চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ কেন লাল হয়ে যায়

পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ ধীরে ধীরে লাল রঙে রঙিন হয়ে উঠেছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ পৃথিবীর ছায়ার আড়ালে ঢাকা পড়ে। তখন পৃথিবী থেকে দেখা যায়, চাঁদের উজ্জ্বল পাশ ধীরে ধীরে লাল রঙে রঙিন হয়ে উঠছে। পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় লাল রং সবচেয়ে বেশি চোখে পড়লেও আংশিক চন্দ্রগ্রহণের সময়ও চাঁদের গায়ে হালকা লালচে আভা দেখা যায়। কিন্তু পৃথিবীর ছায়ায় ঢাকা পড়লে তো চাঁদ অন্ধকার বা কালো হয়ে যাওয়ার কথা, তাই না? তাহলে সেটি কালো না হয়ে উল্টো রক্তবর্ণ বা লাল কেন হয়?

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ভাষায় একে বলা হয় র‍্যালে স্ক্যাটারিং। ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী লর্ড র‍্যালের নামে আলোর এই বিচ্ছুরণের নামকরণ করা হয়েছে। এই নামের পেছনে কাজ করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কারসাজি। মহাজাগতিক এই দৃশ্যটি নিজের চোখে দেখতে পাবেন আজই। এটিই হতে যাচ্ছে চলতি বছরের একমাত্র পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ। সুযোগটা হাতছাড়া করলে আবার পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ দেখার জন্য ২০২৮ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

আংশিক চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের গায়ে হালকা লালচে আভা দেখা যায়
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

তবে এই মহাজাগতিক দৃশ্যে পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে কিন্তু একই রূপ দেখা যাবে না। কেউ হয়তো দেখবেন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ, আবার কেউ দেখবেন চাঁদ পৃথিবীর ছায়ার ঠিক প্রান্ত ঘেঁষে চলে যাচ্ছে। একে বলা হয় আংশিক চন্দ্রগ্রহণ। বাংলাদেশ থেকেও এই আংশিক চন্দ্রগ্রহণের দৃশ্য দেখতে পাওয়ার কথা।

আরও পড়ুন
পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় লাল রং সবচেয়ে বেশি চোখে পড়লেও আংশিক চন্দ্রগ্রহণের সময়ও চাঁদের গায়ে হালকা লালচে আভা দেখা যায়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ভাষায় একে বলা হয় র‍্যালে স্ক্যাটারিং।

চন্দ্রগ্রহণের মূল দৃশ্যটা শুরু হয় চাঁদ পৃথিবীর ছায়ার একদম কেন্দ্রীয় অংশে প্রবেশ করতে শুরু করলে। বিজ্ঞানীরা এই ঘন অন্ধকার জায়গার নাম দিয়েছেন আম্ব্রা। বাংলায় একে বলা হয় প্রচ্ছায়া। চাঁদ যখন এই প্রচ্ছায়ার ভেতরে ঢুকতে শুরু করে, ঠিক সেই মুহূর্তেই তার উজ্জ্বল রুপালি রূপটি বদলে গিয়ে গায়ে আগুনের মতো লাল আভা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নাসার বিজ্ঞানীরা জানান, চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ যখন পৃথিবীর ছায়ার একদম কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থান করে, তখনই এটি অদ্ভুত লালচে রং ধারণ করে। এই লাল রঙের কারণেই চন্দ্রগ্রহণকে অনেক সময় ব্লাড মুন বলা হয়। কিন্তু চাঁদ লাল দেখায় কেন?

ব্লাড মুন
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

আগেই বলেছি, এর পেছনে আছে র‍্যালে স্ক্যাটারিং। সূর্যের সাদা আলোর মধ্যে সাতটি রং থাকে। এই র‍্যালে স্ক্যাটারিংয়ের কারণেই বায়ুমণ্ডলের ছোট ছোট কণাগুলো নির্দিষ্ট কিছু রঙের আলো বেশি ছড়িয়ে দেয়, আর কিছু রং পার হতে দেয় অনায়াসে।

আসলে এ সময় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল একটি ফিল্টারের মতো কাজ করে। সূর্যের সাদা আলো যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে যায়, তখন বায়ুমণ্ডলের ধূলিকণা ও গ্যাস নীল বা বেগুনি রঙের মতো কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোগুলোকে চারদিকে ছড়িয়ে দেয় (বিচ্ছুরণ)। কিন্তু লাল বা কমলার মতো বেশি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোগুলো বায়ুমণ্ডল ভেদ করে সোজাসুজি চলে যেতে পারে।

