এ বছর চল্লিশে পা দিল বিজ্ঞানের ছয়টি যুগান্তকারী ঘটনা
চল্লিশ বছর আগে কেমন ছিল পৃথিবী? ১৯৮৬ সাল শুধু আনন্দের নয়, ছিল বেদনারও। একদিকে ভিডিও গেমের বিপ্লব, অন্যদিকে চোখের সামনে চ্যালেঞ্জার শাটলের ধ্বংস আর চেরনোবিলের ভয়াবহতা। এই বছরটাই কীভাবে পাল্টে দিল আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের গতিপথ?
১৯৮৬ সাল। বছরটা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক হয়ে আছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় চোখ বোলালে দেখবেন, ঠিক ৪০ বছর আগের এই বছরটি আমাদের বর্তমান জীবনযাত্রার ভিত গড়ে দিয়েছিল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতেও ঘটে যাচ্ছিল একের পর এক বিপ্লব। ১৯৮৬ সালের সেই আবিষ্কার ও ঘটনাগুলোই আমাদের আজকের দুনিয়াটাকে বদলে দিয়েছে। চলুন, ২০২৬ সালে চল্লিশে পা দেওয়া সেই ৬টি যুগান্তকারী ঘটনা সম্পর্কে জানা যাক।
১. ভয়েজার ২-এর চমক
ষাটের দশকে মানুষ চাঁদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল ঠিকই, কিন্তু আশির দশকেও সেই মহাকাশ জয়ের নেশা বিন্দুমাত্র কমেনি। ১৯৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও জাপান মহাকাশ বিজ্ঞানে বেশ উন্নতি করেছিল। শুরু করা যাক নাসার ভয়েজার ২ দিয়ে। ১৯৭৭ সালে যাত্রা শুরু করলেও ১৯৮৬ সালে এটি ইউরেনাস গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে যায়। এটিই ছিল মানুষের তৈরি প্রথম কোনো বস্তু, যা ইউরেনাসের এত কাছে যেতে পেরেছিল। ভয়েজার ২ মিশনই একমাত্র নভোযান, যা আমাদের সৌরজগতের বৃহস্পতি, শনি, নেপচুন ও ইউরেনাস গ্রহকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছে।
একই বছর সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশে এক নতুন ইতিহাস লেখে। তারা কক্ষপথে মির নামে এক মডুলার স্পেস স্টেশনের নির্মাণ কাজ শুরু করে। রুশ ভাষায় মির মানে পৃথিবী। নামের সার্থকতা রেখে এই স্পেস স্টেশনটি দীর্ঘদিন টিকে ছিল। পরে রাশিয়া, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, জার্মানি, ব্রিটেনসহ ১১টি দেশের মোট ১০৫ জন নভোচারী এই স্পেস স্টেশনে গবেষণা করেছেন। মহাকাশে দীর্ঘকাল বসবাস করতে গেলে কী কী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়, তা জানাটাই ছিল মিরের মূল লক্ষ্য।
জাপানও পিছিয়ে ছিল না। ৭৬ বছর পর হ্যালির ধূমকেতু ফিরে এসেছিল পৃথিবীর আকাশে। সে বছরই জাপান পাঠালো তাদের মহাকাশযান সুইসেই। এটি হ্যালির ধূমকেতুর খুব কাছে গিয়ে এর অতিবেগুনি ছবি তোলে, ঘূর্ণন গতি মাপে এবং ধূমকেতু থেকে নির্গত জলীয় বাষ্প ও আয়নগুলোর ওপর পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে।
২. রুটান ভয়েজারের বিশ্বজয়
