বিশ্বের সবচেয়ে বড় উল্কাপিণ্ড যেখানে পড়েছে, সেখানে কোনো গর্ত নেই কেন

বিশাল আকারের উল্কাপিণ্ডটা দেখে মনে হচ্ছিল, কেউ যেন ওটাকে আলতো করে মাটির ওপর বসিয়ে দিয়ে গেছেছবি: শাটারস্টোক ডটকম

১৯২০ সালের কথা। নামিবিয়ার গ্রুটফন্টেইন এলাকা। এক কৃষক আপনমনে নিজের জমিতে লাঙল দিচ্ছিলেন। হঠাৎ মাটির নিচে শক্ত কিছুতে আটকে গেল লাঙলটা। কৃষক ভাবলেন, হয়তো বড় কোনো পাথর হবে। কৌতূহলবশত খুঁড়তে শুরু করলেন তিনি। খুঁড়তেই বেরিয়ে এল এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য!

মাটির নিচে ঘাপটি মেরে আছে বিশাল এক ধাতব খণ্ড। ওজন প্রায় ৬০ টন! পরে জানা গেল, এটাই এখন পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে বড় উল্কাপিণ্ড। এর নাম দেওয়া হলো হোবা মেটিওরাইট। উল্কাটির ৮৪ ভাগই লোহা, বাকি ১৬ ভাগ নিকেল ও অন্যান্য উপাদান।

কিন্তু এই আবিষ্কারের চেয়েও বড় একটি রহস্য বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলল। সাধারণত মহাকাশ থেকে ছোটখাটো কোনো পাথর পড়লেও মাটিতে বিশাল গর্ত তৈরি হয়। অথচ ৬০ টনের এই দানবীয় উল্কাপিণ্ডটি আকাশ থেকে আছড়ে পড়ল, কিন্তু সেখানে কোনো বড় গর্ত নেই কেন? উল্কাপিণ্ডটা দেখে মনে হচ্ছিল, যেন কেউ ওটাকে আলতো করে মাটির ওপর বসিয়ে দিয়ে গেছে!

বিজ্ঞানীরা প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো এটি কোনো বড় উল্কার ভাঙা টুকরো। কিন্তু আশপাশে আর কোনো টুকরো পাওয়া গেল না। পরীক্ষায় দেখা গেল, এই মহাজাগতিক অতিথি পৃথিবীতে এসেছে প্রায় ৮০ হাজার বছর আগে। যেহেতু তখন কোনো লিখিত ইতিহাস ছিল না, তাই পদার্থবিজ্ঞানই হলো বিজ্ঞানীদের একমাত্র ভরসা।

আরও পড়ুন
এখন পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে বড় উল্কাপিণ্ডের নাম হোবা মেটিওরাইট। ওজন প্রায় ৬০ টন! উল্কাটির ৮৪ ভাগই লোহা, বাকি ১৬ ভাগ নিকেল ও অন্যান্য উপাদান।

গবেষকেরা কম্পিউটার মডেলিং করে দেখলেন, হোবা উল্কাপিণ্ডটির গঠন ও আকৃতিই একে চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়া থেকে বাঁচিয়েছে। উল্কাপিণ্ডটি লম্বায় ও চওড়ায় প্রায় ২.৭ মিটার হলেও পুরুত্বে মাত্র ৩ ফুট। অনেকটা চ্যাপ্টা স্লাবের মতো দেখতে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই উল্কাপিণ্ডটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে খুব খাড়াভাবে প্রবেশ করেনি। এটি পড়েছিল তুলনামূলক কম গতিতে।

হোবা মেটিওরাইটের ওজন প্রায় ৬০ টন
ছবি: শাটারস্টোক ডটকম

আমাদের বায়ুমণ্ডল এখানে একটা অনেকটা ব্রেকের কাজ করেছে। উল্কাপিণ্ডটির চ্যাপ্টা আকৃতির কারণে বায়ুমণ্ডলের বাধার মুখে এর গতি নাটকীয়ভাবে কমে যায়। মাটিতে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে গতি সেকেন্ডে মাত্র কয়েকশ মিটারে নেমে এসেছিল। ফলে মহাকাশের সেই বিধ্বংসী গতিবেগ আর ছিল না। ফলে উল্কাপিণ্ডটি কোনো বড় বিস্ফোরণ না ঘটিয়েই মাটিতে পড়েছিল।

গবেষকদের ধারণা, পড়ার সময় হয়তো ছোটখাটো একটা গর্ত তৈরি হয়েছিল। কিন্তু গত ৮০ হাজার বছরের রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে সেই গর্ত ভরাট হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।

নামিবিয়ার সেই খামারে আজও অক্ষত অবস্থায় আছে মহাকাশ থেকে আসা এই দানব।

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

আরও পড়ুন