মহাকাশের নিখোঁজ নক্ষত্রের রহস্য উন্মোচন, ২৫ বছর পর মিলল হাইড্রোজেনহীন অদ্ভুত বিস্ফোরণের উত্তর
মহাকাশে এমন একটি অদ্ভুত নক্ষত্রের বিস্ফোরণ ঘটেছিল, যার কোনো হাইড্রোজেন বা সাধারণ জ্বালানি ছিল না! এই বিস্ফোরণের পর নক্ষত্রটি বিশাল ধূলিমেঘের আড়ালে টানা ২৫ বছর নিজেকে লুকিয়ে রাখে। সম্প্রতি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপগুলোর সাহায্যে বিজ্ঞানীরা এই নক্ষত্রের ভেতরের আসল অপরাধীকে খুঁজে পেয়েছেন।
খুনের পর অপরাধী যদি প্রমাণ লোপাট করতে পুরো ক্রাইম সিন সিকি শতাব্দীর জন্য লুকিয়ে ফেলে, তবে গোয়েন্দারা কী করবেন? মহাকাশের বুকে ঠিক এমন এক নিখুঁত ক্রাইম থ্রিলারের জন্ম দিয়েছিল ‘ভি৪৪৫ পাপিস’ নামে একটি নক্ষত্র। ২০০০ সালের শেষের দিকে এটি হঠাৎ প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে এবং মহাকাশবিজ্ঞানীদের কাছে নিজের অস্তিত্বের জানান দেয়। বিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের বিস্ফোরণকে বলা হয় নোভা। কিন্তু এই নোভাটি বিজ্ঞানীদের রীতিমতো ঘোল খাইয়ে ছেড়েছিল। কারণ, মহাকাশে সাধারণ যেকোনো নোভার প্রধান জ্বালানি হাইড্রোজেন। অথচ এই বিশাল বিস্ফোরণে হাইড্রোজেনের টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি!
ব্যাপারটা একটু খোলসা করে বলা যাক। সূর্যের মতো কোনো নক্ষত্রের যখন মৃত্যু ঘটে, তখন তার ফেলে যাওয়া উত্তপ্ত ও অতি-ঘন অবশিষ্টাংশকে বলা হয় শ্বেত বামন। এই শ্বেত বামনরা মহাকাশে সাধারণত একা থাকে না, এদের পাশে অনেক সময়ই একটি সঙ্গী নক্ষত্র থাকে। শ্বেত বামনটি তার প্রবল মহাকর্ষীয় টানে ওই সঙ্গী নক্ষত্র থেকে ধীরে ধীরে গ্যাস—মূলত হাইড্রোজেন—চুরি করতে থাকে। চুরি করা এই হাইড্রোজেন শ্বেত বামনের পৃষ্ঠে জমতে জমতে একসময় চাপ ও তাপ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যে, সেখানে আর ফিরে আসার কোনো পথ থাকে না। এরপরই ঘটে এক ভয়ংকর থার্মোনিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ। এটিই হলো সাধারণ নোভা। ধার করা হাইড্রোজেনের সাহায্যে ঘটা এই বিস্ফোরণ মহাকাশে হরহামেশাই দেখা যায়।
সূর্যের মতো কোনো নক্ষত্রের যখন মৃত্যু ঘটে, তখন তার ফেলে যাওয়া উত্তপ্ত ও অতি-ঘন অবশিষ্টাংশকে বলা হয় শ্বেত বামন। এই শ্বেত বামনরা মহাকাশে সাধারণত একা থাকে না।
কিন্তু আমাদের ‘ভি৪৪৫ পাপিস’ ছিল একেবারেই আলাদা ও বিদ্রোহী। এটি মহাকাশের এমন এক অদ্ভুত নোভা, যা বিন্দুমাত্র হাইড্রোজেন ছাড়াই বিস্ফোরিত হয়েছিল। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে এটিই এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত একমাত্র নিশ্চিত ‘হিলিয়াম নোভা’। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই অদ্ভুত বিস্ফোরণের পরপরই প্রমাণ লোপাট করতে নক্ষত্রটি নিজের চারপাশে এক বিশাল ধোঁয়াশার চাদর টেনে দেয়। এটি মহাকাশে এক ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) কিলোমিটারেরও বেশি জায়গা জুড়ে গ্যাস ও ধূলিকণার এমন এক পুরু আস্তরণ তৈরি করে, যার আড়ালে মূল নক্ষত্রযুগল পুরোপুরি ঢাকা পড়ে যায়। এরপর টানা দুই দশকের বেশি সময় ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দূর থেকে শুধু সেই ধূলিকণার মেঘকে প্রসারিত হতে দেখেছেন, কিন্তু মেঘের ভেতরে থাকা আসল অপরাধীকে আর চোখের দেখা দেখতে পাননি।
