চার দশক পর পৃথিবীতে ফিরল নাসার স্যাটেলাইট

প্রায় চার দশক পর পৃথিবীতে ফিরেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তৈরি কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট, আর্থ রেডিয়েশন বাজেট স্যাটেলাইট বা ইআরবিএস।

৯ জানুয়ারি, সোমবার বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা ৪ মিনিটে বেরিং সাগরের ওপর পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে নভোযানটি। এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায় নাসা। বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় স্যাটেলাইটের বেশিরভাগ অংশ পুড়ে যাবে এমন আশংকা ছিলো সংস্থাটির। শেষপর্যন্ত বড় কোন ক্ষতি ছাড়াই নিরাপদে স্যাটেলাইটটি পৃথিবীতে ফিরে আসে। ‘মহাকাশের আবর্জনা বা স্পেস জাংক’ সমস্যা সমাধানে এই সাফল্যকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন বিজ্ঞানীরা।

ইআরবিএস স্যাটেলাইটটির ওজন প্রায় আড়াই হাজার কেজি। ১৯৮৪ সালের ৫ অক্টোবর স্পেস শাটল চ্যালেঞ্জারে করে মহাকাশে পাঠানো হয় এটা। প্রাথমিকভাবে দুবছর স্যাটেলাইটটির কার্যক্রম চলবে বলে আশা করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু বাস্তবে ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ২১ বছর সক্রিয় ছিলো ইআরবিএস।

স্যাটেলাইটটি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও আবহাওয়ার প্যাটার্ন পর্যবেক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হতো। দুটি যন্ত্র ব্যবহার করে ‘আর্থ রেডিশন বাজেট’ পরিমাপ করতো এটি। আর্থ রেডিয়েশন বাজেট বলতে মূলত সূর্য থেকে আসা কী পরিমাণ শক্তি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল শোষণ করছে এবং তার বিপরীতে কী পরিমাণ শক্তি পৃথিবী থেকে মহাশূন্যে প্রতিফলিত বা বিকিরিত হচ্ছে, তা বোঝানো হয়।

১৯৮৭ মনট্রিল চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে ইআরবিএস থেকে সংগ্রহ করা তথ্যগুলো। উল্লেখ্য, এই চুক্তির মাধ্যমে ওজন স্তরের জন্য ক্ষতিকর এমন ১০০টি রাসায়নিক পদার্থের উৎপাদন ও ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ইআরবিএস থেকে পাওয়া তথ্য থেকে দেখা যায়, কীভাবে ক্লোরোফ্লোরো কার্বন এবং জীবাশ্ম জ্বালানী থেকে নির্গত রাসায়নিক ওজন স্তরকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে। কীভাবে বৈশ্বিক জলবায়ুতে তৈরি হয়েছে মারাত্মক ভারসাম্যহীনতা।

এছাড়াও স্যাটেলাইটের তৃতীয় আরেকটি যন্ত্রের সাহায্যে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্প, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, অ্যারোসল এবং ওজনের মাত্রাসহ স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার বা শান্তমণ্ডলের নানা বিষয় পরিমাপ করা হতো। ওজন স্তর যে পাতলা হয়ে যাচ্ছে সেটা নিশ্চিতভাবে জানা যায় এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে।

১৯৮৭ মনট্রিল চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে ইআরবিএস থেকে সংগ্রহ করা তথ্যগুলো। উল্লেখ্য, এই চুক্তির মাধ্যমে ওজন স্তরের জন্য ক্ষতিকর এমন ১০০টি রাসায়নিক পদার্থের উৎপাদন ও ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রায় ২০০টি দেশ সেই চুক্তিপত্রে সাক্ষর করে। ফলে ক্লোরোফ্লোরো কার্বন নিঃসরণের হার বেশ কমে যায় পৃথিবীতে। সম্প্রতি জাতিসংঘের করা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০৬৬ সালের মধ্যে পুরোপুরি ঠিক হতে পারে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের ওপরের ওজন স্তরের ক্ষত।

পৃথিবীতে ফিরে আসার সময় স্যাটেলাইটটির কারণে কোনো ক্ষতি হওয়ার সংবাদ পাওয়া যায়নি। নাসার গবেষকদের মতে, এর কারণে মানুষের নিহত হবার আশঙ্কা ছিল ৯ হাজার ৪০০ জনে মাত্র একজন। বর্তমান মানদণ্ড অনুযায়ী এ ঝুঁকির পরিমাণ অনেক বেশি। মহাকাশের আবর্জনার কারণে, ১০ হাজার মানুষের মাঝে একজন ১ নিহত হবার ঝুঁকি থাকলে, সেটাকে আদর্শ হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ এই পরিমাণ ঝুঁকি থাকলে কোনোকিছুকে মহাকাশ থেকে ফিরিয়ে আনা উচিত। ২০১৯ সাল থেকে এই নিয়ম মানা হয়। তবে, এর অনেক আগে থেকেই মহাকাশ থেকে ইআরবিএস ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু করেছিলেন বিজ্ঞানীরা।

আরও পড়ুন
আর্থ রেডিয়েশন বাজেট স্যাটেলাইট বা ইআরবিএস
নাসা

গত বছর মার্কিন ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশন, মহাকাশে পাঠানো স্যাটেলাইটের ব্যাপারে নতুন আইন করে। সেখানে বলা হয়, কোনো স্যাটেলাইট অকার্যকর হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে সেটাকে কক্ষপথে থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। এ আইন পুরোপুরি মানলে, পৃথিবীর চারপাশের মহাকাশে আবর্জনার পরিমাণ কমে যাবে। পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে যাবে অনেকটাই।

এখন পর্যন্ত মহাকাশের মানব সৃষ্ট আবর্জনা বা স্পেস জাংকের কারণে পৃথিবীতে মানুষের প্রাণহানি ঘটেনি। তবে, আগামী দশকে স্পেস জাংকের কারণে পৃথিবী অন্তত একজন মানুষের প্রাণহানি হবার ১০ শতাংশ আশঙ্কা আছে। গত বছর জুলাই মাসে নেচার অ্যাস্ট্রোনমি জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়।

ইআরবিএস স্যাটেলাইটির বড় একটা অংশ বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় পুড়ে যায়। বাকি অংশ সমুদ্র বা আলাস্কার দুর্গম কোনো এলাকায় পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা

সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন