সৌরজগতের শীতলতম স্থান

নক্ষত্রের চারপাশে বা সৌরজগতের ভেতরে নানা স্থানে যে উষ্ণতা থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এর বিপরীত চিত্রটা কেমন? শীতল স্থানের কথা যদি চিন্তা করি, সৌরজগতের কোন জায়গাটাকে সবচেয়ে শীতল বলা যাবে? সেখানকার তাপমাত্রা কত?

মহাশূন্যের কথা যদি চিন্তা করেন, তাহলে দেখবেন সেখানকার তুলনায় পৃথিবী বরাবরই অনেক উষ্ণ। বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখেছেন, মহাশূন্যের গড় তাপমাত্রা মাত্র ২.৭ কেলভিন! সেলসিয়াস স্কেলে শূন্যের নিচে ২৭০.৪৫ ডিগ্রি বা -৪৫৪.৮১ ডিগ্রি ফারেনহাইট। অর্থাৎ পরম শূন্যের প্রায় কাছাকাছি তাপমাত্রা। বলে রাখা ভালো, পরম শূন্য তাপমাত্রার নিচে আর কোনো তাপমাত্রা থাকতে পারে না। কারণ এই তাপমাত্রায় বস্তুর অণু-পরমাণুর গতি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। আর কেলভিন স্কেলে কোনো কিছুর তাপমাত্রা শূন্য হলে তাকে পরম শূন্য তাপমাত্রা বলে।

যাই হোক, মহাশূন্যের এই গড় তাপমাত্রা কিন্তু সৌরজগতের সব স্থানের জন্য খাটবে না। কারণ সূর্যের এই পরিবারে আছে গ্রহ-উপগ্রহ গ্রহাণু ইত্যাদি। এসব মহাজাগতিক বস্তু সূর্য থেকে আলো ও তাপ শক্তি শোষণ করে। তাই সূর্য ছাড়াও সৌরজগতের অনেক স্থানই বেশ উষ্ণ। এমনকি পৃথিবীর বুকেও মানুষ হাইড্রোজেন বোমার মাধ্যমে পারমাণবিক ফিউশন বিক্রিয়া ঘটাতে পারে। তৈরি করতে পারে সৌরপৃষ্ঠের চেয়েও অনেক বেশি তাপমাত্রা। আজকের গল্প অবশ্য সেটা নয়।

নক্ষত্রের চারপাশে বা সৌরজগতের ভেতরে নানা স্থানে যে উষ্ণতা থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এর বিপরীত চিত্রটা কেমন? শীতল স্থানের কথা যদি চিন্তা করি, সৌরজগতের কোন জায়গাটাকে সবচেয়ে শীতল বলা যাবে? সেখানকার তাপমাত্রা কত? পৃথিবীর সঙ্গে তুলনা করলে সেই তাপমাত্রা আসলে কেমন হবে? চলুন, সেই অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়া যাক।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞানীরা বলেন, প্লুটো শীতল জায়গা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সৌরজগতের সবচেয়ে শীতলতম স্থানটি সম্ভবত আমাদের অনেক কাছে।

তার আগে, মহাজাগতিক তাপমাত্রা কীভাবে পরিমাপ করা হয়, সেটা একটু জেনে নিই। যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কবেকের প্ল্যানেটারি সায়েন্স বা গ্রহবিজ্ঞান এবং অ্যাস্ট্রোবায়োলজির অধ্যাপক ইয়ান ক্রফোর্ড বলেন, যেকোনো মহাজাগতিক বস্তুর পৃষ্ঠতল থেকে নির্গত অবলাল ও মাইক্রোওয়েভ বিকিরণের তীব্রতা পর্যবেক্ষণ করে তাপমাত্রা মাপা যায়। এ ছাড়াও মহাশূন্যে কোনো জায়গায় সূর্য বা নক্ষত্রের আলো কী পরিমাণে পড়ছে, এ থেকে তাপমাত্রা নির্ণয় করা যায়।

মহাজাগতিক পরিমাপ বেশ জটিল কাজ। যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক ডন পোলাকোর মতে, ‘জ্যোতির্বিজ্ঞানে কোনো কিছুই একেবারে সরল নয়। এর প্রধান কারণ, এখানে পর্যবেক্ষণ করা হয়, কোনো মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে গবেষকদের সরাসরি মিথস্ক্রিয়া বা ইন্টার‍্যাকশন হয় না।’

তাই মহাকাশে তাপমাত্রা পরিমাপের সঠিক উপায় থাকলেও, সেটা বরাবরই আরও নিখুঁত করার সুযোগ থেকে যায়। চট করে তাই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। অধ্যাপক পোলাকো বলেন, 'আপনি যে তাপমাত্রা মাপছেন, সেটা কতটুকু সঠিক, তা নির্ভর করে আপনার অনুমিত প্রক্রিয়া কতটা ভালো, তার ওপর। পাশাপাশি, কতটা বিস্তারিত ও নিখুঁত গাণিতিক মডেল ব্যবহার করছেন, তার ওপরও নির্ভর করে বিষয়টা। যা-ই মাপি, শেষ পর্যন্ত এই মানটা আসলে সত্যিকার তাপমাত্রার একটা কাছাকাছি মান। শতভাগ নিখুঁত বলে ভেবে নেওয়া যাবে না।'

আরও পড়ুন

এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে যদি সৌরজগতের তাপমাত্রা মাপা হয়, তাহলে সবচেয়ে শীতলতম স্থান কোনটা হবে? অর্থাৎ আমাদের বর্তমান জ্ঞান, তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে সৌরজগতের শীতলতম স্থান কোনটি? প্লুটো হতে পারে? কারণ  প্লুটোর অবস্থানই তো সূর্য থেকে সবচেয়ে দূরে।