আরও পড়ুন
নাসার বিজ্ঞানীরা জানান, চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ যখন পৃথিবীর ছায়ার একদম কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থান করে, তখনই এটি অদ্ভুত লালচে রং ধারণ করে। এজন্য চন্দ্রগ্রহণকে অনেক সময় ব্লাড মুন বলা হয়।

পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ একদম সরাসরি একই সরলরেখায় চলে আসে। ফলে পৃথিবীর বিশাল ছায়া চাঁদের ওপর পড়ে সূর্যের সরাসরি আলোকে আটকে দেয়। কিন্তু পুরোপুরি অন্ধকার হয় না কেন? কারণ, সূর্যের আলো সরাসরি পৌঁছাতে না পারলেও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তা কিছুটা বেঁকে চাঁদের ওপর গিয়ে পড়ে।

পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ একদম সরাসরি একই সরলরেখায় চলে আসে
ছবি: এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

লম্বা এই ভ্রমণের সময় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে থাকা ধূলিকণা ও গ্যাস একটি ফিল্টারের মতো কাজ করে।সূর্যের সাদা আলো যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে যায়, তখন বায়ুমণ্ডলের ধূলিকণা ও গ্যাস নীল বা বেগুনি রঙের মতো কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোগুলোকে চারদিকে ছড়িয়ে দেয় (বিচ্ছুরণ)। কিন্তু লাল বা কমলার মতো বেশি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোগুলো বায়ুমণ্ডল ভেদ করে সোজাসুজি চলে যেতে পারে। এই দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের লাল ও কমলা আলো বায়ুমণ্ডল ভেদ করে সোজা চলে যায় চাঁদের পৃষ্ঠের ওপর।

আসলে এ সময় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল লেন্সের মতো কাজ করে সূর্যের লাল আলোকে সামান্য বাঁকিয়ে দেয়। এই বাঁকিয়ে যাওয়া লাল আলো সরাসরি চাঁদের অন্ধকার অংশে গিয়ে পড়ে। যেহেতু নীল আলো আগেই বিচ্ছুরিত হয়ে হারিয়ে গেছে, শুধু লাল আলোটিই চাঁদের গায়ে প্রতিফলিত হয়। আর এভাবেই পৃথিবীর ছায়ার মধ্যে থেকেও চাঁদ কালো না হয়ে লাল রঙে দেখা যায়।

আরও পড়ুন
সূর্যের সাদা আলো যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে যায়, তখন বায়ুমণ্ডলের ধূলিকণা ও গ্যাস নীল বা বেগুনি রঙের মতো কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোগুলোকে চারদিকে ছড়িয়ে দেয়।

একটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ কিন্তু হঠাৎ করেই লাল হয়ে যায় না, এটি ধাপে ধাপে নিজের রং বদলায়। শুরুতে চাঁদকে কিছুটা ধূসর দেখায়, এরপর ধীরে ধীরে তা কমলা এবং সবশেষে গাঢ় লাল বা অ্যাম্বার রং ধারণ করে। তবে এই লাল রং কতটা উজ্জ্বল হবে, তা নির্ভর করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ওপর। যদি বায়ুমণ্ডলে ধূলিকণা বেশি থাকে, তবে চাঁদকে অনেক বেশি গাঢ় এবং রক্তবর্ণ দেখায়।

পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় শুরুতে চাঁদকে কিছুটা ধূসর দেখায়, এরপর ধীরে ধীরে তা কমলা এবং সবশেষে গাঢ় লাল রং ধারণ করে
ছবি: থমাস গ্রোহমান

তবে চাঁদ সব সময় পৃথিবীর ছায়ার আড়ালে পুরোপুরি ঢেকে যায় না। যখন সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ একদম নিখুঁতভাবে একই সরলরেখায় থাকে না, তখন ঘটে আংশিক চন্দ্রগ্রহণ। এ ক্ষেত্রে পৃথিবীর ছায়া চাঁদের কেবল একটি অংশকে গ্রাস করে, বাকিটা আগের মতোই উজ্জ্বল থাকে।

লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তা

সূত্র: লাইভ সায়েন্স ও নাসা

আরও পড়ুন