চাঁদের ভবিষ্যৎ
রাতের আকাশে চাঁদ দেখতে কার না ভালো লাগে। চাঁদ আমাদের খুব পরিচিত বলে আমরা হয়তো একে খুব সাধারণ মনে করি। কিন্তু চাঁদ আসলে একটি বিস্ময়কর উপগ্রহ। চাঁদের দিকে তাকালে এর অনেক পুরোনো ইতিহাস চোখে পড়ে। কোটি কোটি বছর আগে বিশাল সব উল্কাপাতের দাগ আজও এর বুকে স্পষ্ট দেখা যায়। কালো কালো দাগগুলো সেই প্রাচীন আঘাতের সাক্ষী।
কিন্তু এই চাঁদের ভবিষ্যৎ কী? বহু কোটি বছর পর চাঁদের কী পরিণতি হবে? এই ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, চাঁদের জন্ম কীভাবে হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর মহাকর্ষ বলের সঙ্গে এটি কীভাবে যুক্ত এবং আমাদের সূর্য এই পুরো ব্যবস্থায় কী ভূমিকা রাখবে।
আদিম যুগে চাঁদ পৃথিবীর খুব কাছাকাছি ছিল। তখন এদের দূরত্ব ছিল মাত্র ২০ হাজার কিলোমিটার। বর্তমানে এই গড় দূরত্ব প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার কিলোমিটার।
চাঁদের জন্ম ও অতীত
চাঁদের জন্ম নিয়ে বিজ্ঞানীদের একটি পরিষ্কার ধারণা আছে। পৃথিবীর জন্মের কয়েক কোটি বছর পরের কথা। তখন একটি গ্রহের আকারের বিশাল বস্তু পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ে। সেই বস্তুর নাম থিয়া। পৃথিবীর সঙ্গে থিয়ার প্রচণ্ড ধাক্কায় পৃথিবীর অনেক উপাদান মহাকাশে ছিটকে যায়। পৃথিবীর অংশ এবং থিয়ার অংশগুলো মহাকাশে ঘুরতে থাকে। পরে এগুলো একসঙ্গে জমাট বেঁধে চাঁদের জন্ম হয়।
সেই আদিম যুগে চাঁদ পৃথিবীর খুব কাছাকাছি ছিল। তখন এদের দূরত্ব ছিল মাত্র ২০ হাজার কিলোমিটার। বর্তমানে এই গড় দূরত্ব প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার কিলোমিটার। তখন পৃথিবীর আকাশ থেকে চাঁদকে বিশাল দেখাত। আপনি যদি হাত সোজা করে মুঠি পাকান, তাহলে যেমন দেখাবে, আকাশের চাঁদটি ঠিক ততটাই বড় দেখাত।
পৃথিবীর সঙ্গে থিয়ার প্রচণ্ড ধাক্কায় পৃথিবীর অনেক উপাদান মহাকাশে ছিটকে যায়। পৃথিবীর অংশ এবং থিয়ার অংশগুলো মহাকাশে ঘুরতে থাকে। পরে এগুলো একসঙ্গে জমাট বেঁধে চাঁদের জন্ম হয়।
পৃথিবীর মহাকর্ষ ও চাঁদের দূরে সরে যাওয়া
পৃথিবীর মহাকর্ষ বল খুব শক্তিশালী। এই বল চাঁদের ওপর বিশাল প্রভাব ফেলে। মহাকর্ষ বলের একটি নিয়ম আছে। দূরত্ব বাড়লে এই বল দ্রুত কমে যায়। এর মানে, চাঁদের যে দিকটি পৃথিবীর দিকে থাকে, সেখানে টান বেশি লাগে। আর উল্টো দিকে টান লাগে কম।
চাঁদের ব্যাস প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। এই বিশাল দূরত্বের কারণে চাঁদের দুই দিকে টানের পার্থক্য তৈরি হয়। ফলে চাঁদ একেবারে গোল না থেকে কিছুটা ডিমের মতো লম্বাটে হয়ে যায়। চাঁদের দুই দিক পৃথিবীর দিকে সামান্য ফুলে ওঠে।