অবশেষে দীর্ঘ ২৫ বছর পর সেই মহাজাগতিক ধোঁয়াশা কিছুটা কাটতে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটির গবেষক জন মিলস এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মহাকাশের শক্তিশালী কয়েকটি টেলিস্কোপের ডেটা একসঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন। ভেরি লার্জ টেলিস্কোপের ইনফ্রারেড ডেটা, হাবল স্পেস টেলিস্কোপের ছবি, সাউদার্ন আফ্রিকান লার্জ টেলিস্কোপের টানা দুই দশকের স্পেকট্রোস্কোপি এবং নাসার টেস স্যাটেলাইটের ডেটা মিলিয়ে তিনি অবশেষে সেই লুকিয়ে থাকা নক্ষত্রযুগলের পর্দা উন্মোচন করেছেন।
ভি৪৪৫ পাপিস নক্ষত্রযুগলটি মহাকাশে এক ট্রিলিয়ন কিলোমিটারেরও বেশি জায়গা জুড়ে গ্যাস ও ধূলিকণার এমন এক পুরু আস্তরণ তৈরি করে, যার আড়ালে মূল নক্ষত্রযুগল পুরোপুরি ঢাকা পড়ে যায়।
দেখা গেল, সেই শ্বেত বামনটি মূলত একটি হিলিয়াম নক্ষত্র থেকে জ্বালানি চুরি করে নিচ্ছে। হিলিয়াম নক্ষত্র হলো এমন এক ধরনের তারা, যার বাইরের দিকের হাইড্রোজেনের আবরণটি পুরোপুরি খোয়া গেছে। হয়তো এই শ্বেত বামনটিই আগে সেটি চুরি করে আত্মসাৎ করেছে! আমাদের গ্যালাক্সিতে থাকা শত শত বিলিয়ন তারার মধ্যে এই হিলিয়াম তারাগুলো অকল্পনীয় রকমের বিরল; হয়তো এত বিশাল গ্যালাক্সিতে সব মিলিয়ে কয়েক হাজার পাওয়া যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, এই রহস্যময় যুগল একে অপরের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে ৩.৭ দিন সময় নেয়, যা আগের যেকোনো অনুমানের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দীর্ঘ। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, ধোঁয়াশা কাটার পর বিজ্ঞানীরা দেখতে পাচ্ছেন, সেই সুযোগসন্ধানী শ্বেত বামন আবারও তার সঙ্গী থেকে হিলিয়াম চুরি করা শুরু করে দিয়েছে!
বিস্ফোরণের সেই ধূলিমেঘের মধ্যে আরও একটি অদ্ভুত জিনিস বিজ্ঞানীদের নজরে এসেছে। সেখানে গ্যাসের কিছু বিশাল পিণ্ড (সম্ভবত অক্সিজেনে ভরপুর) ঘণ্টায় প্রায় এক কোটি বিশ লাখ কিলোমিটার বেগে ছুটে বেড়াচ্ছে! গবেষক মিলসের ধারণা, মূল বিস্ফোরণের পর এগুলো ছিটকে বেরিয়েছিল। তবে মহাকাশের অন্য কোনো নোভায় এত ভয়ংকর গতির এমন অদ্ভুত গ্যাসের পিণ্ড আগে কখনোই দেখা যায়নি।
হিলিয়াম নক্ষত্র হলো এমন এক ধরনের তারা, যার বাইরের দিকের হাইড্রোজেনের আবরণটি পুরোপুরি খোয়া গেছে। হয়তো এই শ্বেত বামনটিই আগে সেটি চুরি করে আত্মসাৎ করেছে!
এখন আপনার মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে, মহাকাশের কোনো এক কোণে থাকা একটা অদ্ভুত নক্ষত্র নিয়ে আমাদের এত মাথাব্যথার কী আছে? কারণটা অত্যন্ত গভীর। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই ধরনের বারবার ঘটা হিলিয়াম বিস্ফোরণগুলো একসময় নক্ষত্রটিকে টাইপ ওয়ান-এ সুপারনোভার দিকে ঠেলে দিতে পারে। আর এই টাইপ ওয়ান-এ সুপারনোভা হলো মহাকাশবিজ্ঞানের এক পরম আশীর্বাদ। মহাবিশ্বের বিশাল দূরত্ব মাপতে এদের স্ট্যান্ডার্ড ক্যান্ডেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এদের আলোর তীব্রতা এতটাই নিখুঁত ও নির্ভরযোগ্য যে, এর ওপর ভিত্তি করেই বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন আমাদের মহাবিশ্ব ক্রমশ দ্রুতগতিতে প্রসারিত হচ্ছে।
‘ভি৪৪৫ পাপিস’ শেষ পর্যন্ত সত্যিই সেই কাঙ্ক্ষিত সুপারনোভায় পরিণত হবে কি না, তা হয়তো এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে মহাকাশের এই বিরল ঘটনাটি বিজ্ঞানীদের হাতে এমন এক দারুণ ও বাস্তব পরীক্ষাগার তুলে দিয়েছে, যা দিয়ে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে মহাবিশ্বের বিস্তৃতির আরও অনেক বড় রহস্যের জট খোলা সম্ভব হবে। আর পথে পথে থাকা ওই রহস্যময় গ্যাসের পিণ্ডগুলো তো রয়েছেই!