বিজ্ঞানের অস্কার খ্যাত ব্রেকথ্রু প্রাইজ পেলেন যাঁরা

ব্রেকথ্রু পুরস্কার হাতে বিজয়ীছবি: সিজিটিএন

লস অ্যাঞ্জেলেসে বিছানো হয়েছে লাল গালিচা। আলো ঝলমলে এক সন্ধ্যায় জড়ো হয়েছেন নামিদামি সব তারকা, প্রযুক্তিজগতের নেতা ও বিশ্বসেরা গবেষকেরা! গত ১৮ এপ্রিল এমনই এক জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে ঘোষণা করা হলো ২০২৬ সালের ব্রেকথ্রু প্রাইজ বিজয়ীদের নাম।

এই আয়োজনকে অনেকেই ভালোবেসে বিজ্ঞানের অস্কার বলে ডাকেন। এ বছর মহাকাশ, পদার্থবিদ্যাসহ বিজ্ঞানের নানা শাখায় যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য মোট ১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের বেশি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে!

জীববিজ্ঞান, মৌলিক পদার্থবিজ্ঞান এবং গণিতে মোট ছয়টি মূল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে এ বছর। এর প্রতিটির অর্থমূল্য ৩০ লাখ ডলার! পাশাপাশি আজীবন সম্মাননার জন্য দেওয়া হয়েছে একটি বিশেষ পুরস্কার।

স্টুয়ার্ট এইচ. অরকিন (বামে) এবং সুই লে থেইন (ডানে)
ছবি: গেটি ইমেজ

জীববিজ্ঞানে এবার প্রথম পুরস্কার পেয়েছেন জিন বেনেট, ক্যাথরিন এ. হাই এবং আলবার্ট ম্যাগুয়ার। তাঁরা এমন এক চিকিৎসাপদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যা বংশগত রেটিনা ক্ষয়রোগ সারিয়ে তুলতে পারে। এটিই ছিল বংশগত কোনো রোগের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ অনুমোদন পাওয়া প্রথম জিন থেরাপি। তাঁদের এই কাজ জেনেটিক চিকিৎসায় এক নতুন যুগের সূচনা করেছে।

জীববিজ্ঞানে আরেকটি ব্রেকথ্রু প্রাইজ পেয়েছেন স্টুয়ার্ট এইচ. অরকিন এবং সুই লে থেইন। মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় মানুষের শরীরে একধরনের হিমোগ্লোবিন থাকে, যা জন্মের পর বদলে গিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের হিমোগ্লোবিনে পরিণত হয়। এই পরিবর্তনটা কীভাবে ঘটে, সেটাই তাঁরা আবিষ্কার করেছেন। তাঁদের এই কাজের ফলে সিকেল সেল ডিজিজ এবং বিটা-থ্যালাসেমিয়ার মতো মারাত্মক রোগের নতুন জিন-এডিটিং চিকিৎসা সম্ভব হয়েছে। বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ এই রোগগুলোতে ভুগছেন।

আরও পড়ুন
জীববিজ্ঞানে এবার প্রথম পুরস্কার পেয়েছেন জিন বেনেট, ক্যাথরিন এ. হাই এবং আলবার্ট ম্যাগুয়ার। তাঁরা এমন এক চিকিৎসাপদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যা বংশগত রেটিনা ক্ষয়রোগ সারিয়ে তুলতে পারে।

জীববিজ্ঞানের তৃতীয় পুরস্কারটি উঠেছে রোজা রেডেমেকারস এবং ব্রায়ান ট্রেনরের হাতে। তাঁরা আবিষ্কার করেছেন, একটি জিনের পরিবর্তনের কারণেই লাউ গেহরিগ ডিজিজ এবং ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া নামে ভয়ংকর দুটি রোগ হয়। এই জিনের নাম C9orf72। এই আবিষ্কারের ফলে সম্পূর্ণ আলাদা মনে হওয়া দুটি রোগের মধ্যে একটি অদ্ভুত যোগসূত্র পাওয়া গেছে এবং নতুন চিকিৎসার দুয়ার খুলে গেছে।

গণিতে এবার পুরস্কার পেয়েছেন ফ্রাঙ্ক মার্লে। তিনি ননলিনিয়ার ইভোলিউশন ইকুয়েশন নিয়ে যুগান্তকারী কাজ করেছেন। এই সমীকরণগুলো মূলত তরলের প্রবাহ, প্লাজমা এবং টার্বুলেন্সের মতো জটিল বিষয়গুলোকে ব্যাখ্যা করে। অ্যারোনটিকস থেকে শুরু করে জ্যোতির্পদার্থবিদ্যায় তাঁর এই কাজ দারুণ প্রভাব ফেলেছে। তাঁর সাক্ষাৎকার পড়ুন এই লিংক থেকে: বিশৃঙ্খলাকে বশে এনে ৩০ কোটি টাকার ব্রেকথ্রু পুরস্কার!