চাঁদ যখন প্রথম তৈরি হয়, তখন এটি খুব দ্রুত নিজের অক্ষে ঘুরত। কিন্তু ওই যে ডিমের মতো আকার, তার কারণে পৃথিবীর মহাকর্ষ বল চাঁদকে একদিক থেকে টেনে ধরে। পৃথিবীর এই একটানা টানের কারণে চাঁদের ঘোরার গতি ধীরে ধীরে কমে যায়। চাঁদের নিজস্ব ‘দিন’ বড় হতে থাকে। ঘোরার গতি কমার কারণে যে শক্তি হারিয়ে যায়, তা চাঁদের কক্ষপথের শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ফলে চাঁদ পৃথিবী থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করে।
একসময় চাঁদের নিজের অক্ষে ঘোরার গতি এবং পৃথিবীর চারদিকে একবার ঘুরে আসার সময় একদম সমান হয়ে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে টাইডাল লকিং। এ কারণেই আমরা পৃথিবী থেকে সবসময় চাঁদের কেবল একটি দিকই দেখতে পাই।
চাঁদের ব্যাস প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। এই বিশাল দূরত্বের কারণে চাঁদের দুই দিকে টানের পার্থক্য তৈরি হয়। ফলে চাঁদ একেবারে গোল না থেকে কিছুটা ডিমের মতো লম্বাটে হয়ে যায়।
পৃথিবীর দিনও বড় হচ্ছে
এই মহাকর্ষের টান কিন্তু একতরফা নয়। চাঁদও পৃথিবীকে নিজের দিকে টানে। এই টানের কারণেই পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা হয়। পৃথিবীর মহাসাগরগুলোতে বিশাল পানি তৈরি হয়। পৃথিবী যখন ঘোরে, তখন এই জোয়ারের পানির কারণে ঘর্ষণের সৃষ্টি হয়। এই ঘর্ষণ পৃথিবীর ঘোরার গতিও কমিয়ে দিচ্ছে।
ফলে পৃথিবীর দিনও ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। তবে চিন্তার কিছু নেই। প্রতি ১০০ বছরে দিন মাত্র দুই মিলি-সেকেন্ড বড় হয়। তাই ঘড়ির সময় বদলানোর কোনো দরকার নেই। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার কারণে চাঁদ এখনো পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। হিসাব অনুযায়ী, চাঁদ প্রতি বছর পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ সেন্টিমিটার করে দূরে সরে যাচ্ছে।
ভবিষ্যতে কী হবে
এই হিসাব ধরলে চাঁদের ভবিষ্যৎ বলা বেশ সহজ মনে হয়। চাঁদ ধীরে ধীরে আরও দূরে সরতেই থাকবে। দূরে সরার এই গতি আস্তে আস্তে আরও কমে আসবে। একসময় পৃথিবীর ঘোরার গতি এবং চাঁদের কক্ষপথের সময় একদম সমান হয়ে যাবে।
সেই সময় পৃথিবী থেকে সবসময় চাঁদের একটি দিক যেমন দেখা যায়, তেমনি চাঁদও পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট দিকের ওপর আটকে থাকবে। পৃথিবীর ওই অংশের মানুষ আকাশে চাঁদকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবে। চাঁদ আর কখনো উঠবেও না, অস্তও যাবে না।
কিন্তু এটি ঘটতে কয়েকশ কোটি বছর সময় লাগবে। সমস্যা হলো, আমাদের হাতে হয়তো এত সময় নেই।
পৃথিবীর মহাসাগরগুলোতে বিশাল পানি তৈরি হয়। পৃথিবী যখন ঘোরে, তখন এই জোয়ারের পানির কারণে ঘর্ষণের সৃষ্টি হয়। এই ঘর্ষণ পৃথিবীর ঘোরার গতিও কমিয়ে দিচ্ছে।
সূর্যের ভয়ংকর রূপ