মহাকাশের পাশাপাশি পৃথিবীতেও তোলপাড় ফেলা এক ঘটনা ঘটে ১৯৮৬ সালে। বছরের ঠিক শেষ দিকে, ২৩ ডিসেম্বর, রুটান ভয়েজার নামে এক বিমান বিশ্ব রেকর্ড গড়ে। বিমানটির ডিজাইনার ছিলেন বার্ট রুটান। বিমানের পাইলট ছিলেন তাঁর ভাই ডিক রুটান ও জিনা ইয়েগার। তাঁরা কোনো বিরতি না নিয়ে এবং মাঝপথে একবারও জ্বালানি না ভরে পুরো পৃথিবী চক্কর দিয়ে আসেন। এই অবিশ্বাস্য কাজটি করতে তাঁদের সময় লেগেছিল মাত্র ৯ দিন। এই মিশন শুধু মানুষের সহনশীলতার প্রমাণই দেয়নি, বরং প্রমাণ করেছিল কার্বন ফাইবার আর ইপোক্সির মতো হালকা উপাদানের ক্ষমতা। আজকের বিলাসবহুল গাড়ি থেকে শুরু করে খেলার সরঞ্জামে যে হালকা ও মজবুত কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল দেখি, তার সফলতার শুরুটা হয়েছিল এখান থেকেই।
৩. ল্যাপটপের যাত্রা শুরু
আজকের দিনে ল্যাপটপ ছাড়া যেন চলেই না। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে প্রথম ল্যাপটপ বাজারে এসেছিল এই ১৯৮৬ সালের ৩ এপ্রিল। আইবিএম বাজারে আনল ‘আইবিএম পিসি কনভার্টিবল’। তবে আজকের ল্যাপটপের সঙ্গে এর তুলনা করবেন না। এর ওজন ছিল প্রায় ৬ কেজি! দেখতে ছিল ছোটখাটো একটা স্যুটকেসের মতো। আজকের দিনের ম্যাকবুক বা আল্ট্রাবুকের তুলনায় ওটাকে দানব মনে হতে পারে। কিন্তু গুরুত্বের দিক থেকে এটি ছিল অসামান্য। আগে কম্পিউটার মানেই ছিল পুরো একটা ঘর দখল করে রাখা যন্ত্র। সেখান থেকে এটি টেবিলে এল, তারপর মানুষের হাতে। ঠিক এর দুবছর আগে পোর্টেবল মোবাইলের ধারণাও এসেছিল। এই দুটি ঘটনাই আজকের স্মার্টফোন আর ল্যাপটপনির্ভর জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।
৪. স্টিভ জবস, পিক্সার এবং সিনেমার নতুন যুগ
১৯৮৬ সাল শুধু ব্লকবাস্টার সিনেমার বছর ছিল না, বরং সিনেমার কারিগরি দিক বদলে দেওয়ার বছরও ছিল। জিম হেনসনের ল্যাবিরিন্থ মুভির কথা ধরা যাক। ডেভিড বোয়ি আর গবলিন পাপেটদের অদ্ভুত এক জগত। কিন্তু এই মুভিতেই প্রথমবার কম্পিউটারের সাহায্যে তৈরি সিজিআই একটি বাস্তবসম্মত প্রাণী দেখানো হয়। মুভিতে ওপেনিং ক্রেডিটে যে সাদা পেঁচাটি উড়ে যায়, সেটি সিজিআই দিয়ে তৈরি ছিল। জুরাসিক পার্কের ডাইনোসর আসার অনেক আগেই এর বীজ বোনা হয়েছিল এখানে।
এদিকে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে দেখানো হলো ট্রানজিশনস নামে একটি বিশেষ মুভি। দর্শকেরা তখন জানত না যে তারা ইতিহাসের প্রথম ফুল-কালার থ্রিডি আইম্যাক্স মুভি দেখছে। আজকের অ্যাভেঞ্জার বা অ্যাভাটার মুভির যে থ্রিডি বিপ্লব, তার শুরুটা কিন্তু ওখানেই।
আরেকটা মজার ঘটনা বলি। স্টার ওয়ার্স-এর নির্মাতা জর্জ লুকাস তখন ব্যক্তিগত জীবনে ডিভোর্স আর ব্যবসায়িক চাপে দিশেহারা। তাঁর ১৯৮৬ সালের মুভি হাওয়ার্ড দ্য ডাক বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। টাকার অভাবে তিনি তাঁর কোম্পানির কম্পিউটার অ্যানিমেশন বিভাগটি বিক্রি করে দেন। ক্রেতা কে ছিলেন জানেন? স্টিভ জবস! সেই কোম্পানিটির নামই পরে হয় পিক্সার। তাদের তৈরি প্রথম শর্ট ফিল্ম লুক্সো জুনিয়র প্রথম সিজিআই ছবি হিসেবে অস্কার মনোনয়ন পায়। বাকিটা তো ইতিহাস!
