৬৬ বছরে রকেট উৎক্ষেপণের খরচ কমেছে ৯৬ ভাগ, আর কত কমবে
মহাকাশে রকেট পাঠানো মানেই একসময় ছিল কাড়ি কাড়ি টাকার ব্যাপার। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর মহাকাশ সংস্থা ছাড়া এই স্বপ্ন দেখার সাহস আর কারও ছিল না। কিন্তু হিসাবের খাতা বলছে অন্য কথা। ১৯৬০ সাল থেকে এ পর্যন্ত রকেট উৎক্ষেপণের খরচ প্রায় ৯৬ শতাংশ কমে গেছে! গবেষকরা বলছেন, ২০৪০ সালের মধ্যে এই খরচ আরও অবিশ্বাস্য হারে কমে যেতে পারে।
আপনি হয়তো ভাবছেন, খরচ কমার এই হিসাবটা গবেষকরা পেলেন কোথা থেকে? এর আগেও তো এমন অনেক গবেষণা হয়েছে। ইতালির পলিটেকনিকো ইউনিভার্সিটি অব তুরিনের গবেষক ফ্রান্সেস্কো নিকোলি ঠিক এই জায়গাটিতেই আঙুল তুলেছেন। আগের গবেষণাগুলোর একটা বড় গলদ ছিল, সেগুলোতে শুধু রকেট বানানোর খরচের হিসাব করা হয়েছিল। কিন্তু একটি রকেট তার পুরো জীবনচক্রে ঠিক কতটুকু জিনিসপত্র মহাকাশে বয়ে নিয়ে গেছে, সেই হিসাবটা তারা কখনোই করেনি। ফলে মহাকাশে যাওয়ার আসল খরচের চিত্রটা পরিষ্কার ছিল না।
এই খামতি পূরণের জন্য গবেষকেরা এবার ১৯৬০ থেকে শুরু করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৪ হাজার ৪০৫টি রকেট উৎক্ষেপণের বিশাল ডেটাবেস তৈরি করেছেন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারত থেকে শুরু করে অন্তত ১২টি দেশের তৈরি ৩৩০টির বেশি ভিন্ন ভিন্ন রকেটের হিসাব রয়েছে।
১৯৬০ সাল থেকে এ পর্যন্ত রকেট উৎক্ষেপণের খরচ প্রায় ৯৬ শতাংশ কমে গেছে! গবেষকরা বলছেন, ২০৪০ সালের মধ্যে এই খরচ আরও অবিশ্বাস্য হারে কমে যেতে পারে।
এই ডেটাবেস ঘেঁটে যে তথ্যটি বেরিয়ে এসেছে, তা রীতিমতো তাক লাগানো। ২০২৪ সালের মার্কিন ডলারের মান অনুযায়ী, ১৯৬০ সালে মহাকাশে মাত্র এক কেজি ওজনের কোনো বস্তু পাঠাতে খরচ পড়ত প্রায় ৮৭ হাজার ২৩ ডলার! আর ২০২৫ সালে এসে সেই একই ওজনের জিনিস পাঠাতে খরচ পড়ছে মাত্র ৩ হাজার ৮৬৮ ডলার। অর্থাৎ, খরচ কমেছে পাক্কা ৯৬ শতাংশ।
ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির গবেষক অ্যালেসিও তেরজি বলছেন, মহাকাশ শিল্প যেভাবে খরচ কমানোর এই কৌশল আয়ত্ত করেছে, অন্য কোনো শিল্পে এত দ্রুত এমনটা দেখা যায়নি। গবেষকেরা হিসাব করে দেখেছেন, মহাকাশে পাঠানো মোট জিনিসপত্রের পরিমাণ যখনই দ্বিগুণ হয়েছে, তখনই প্রতি কেজি বস্তু পাঠানোর গড় খরচ ২১.২ শতাংশ করে কমে গেছে! এই হার সোলার প্যানেলের খরচ কমানোর হারের চেয়েও অনেক বেশি।
এই জাদুর মতো খরচ কমার পেছনে মূল কারণ দুটি। প্রথমত, স্নায়ুযুদ্ধের অবসান এবং বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মহাকাশকে ব্যবহার করার প্রবণতা। স্নায়ুযুদ্ধের সময় রাষ্ট্রগুলো খরচের তোয়াক্কা না করেই নিজেদের মর্যাদার লড়াইয়ে রকেট ছুড়ত। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে মহাকাশ যাত্রা শুরু হওয়ার পর হিসাব-নিকাশ পাল্টে যায়। দ্বিতীয় কারণটি হলো স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ রকেট এবং এর প্রযুক্তি। রকেটগুলো একবার ব্যবহার করে ফেলে না দিয়ে বারবার ব্যবহার করার যে প্রযুক্তি স্পেসএক্স নিয়ে এসেছে, তা খরচ একদম তলানিতে নামিয়ে এনেছে।
গবেষকেরা হিসাব করে দেখেছেন, মহাকাশে পাঠানো মোট জিনিসপত্রের পরিমাণ যখনই দ্বিগুণ হয়েছে, তখনই প্রতি কেজি বস্তু পাঠানোর গড় খরচ ২১.২ শতাংশ করে কমে গেছে!
এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে মহাকাশে এক কেজি বস্তু পাঠাতে খরচ হবে মাত্র ১ হাজার ৬০০ ডলার। আর ২০৪০ সালে তা নেমে আসতে পারে মাত্র ৩০০ ডলারে!
তবে সব কিছুই যে এমন মসৃণ গতিতে চলবে, তা কিন্তু নয়। গবেষকেরা তিনটি বড় সমস্যার কথা জানিয়েছেন, যেগুলো এই খরচ কমার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
প্রথম সমস্যা হলো মহাকাশের আবর্জনা বা স্পেস জাঙ্ক। কক্ষপথে এই ধ্বংসাবশেষগুলো ঘণ্টায় প্রায় ২৭ হাজার কিলোমিটার বেগে ছুটে বেড়ায়। ফলে যেকোনো সময় বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। এই সংঘর্ষ থেকে তৈরি হতে পারে আরও হাজারো টুকরো আবর্জনা। নাসার বিজ্ঞানী ডোনাল্ড কেসলার ১৯৭৮ সালেই এমন এক ভয়াবহ অবস্থার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, যাকে এখন মহাকাশ বিজ্ঞানের ভাষায় কেসলার সিনড্রোম বলা হয়।
দ্বিতীয় সমস্যাটি হলো একচেটিয়া আধিপত্য। বর্তমানে মহাকাশে পাঠানো মোট জিনিসপত্রের প্রায় ৭৫ শতাংশই যায় স্পেসএক্সের মাধ্যমে। যখন কোনো একটি কোম্পানির এমন একচেটিয়া বাজার তৈরি হয়, তখন তারা ইচ্ছেমতো দাম বাড়ানোর সুযোগ পায়। আর এমনটা হলে রকেট উৎক্ষেপণের খরচ আবার বাড়তে পারে।
প্রথম সমস্যা হলো মহাকাশের আবর্জনা বা স্পেস জাঙ্ক। কক্ষপথে এই ধ্বংসাবশেষগুলো ঘণ্টায় প্রায় ২৭ হাজার কিলোমিটার বেগে ছুটে বেড়ায়। ফলে যেকোনো সময় বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।
তৃতীয় কারণটি ভূ-রাজনৈতিক। বর্তমানে বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে কোনো দেশই মহাকাশ যাত্রার জন্য স্পেসএক্সের মতো একটিমাত্র মার্কিন কোম্পানির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে চাইবে না। ফলে নিজেদের রকেট প্রযুক্তির পেছনে তারা হয়তো বিপুল অর্থ ঢালবে। নিজস্ব প্রযুক্তির এই রকেটগুলো যদি স্পেসএক্সের মতো সাশ্রয়ী না হয়, তবে সার্বিকভাবে মহাকাশ যাত্রার গড় খরচ আবার বেড়ে যাবে।
গত ১৪ জুলাই পিএনএএস নেক্সাস জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রটি আমাদের অন্তত এটুকু বুঝিয়ে দিয়েছে, মহাকাশ খাত এখন এমন এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে পুরোনো হিসাব-নিকাশ খুব দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। তবে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, মহাকাশ খুব শিগগিরই শুধু পরাশক্তিদের একচেটিয়া জায়গা থাকছে না।