চাঁদ দূরে সরে যাওয়ার এই প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর মহাসাগরগুলোর সবচেয়ে বেশি ভূমিকা আছে। জোয়ার-ভাটার ঘর্ষণেই পৃথিবীর গতি কমছে। কিন্তু এই মহাসাগরগুলো চিরকাল থাকবে না।
আমাদের সূর্য দিন দিন আরও উত্তপ্ত হচ্ছে। সূর্য তার ভেতরের হাইড্রোজেন পুড়িয়ে হিলিয়াম তৈরি করে। এই হিলিয়ামের ‘ছাই’ সূর্যের কেন্দ্রে জমা হচ্ছে। ফলে সূর্যের কেন্দ্র আরও বেশি ঘন ও গরম হয়ে উঠছে। এতে সূর্যের আলো আরও প্রখর হচ্ছে। পৃথিবীর তাপমাত্রাও বাড়ছে।
আজ থেকে প্রায় ১০০ কোটি বছর পর সূর্য এতটাই গরম হয়ে যাবে যে, পৃথিবীর সব মহাসাগরের পানি ফুটে বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে। পৃথিবী হয়ে পড়বে সম্পূর্ণ পানিশূন্য ও রুক্ষ। মহাসাগর না থাকলে জোয়ার-ভাটার ঘর্ষণও থাকবে না। ফলে চাঁদের দূরে সরে যাওয়ার গতি অনেক কমে যাবে। পৃথিবীর দিন বড় হওয়ার প্রক্রিয়াটিও থেমে যাবে।
আমাদের সূর্য দিন দিন আরও উত্তপ্ত হচ্ছে। সূর্য তার ভেতরের হাইড্রোজেন পুড়িয়ে হিলিয়াম তৈরি করে। এই হিলিয়ামের ছাই সূর্যের কেন্দ্রে জমা হচ্ছে। ফলে সূর্যের কেন্দ্র আরও বেশি ঘন ও গরম হয়ে উঠছে।
শেষ পরিণতি
আজ থেকে প্রায় ৬০০ বা ৭০০ কোটি বছর পর সূর্যের ভেতরের সব হাইড্রোজেন জ্বালানি শেষ হয়ে যাবে। তখন সূর্য ফুলে-ফেঁপে একটি বিশাল লাল দানবে পরিণত হবে। বিজ্ঞানীরা এখনো তর্ক করছেন, সূর্য ফুলে গিয়ে পৃথিবীকে গিলে খাবে কি না। তবে সেটা মূল বিষয় নয়। সূর্য এত বিশাল হবে যে, পৃথিবী এবং চাঁদ এমনিতেই আগুনে পুড়ে যাবে। তখন চাঁদের কক্ষপথ নিয়ে আমাদের আর মাথা ঘামানোর সুযোগ থাকবে না।
এরও অনেক পরে সূর্য তার বাইরের অংশ মহাকাশে ছুড়ে ফেলবে। তার ভরের অর্ধেক হারিয়ে সে একটি ছোট শ্বেত বামন তারায় পরিণত হবে। এই শ্বেত বামন তারাটি হাজার কোটি বছর ধরে ধীরে ধীরে শীতল হতে থাকবে।
তখনো কিন্তু সূর্য তার মহাকর্ষ বল দিয়ে পৃথিবী ও চাঁদকে টানবে। বর্তমানে পৃথিবীর ওপর সূর্যের জোয়ার-সৃষ্টিকারী টান চাঁদের প্রায় অর্ধেক। কিন্তু শ্বেত বামন হয়ে যাওয়ার পর এই টানের হিসাব খুব জটিল হয়ে যাবে। ভর কমার কারণে টানের প্রভাবও কমবে।
তবে মহাবিশ্বের হাতে সময়ের তো কোনো অভাব নেই। শত শত কোটি বছর ধরে শ্বেত বামন সূর্যের এই দুর্বল মহাকর্ষীয় টান একসময় চাঁদের কক্ষপথকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। হয়তো চাঁদ পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে মহাকাশে হারিয়ে যাবে। অথবা পৃথিবীর বুকেই আছড়ে পড়বে।
তবে ততদিনে আমাদের এই পৃথিবীতে কোনো প্রাণ তো দূরের কথা, কোনো পানিও থাকবে না। মহাবিশ্বের অসীম ক্যালেন্ডারে এই ঘটনাগুলো ঘটতে এখনো শত শত কোটি বছর বাকি। তাই যতদিন চাঁদ আমাদের আকাশে আছে, এর অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করাই আমাদের জন্য সবচেয়ে আনন্দের!