স্ট্রেঞ্জার থিংস সিরিজে দেখানো ওয়ার্মহোলের কতটা বাস্তব

নেটফ্লিক্সের পর্দা কাঁপানো সিরিজ স্ট্রেঞ্জার থিংস-এর পঞ্চম ও শেষ সিজন সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে। আশির দশকের সেই নস্টালজিয়া, ইন্ডিয়ানার ছোট্ট শহর হকিন্স, আপসাইড ডাউনের ভুতুড়ে সব ঘটনা মিলিয়ে এই শো আমাদের মুগ্ধ করে রেখেছে। তবে এই কাল্পনিক গল্পের আড়ালেও লুকিয়ে আছে ওয়ার্মহোলের মতো সত্যিকারের বিজ্ঞানের কিছু জটিল তত্ত্ব। সিরিজে দেখানো এসব বিজ্ঞানের কতটা বাস্তব?

শেষ সিজনের একটা দৃশ্যে দেখা যায়, বিজ্ঞান শিক্ষক মিস্টার ক্লার্ক ক্লাসে ওয়ার্মহোল নিয়ে কথা বলছেন। তিনি শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করেন, ‘ওয়ার্মহোলের বিশেষত্ব কী?’ এরিকা সিনক্লেয়ার নামে একজন হাত তুলে বলে, ‘ওয়ার্মহোল চমৎকার কারণ এটি ডাইমেনশনের মাঝের বিশাল পথ পাড়ি না দিয়েই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।’ মিস্টার ক্লার্কও উচ্ছ্বসিত হয়ে যোগ করেন, ‘একদম ঠিক! ওয়ার্মহোলের সাহায্যে মানুষ অন্য গ্যালাক্সিতে, এমনকি অন্য সময়েও যেতে পারবে।’

বিজ্ঞান শিক্ষক মিস্টার ক্লার্ক তাঁর ক্লাসে ওয়ার্মহোল নিয়ে কথা বলছেন
ছবি: কসমোপলিটান ম্যাগাজিন

ক্লাসের বাকিরা হয়তো তখন হাই তুলছিল, কিন্তু ডাস্টিন ঠিকই বুঝেছিল ব্যাপারটা। ডাস্টিন একসময়  সত্যিকারের ওয়ার্মহোল শনাক্ত করে ফেলে। সে বন্ধুদের বোঝায়, ‘এটা একটা সেতু, সময় এবং স্থানের দুটি বিন্দুর মাঝের সংযোগ। পৃথিবী ও অন্য জগতের মাঝখানের রাস্তা।’

স্টার ট্রেক বা ইন্টারস্টেলার মুভিতে আমরা ওয়ার্মহোলের ধারণা দেখেছি। মহাকাশে ভ্রমণের জন্য এর চেয়ে দারুণ শর্টকাট আর হয় না। কিন্তু এই ধারণাটা কি শুধুই লেখকদের কল্পনা? মোটেই না। এর জন্ম হয়েছিল স্বয়ং আলবার্ট আইনস্টাইনের হাত ধরে।

আরও পড়ুন
এরিকা সিনক্লেয়ার নামে একজন হাত তুলে বলে, ‘ওয়ার্মহোল চমৎকার কারণ এটি ডাইমেনশনের মাঝের বিশাল পথ পাড়ি না দিয়েই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।’

আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটির মূল কথা, মহাবিশ্ব একটি বিশাল কাপড়ের টুকরো, যেখানে সময় ও স্থান একে অপরের সঙ্গে বোনা। ১৯৩৫ সালে আইনস্টাইন এবং তাঁর সহকর্মী নাথান রোজেন গাণিতিকভাবে দেখান, তত্ত্বিকভাবে স্থান ও সময়ের মধ্যে একটা সুড়ঙ্গ তৈরি হওয়া সম্ভব, যা দুটি দূরবর্তী বিন্দুকে যুক্ত করবে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় আইনস্টাইন-রোজেন ব্রিজ। একেই আমরা চিনি ওয়ার্মহোল নামে।

বিজ্ঞানীরা অবশ্য বারবার মনে করিয়ে দেন, বাস্তবে ওয়ার্মহোল তৈরি করা কিংবা এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া এখনো সম্ভব হয়নি। আমাদের জানা প্রযুক্তিতে এটি এখনো অধরা। কিন্তু তাই বলে এর গুরুত্ব কমছে না।

আইনস্টাইন-রোজেন সেতু বা ওয়ার্মহোল
ছবি: কেটিএসডিজাইন/সায়েন্স সোর্স

ক্যারল বলছেন, কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট বা মহাবিশ্বের জন্মরহস্য বুঝতে এই গাণিতিক মডেল বিজ্ঞানীদের দারুণ কাজে দেয়। আর এখানেই স্ট্রেঞ্জার থিংস সিরিজের সার্থকতা। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লিভারপুলের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক কারস্টেন ওয়েলশ তো তাঁর ছাত্রদের পদার্থবিজ্ঞান শেখাতে এই সিরিজটিকেই ব্যবহার করেন।

ওয়েলশ বলেন, ‘টিনেজারদের কাছে পদার্থবিজ্ঞান বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা বললেই ওরা পালায়। কিন্তু স্ট্রেঞ্জার থিংস-এর মতো সিরিজের মাধ্যমে ওদের বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো বোঝানো সহজ হয়। এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের বোঝাতে সুবিধা হয়। ওরাও সহজে প্রশ্ন করতে পারে। ওয়ার্মহোল দিয়ে আমরা হয়তো এখনই অন্য ডাইমেনশনে যেতে পারছি না, কিন্তু একদিন এই শিক্ষার্থীরাই হয়তো মহাবিশ্বের সব অজানা রহস্য ভেদ করবে। কে জানে, হয়তো তাদের হাত ধরেই আমরা একদিন সত্যি সত্যি নক্ষত্রের দেশে পাড়ি জমাব!

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

সূত্র: এনপিআর ডটকম

আরও পড়ুন