বিজ্ঞানীরা বলেন, প্লুটো শীতল জায়গা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সৌরজগতের সবচেয়ে শীতলতম স্থানটি সম্ভবত আমাদের অনেক কাছে।

২০০৯ সালে চাঁদের বুকে লুনার রিকনিস্যান্স অরবিটার নামে একটি রোবোটিক নভোযান পাঠায় নাসা। উদ্দেশ্য ছিল, চাঁদের অবস্থা সম্পর্কে নতুন সব তথ্য সংগ্রহ করা। সফল সেই মিশনের মাধ্যমে চাঁদের ব্যাপারে প্রচুর তথ্য পান বিজ্ঞানীরা। সেসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবস্থিত গাঢ় ছায়াযুক্ত খাদগুলো সৌরজগতের সবচেয়ে শীতল জায়গা হতে পারে।

পরে এই তত্ত্বটি আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করেন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহবিজ্ঞান বিষয়ক গবেষক প্যাট্রিক ও’ব্রায়েন এবং তাঁর সুপারভাইজার শেন বায়ার্ন। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ৫৩তম চন্দ্র ও গ্রহবিজ্ঞান সম্মেলনে তাঁরা নিজেদের গবেষণাপত্র পাঠ করেন। সেখানে তাঁরা বলেন, চাঁদের এই খাদগুলো দ্বিগুণ ছায়ায় ঢাকা। এখানে কোনোকালে সূর্যের আলো পড়েনি। শুধু যে সরাসরি আলো পড়েনি, তা নয়। চাঁদের পৃষ্ঠ বা কোনোকিছু থেকে প্রতিফলিত হওয়া আলোরও এখানে পড়ার সুযোগ নেই। পৃথিবী যেমন এর উত্তপ্ত কেন্দ্র থেকে কিছুটা তাপ পায়, চাঁদের সে সুযোগও নেই। তাই, এসব খাদের তলদেশ হয় প্রচণ্ড ঠান্ডা।

তাঁদের মতে, হাজারো কোটি বছর ধরে সূর্যের আলো পড়েনি চাঁদের এই অঞ্চলগুলোতে। ফলে থাকতে পারে 'মাইক্রো কোল্ড ট্র্যাপ' নামের বিশেষ ধরনের স্থান। যেখানে শুধু বরফ নয়, কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, ডাই-নাইট্রোজেন বা আর্গনের মতো পদার্থ জমাট অবস্থায় থাকতে পারে।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

ও'ব্রায়ান এবং বায়ার্নের হিসেব অনুযায়ী, এসব খাদের তলদেশের তাপমাত্রা প্রায় ২৫ কেলভিন। অর্থাৎ প্রায় মাইনাস ২৪৮.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যাঁদের জানতে ইচ্ছে করছে প্লুটোর তাপমাত্রা কত, তাঁদের জন্য বলি, প্লুটোর পৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ৪০.৪ কেলভিন। তাই সঙ্গত কারণেই চাঁদের এই খাদের তলদেশগুলোকে সৌরজগতের শীতলতম স্থান বলছেন বিজ্ঞানীরা।

হিসেবটা এলোমেলো হয়ে যাবে যদি সৌরজগতের প্রান্ত সীমায় অবস্থিত ওর্ট ক্লাউডের তাপমাত্রাকে বিবেচনায় নিই। সেখানকার তাপমাত্রা মাত্র ৫ কেলভিন। অর্থাৎ প্রায় মাইনাস ২৬৮.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ওর্ট ক্লাউডকে সৌরজগতের অংশ বলতে চান না অনেকেই। এই অঞ্চলকে বরং সৌরজগৎ এবং বাইরের আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যের মাঝে থাকা দেয়াল ভাবতে স্বাছন্দ্য বোধ করেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। যাই হোক, আমরা যদি আমাদের হিসেবে ওর্ট ক্লাউডকে না নিই, তাহলে সম্ভবত চাঁদের দক্ষিণ মেরুর খাদগুলোর তলদেশই হবে সৌরজগতের সবচেয়ে শীতল স্থান।

পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল জায়গাগুলোও চাঁদের খাদ কিংবা ওর্ট ক্লাউডের চেয়ে বহুগুণে উষ্ণ। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যান্ড ক্লাইমেট এক্সট্রিমস আর্কাইভ অনুসারে, এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে মাইনাস ৮৯.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৯৮৩ সালের ২১ জুলাই অ্যান্টার্কটিকায় রাশিয়ার ভস্তক গবেষণা কেন্দ্রে এ তাপমাত্রা রেকর্ড করেন বিজ্ঞানীরা।

এ তো গেল প্রাকৃতিক তাপমাত্রার গল্প। মানুষ কিন্তু এর চেয়েও অনেক কম তাপমাত্রা তৈরি করেছিল পৃথিবীতে বসেই। এই গত বছরেরই ঘটনা। জার্মান গবেষকদের একটি দল গবেষণাগারে তৈরি করেন প্রায় পরম শূন্য তাপমাত্রা। সেলসিয়াস স্কেলে প্রায় মাইনাস ২৭৩.১৫ ডিগ্রি সেলসিলাস। চরম ঠান্ডা সেই তাপমাত্রা কেন ও কীভাবে তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরা, সে গল্পটা নাহয় আরেকদিন করা যাবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা

সূত্র: লাইভ সায়েন্স