয়েছিল প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে। কিন্তু শুক্র গ্রহের বর্তমান যে পাথুরে পৃষ্ঠ বা মাটি আমরা দেখতে পাই, ভূতাত্ত্বিক মাপকাঠিতে তা বেশ নতুন, এর বয়স মাত্র কয়েক কোটি বছর! কারণ, গ্রহটিতে রয়েছে হাজার হাজার ভয়ংকর আগ্নেয়গিরি। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত আর টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত নড়াচড়ার কারণে গ্রহটির ওপরের পৃষ্ঠ বারবার নতুন লাভায় ঢেকে গেছে। অর্থাৎ, চাঁদের ধ্বংসাবশেষ যদি থেকেও থাকে, তবে তা নতুন পাথরের আস্তরণের নিচে, গ্রহের অনেক গভীরে ঢাকা পড়ে আছে। পৃথিবীতে যেমন মাটির অনেক গভীরে ভূকম্পন জরিপ চালিয়ে চাঁদের জন্মের আলামত পাওয়া যায়, শুক্র গ্রহেও তেমন কোনো উন্নত জরিপ চালানো গেলে হয়তো গিলে খাওয়া সেই চাঁদের কঙ্কাল খুঁজে পাওয়া সম্ভব
আমাদের সৌরজগতের জন্ম হয়েছিল প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে। কিন্তু শুক্র গ্রহের বর্তমান যে পাথুরে পৃষ্ঠ বা মাটি আমরা দেখতে পাই, ভূতাত্ত্বিক মাপকাঠিতে তা বেশ নতুন, এর বয়স মাত্র কয়েক কোটি বছর!
প্রাণের অস্তিত্ব এবং ভিনগ্রহের সন্ধানে নতুন মোড়
এই চাঞ্চল্যকর আবিষ্কারটি শুধু শুক্র গ্রহের ইতিহাসই বদলাচ্ছে না, বরং ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধানের হিসাব-নিকাশও পাল্টে দিচ্ছে। আস্ত একটি চাঁদকে গিলে খাওয়ার ফলে শুক্র গ্রহের ভেতরে যে পরিমাণ শক্তি এবং কৌণিক ভরবেগ তৈরি হয়েছিল, তা গ্রহটির ভূতত্ত্ব, ঘূর্ণন এবং জলবায়ুকে চিরতরে বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। অনেকের মতে, হয়তো এ কারণেই শুক্র আজ এক ফুটন্ত নরক, যেখানে প্রাণের কোনো সম্ভাবনা নেই।
বিজ্ঞানীরা যখন মহাকাশে পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য কোনো গ্রহ খোঁজেন, তখন সেখানে একটি চাঁদের উপস্থিতিকে দারুণ ইতিবাচক হিসেবে ধরা হয়। কারণ চাঁদ গ্রহের আবহাওয়াকে স্থিতিশীল রাখে। কিন্তু নতুন এই গবেষণা একটি বড় সতর্কবার্তা দিচ্ছে। ভিনগ্রহটি যদি পৃথিবীর মতোও হয়, কিন্তু এর ঘূর্ণন যদি খুব ধীর হয়, তবে আজ হোক বা কাল, সে তার চাঁদকে গিলে খাবেই।