গণিতবিদ ফ্র্যাঙ্ক মার্লে
ছবি: আইএইচইএস/ক্রিস্টোফ পিউস

মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানে ব্রেকথ্রু প্রাইজ পেয়েছে সার্ন, ব্রুকহেভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি এবং ফার্মিল্যাবের ‘মিউয়ন জি-২’ দল। এই দলে ডেভিড হার্টজোগ, ক্রিস পলি, লি রবার্টস এবং উইলিয়াম মোর্সসহ শত শত বিজ্ঞানী রয়েছেন। তাঁরা ইলেকট্রনের এক ভারী এবং অস্থির জাতভাই মিউয়নের চৌম্বকীয় ধর্ম খুব নিখুঁতভাবে মেপেছেন। এটি পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেলের ত্রুটি বা ফাটল খুঁজতে সাহায্য করবে। ভবিষ্যতে হয়তো এর কারণেই মহাবিশ্বের নতুন কোনো কণার সন্ধান পাওয়া যাবে।

মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানে বিশেষ ব্রেকথ্রু প্রাইজ বা আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন ডেভিড জে. গ্রস। শক্তিশালী পারমাণবিক বল বিভিন্ন শক্তির স্তরে কীভাবে কাজ করে, তা ব্যাখ্যা করা এবং স্ট্রিং থিওরিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁকে এই সম্মান জানানো হয়েছে।

আরও পড়ুন
গণিতে এবার পুরস্কার পেয়েছেন ফ্রাঙ্ক মার্লে। তিনি ননলিনিয়ার ইভোলিউশন ইকুয়েশন নিয়ে যুগান্তকারী কাজ করেছেন।

এ বছর ভেরা রুবিন নিউ ফ্রন্টিয়ার্স প্রাইজ নামে একটি নতুন পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে। ৫০ হাজার ডলারের এই পুরস্কার জিতেছেন ক্যারোলিনা ফিগুয়েরেডো নামে এক তরুণ বিজ্ঞানী। তিনি কণা পদার্থবিজ্ঞানের আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্কহীন কিছু তত্ত্বের মধ্যে গভীর জ্যামিতিক সংযোগ খুঁজে বের করেছেন। তাঁর কাজ বলছে, মহাবিশ্বের মৌলিক কণাগুলোর আচরণ হয়তো স্থান-কালের বদলে কোনো অন্তর্নিহিত জ্যামিতিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে!

এই পুরস্কারটির নামকরণ করা হয়েছে বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ভেরা রুবিনের নামে। কাকতালীয়ভাবে এ বছরই ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরি পুরোপুরি তার বৈজ্ঞানিক কাজ শুরু করতে যাচ্ছে। এই অবজারভেটরি ডার্ক ম্যাটার নিয়ে নিখুঁত গবেষণা চালাবে।

ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরি
ছবি: এনএসএফ-ডিওই রুবিন অবজারভেটরি / এইউআরএ / বি. কুইন্ট

এ ছাড়া নিউ হরাইজনস এবং নিউ ফ্রন্টিয়ার্স অ্যাওয়ার্ডের মাধ্যমে আরও অনেক তরুণ ও উদীয়মান বিজ্ঞানীকে সম্মান জানানো হয়েছে। তাঁরা ডার্ক ম্যাটারের খোঁজ, কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি এবং মহাবিশ্বের প্রসারণ মাপার মতো বিষয়ে দারুণ সব কাজ করেছেন।

বায়োহাব নামে একটি অলাভজনক গবেষণা সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ ও প্রিসিলা চ্যান। এক বিবৃতিতে তাঁরা বলেছেন, ‘এ বছরের বিজয়ীরা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন, বিজ্ঞান আসলে কী করতে পারে! তাঁরা আমাদের চারপাশের জগৎ সম্পর্কে বোঝাপড়াকে আরও গভীর করেছেন এবং এমন সব আবিষ্কার করেছেন, যা লাখ লাখ মানুষের জীবনকে উন্নত করবে। তাঁদের এই কাজকে সম্মান জানাতে পেরে আমরা সত্যিই গর্বিত।’

আরও পড়ুন