রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বের মানচিত্র
বর্তমানে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের জয়জয়কার। এর বদৌলতে আমরা মহাকাশের দারুণ সব ছবি পেয়েছি। কিন্তু এবার নাসা যে টেলিস্কোপটি পাঠাতে যাচ্ছে, সেটা হাবলের চেয়েও ১০০ গুণ বেশি শক্তিশালী। তবে এই টেলিস্কোপ এখনো উৎক্ষেপণ করা হয়নি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এর ক্ষমতায় আনন্দিত। কারণ বিজ্ঞানীদের ভাবনার চেয়েও বেশি কাজ করতে পারবে এই যন্ত্র! এর নাম ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ। সংক্ষেপে রোমান।
রোমান টেলিস্কোপের আয়না হাবলের মতোই বিশাল, প্রায় ৮ ফুট। কিন্তু এর দেখার ক্ষমতা হাবলের চেয়ে অনেক বেশি। হাবল যদি মহাকাশের শুধু একটা ‘গাছের’ ছবি তুলতে পারে, রোমান এক ক্লিকেই পুরো ‘জঙ্গলটার’ ছবি তুলতে পারবে! অর্থাৎ, এর ফিল্ড অফ ভিউ বা দেখার পরিধি হাবলের চেয়ে ১০০ গুণ বড়। নাসা মূলত রোমানকে তৈরি করেছিল মহাকাশের দুটি বড় রহস্য সমাধান করার জন্য—ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি। এর পাশাপাশি দূরের গ্যালাক্সিতে নতুন গ্রহ খোঁজার কাজও করবে রোমান।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন গবেষণা করে দেখছেন, এই টেলিস্কোপের সাহায্যে আরও একটা দারুণ কাজ করা সম্ভব। সেটি হলো নক্ষত্রের ‘ভূমিকম্প’ মাপা! শুরুতে বিজ্ঞানীদের এই পরিকল্পনা ছিল না। নক্ষত্রের ভূমিকম্প শুনে কপাল কোঁচকাতে পারেন, কিন্তু বিষয়টা অনেকটা তেমনই। পৃথিবীতে যেমন মাটির নিচে টেকটোনিক প্লেট নড়ে উঠলে ভূমিকম্প হয়, ঠিক তেমনি নক্ষত্রের বুকেও হয় কম্পন। একে বলে স্টার-কোয়েক বা নাক্ষত্রিক কম্পন। বিজ্ঞানের ভাষায় এই বিষয় নিয়ে পড়াশোনাকে বলে অ্যাস্ট্রোসিসমোলজি।
রোমান টেলিস্কোপের আয়না হাবলের মতোই বিশাল, প্রায় ৮ ফুট। কিন্তু এর দেখার ক্ষমতা হাবলের চেয়ে অনেক বেশি। এর ফিল্ড অফ ভিউ বা দেখার পরিধি হাবলের চেয়ে ১০০ গুণ বড়।
নক্ষত্র স্থির কোনো আগুনের গোলক নয়। এদের ভেতরে সবসময় ফুটন্ত গ্যাসের বুদবুদ তৈরি হচ্ছে। এর ফলেই নক্ষত্রের বুকে তা ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে। রোমান টেলিস্কোপ নক্ষত্রের আলোর এই সামান্যতম কাঁপুনি বা উজ্জ্বলতার কম-বেশি হওয়া দেখে বলে দিতে পারবে, ওই নক্ষত্রের বয়স কত, ওটা কত বড় এবং ওর ভেতরে কী চলছে!
মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ঠিক কেন্দ্রে কোটি কোটি নক্ষত্র গিজগিজ করছে। রোমান টেলিস্কোপ সেই ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা বয়স্ক নক্ষত্রদের ওপর নজর রাখবে। এদের বলা হয় রেড জায়ান্ট বা লোহিত দানব। নক্ষত্র যখন জীবনের শেষ পর্যায়ে চলে আসে, তখন ফুলে-ফেঁপে বিশাল লাল রঙের হয়ে যায়।
বিজ্ঞানীরা আগে ভেবেছিলেন, রোমান হয়তো ২-৩ লাখ এমন নক্ষত্র খুঁজে পাবে। কিন্তু এখন হিসাব কষে দেখা যাচ্ছে, রোমান প্রায় ৬ লাখের বেশি রেড জায়ান্টের খোঁজ দিতে পারবে! অনেকের মতে তা ১০ লাখও হতে পারে।
এই বয়স্ক নক্ষত্রদের নিয়ে গবেষণা করা কেন জরুরি? কারণ, সূর্যও একদিন বুড়ো হবে। তখন সূর্যও ফুলে-ফেঁপে রেড জায়ান্ট হয়ে যাবে। বিজ্ঞানীরা বলেন, তখন বুধ ও শুক্র গ্রহ সূর্যের পেটে চলে যাবে। এমনকি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে পৃথিবীও।
বিজ্ঞানীরা আগে ভেবেছিলেন, রোমান হয়তো ২-৩ লাখ এমন নক্ষত্র খুঁজে পাবে। কিন্তু এখন হিসাব কষে দেখা যাচ্ছে, রোমান প্রায় ৬ লাখের বেশি রেড জায়ান্টের খোঁজ দিতে পারবে!
কিন্তু রোমান টেলিস্কোপ মহাকাশের অন্য রেড জায়ান্টদের দিকে তাকিয়ে দেখবে, সেগুলোর চারপাশে কোনো গ্রহ এখনো টিকে আছে কিনা? যদি থাকে, তবে সেগুলোর দূরত্ব কত? এই তথ্যগুলো জানলে আমরা বুঝতে পারব, আজ থেকে কোটি কোটি বছর পর আমাদের সৌরজগতের কপালে কী লেখা আছে।
গ্যালাক্সির কেন্দ্র বিশাল ধুলোর মেঘে ঢাকা। সাধারণ টেলিস্কোপের সাহায্যে সেখানে কিছুই দেখা যায় না। কিন্তু রোমান টেলিস্কোপে আছে অবলোহিত রশ্মি দেখার ক্ষমতা। এই বিশেষ ক্ষমতার সাহায্যে ধুলোর মেঘ ভেদ করে ভেতরের খবর জানা যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী মার্ক পিনসোন্যাল্ট বলেছেন, ‘আমি চমকে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছি! কে জানে, হয়তো ওই ধুলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে একদম নতুন কোনো নক্ষত্রের দল!’
সব ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের শেষ দিকে বা ২০২৭ সালের মে মাসের মধ্যে রোমান পাড়ি জমাবে মহাকাশে। তখন হয়তো মহাকাশের জানা ইতিহাসটাই বদলে যাবে। আমরা জানব নক্ষত্রের জন্ম, মৃত্যু ও আমাদের মহাবিশ্বের অজানা সব গল্প।