৫. ভিডিও গেমের রাজত্ব
সত্তরের দশকে ভিডিও গেমের আনাগোনা শুরু হলেও, ১৯৮৬ সালে নিনটেন্ডো এন্টারটেইনমেন্ট সিস্টেম যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে সব বদলে যায়। ভিডিও গেম যে শুধু আর্কেড মেশিনে কয়েন ফেলে খেলার জিনিস নয়, বরং সিনেমা বা গানের মতোই একটা সিরিয়াস বিনোদন মাধ্যম হতে পারে, এটা মানুষ বুঝতে শুরু করল তখন। প্যাক-ম্যানের জনপ্রিয়তা ছিল ঠিকই, কিন্তু ১৯৮৬ সালে দ্য লিজেন্ড অব জেল্ডা, মেট্রয়েড এবং ড্রাগন কোয়েস্ট-এর মতো গেমগুলো এসে গেমের সংজ্ঞাই বদলে দিল। এই গেমগুলোতে ছিল বিশাল জগত, অনেক বড় গল্প এবং দীর্ঘ সময় ধরে খেলার সুযোগ। আজকের দিনের ওপেন-ওয়ার্ল্ড গেম বা আরপিজি গেমগুলোর জন্ম আসলে এখান থেকেই।
৬. শিক্ষা ভোলার নয়
সব মাইলফলকই যে আনন্দের, তা কিন্তু নয়। ১৯৮৬ সালে বিজ্ঞান জগৎ দুটি ভয়াবহ বিপর্যয়ের সাক্ষী হয়। তার রেশ আমরা আজও বয়ে বেড়াচ্ছি। প্রথমটি ঘটে ২৮ জানুয়ারি। লাখ লাখ মানুষ টিভিতে লাইভ দেখছিল নাসার চ্যালেঞ্জার স্পেস শাটলের উৎক্ষেপণ। কিন্তু ওড়ার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আকাশেই বিস্ফোরিত হয় শাটলটি। মারা যান সাতজন ক্রু। তাঁদের মধ্যে ছিলেন স্কুলশিক্ষিকা ক্রিস্টা ম্যাকলিফ। তদন্তে বেরিয়ে আসে, রকেট বুস্টারের রাবারের সিল অতিরিক্ত ঠান্ডায় জমে গিয়ে কাজ করেনি। এই ঘটনা নাসাকে তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রকেটের নকশা পুরোপুরি ঢেলে সাজাতে বাধ্য করে।
এর কয়েক মাস পর, এপ্রিলে ঘটে চেরনোবিল বিপর্যয়। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান ইউক্রেন) চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একটি টেস্ট চলার সময় রিঅ্যাক্টর গলে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটে। তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে ইউক্রেন, রাশিয়া ও বেলারুশের অনেক এলাকায়। আজও কেন্দ্রের চারপাশের ৩০ কিলোমিটার এলাকা মানুষের বসবাসের অযোগ্য। এই দুর্ঘটনার পর আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা নড়েচড়ে বসে। বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক চুল্লির নকশা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পরিচালনার নিয়মকানুনে আমূল পরিবর্তন আনা হয়।
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ১৯৮৬ সালের দিকে তাকালে বোঝা যায়, বছরটি কতটা ঘটনাবহুল ছিল। আনন্দ, বেদনা, আবিষ্কার আর উদ্ভাবন মিলিয়ে সেই বছরটিই আমাদের আধুনিক ভবিষ্যতের নকশা তৈরি করে দিয়ে গেছে।