বিজ্ঞানীরা কীভাবে এক্সোপ্ল্যানেট খুঁজে পান

এক্সোপ্ল্যানেটের কাল্পনিক ছবিছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

মহাকাশবিজ্ঞানের সবচেয়ে আগ্রহী বিষয়গুলোর মধ্যে একটি এক্সোপ্ল্যানেট। গ্যালিলিওর দূরবীন আবিষ্কারের পর প্রথম সত্যিকারের এক্সোপ্ল্যানেটটি খুঁজে পেতে বিজ্ঞানীদের সময় লেগেছিল ৩৮৩ বছর!

কেন এত সময় লাগল? কারণটা খুব সোজা। প্রথমত, এই গ্রহগুলো আমাদের থেকে অনেক অনেক দূরে, তাই এগুলো খুবই ক্ষীণ। দ্বিতীয়ত, এরা এমন একটি নক্ষত্রের চারপাশে ঘোরে, যার আলো এতই তীব্র যে তার ঝলকানিতে পাশে থাকা গ্রহটিকে দেখা প্রায় অসম্ভব। বিশাল সার্চলাইটের পাশে বসে থাকা জোনাকি পোকাকে দূর থেকে দেখার মতো বিষয়!

এত সব বাধা পেরিয়ে বিজ্ঞানীরা মূলত চারটি দুর্দান্ত কৌশল বের করেছেন এক্সোপ্ল্যানেট খুঁজে বের করতে।

আরও পড়ুন
এক্সোপ্ল্যানেটগুলো এমন একটি নক্ষত্রের চারপাশে ঘোরে, যার আলো এতই তীব্র যে তার ঝলকানিতে পাশে থাকা গ্রহটিকে দেখা প্রায় অসম্ভব।

১. রেডিয়াল ভেলোসিটি

এটিই ছিল এক্সোপ্ল্যানেট খোঁজার প্রথম সফল পদ্ধতি। এখনো অন্য কোনো উপায়ে গ্রহের সন্ধান পেলে এই পদ্ধতি দিয়েই তা নিশ্চিত করা হয়।

এর মূল ভিত্তি হলো নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র। গ্রহ যেমন নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে, তেমনি গ্রহের মহাকর্ষের টানে নক্ষত্রও কিন্তু কিছুটা প্রভাবিত হয়! আসলে কোনো গ্রহই নক্ষত্রের ঠিক কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করে না। দুটি বস্তুই একটি সাধারণ বিন্দুর চারদিকে ঘোরে। এ কারণে গ্রহের টানে নক্ষত্রটি তার জায়গায় সামান্য কাঁপতে থাকে বা সামনে-পেছনে দোলে।

নক্ষত্র যখন গ্রহের টানে আমাদের দিকে একটু এগিয়ে আসে, তখন তার আলো কিছুটা নীলচে হয়ে যায়
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

নক্ষত্রের এই সামান্য কাঁপুনি আমরা সরাসরি দেখতে পাই না। কিন্তু নক্ষত্রটি যখন গ্রহের টানে আমাদের দিকে একটু এগিয়ে আসে, তখন তার আলো কিছুটা নীলচে হয়ে যায়। আবার যখন দূরে সরে যায়, তখন আলো কিছুটা লালচে হয়ে যায়। আলোর এই নিয়মিত রং বদলানো দেখেই বিজ্ঞানীরা বুঝে যান, ওই নক্ষত্রের চারপাশে নিশ্চয়ই কোনো গ্রহ লুকিয়ে আছে!

তাত্ত্বিকভাবে প্রায় সব গ্রহের ক্ষেত্রেই এই পদ্ধতি কাজ করে। এটি খুব ধীর গতির প্রক্রিয়া। দীর্ঘদিন ধরে নক্ষত্রের দিকে টেলিস্কোপ তাক করে বসে থাকতে হয়। পৃথিবীর মতো ছোট গ্রহগুলো নক্ষত্রকে খুব একটা কাঁপাতে পারে না বলে তাদের খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।

আরও পড়ুন
কোনো গ্রহই নক্ষত্রের ঠিক কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করে না। দুটি বস্তুই একটি সাধারণ বিন্দুর চারদিকে ঘোরে। এ কারণে গ্রহের টানে নক্ষত্রটি তার জায়গায় সামান্য কাঁপতে থাকে বা সামনে-পেছনে দোলে।

২. ট্রানজিট মেথড

বিজ্ঞানের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া ৬ হাজারের বেশি এক্সোপ্ল্যানেটের সিংহভাগই আবিষ্কৃত হয়েছে এই ট্রানজিট মেথড পদ্ধতিতে।

পদ্ধতিটা খুব চমৎকার। একটি গ্রহ ঘুরতে ঘুরতে যখন আমাদের এবং তার নক্ষত্রের ঠিক মাঝখান দিয়ে যায়, তখন নক্ষত্রের আলো সামান্য একটু কমে যায় বা ম্লান হয়। একেই বলে ট্রানজিট। নাসার বিখ্যাত কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ এবং বর্তমানের টেস স্যাটেলাইট ঠিক এই কাজটিই করে। একটি নক্ষত্রের আলো যদি একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর নিয়মিতভাবে ম্লান হতে থাকে, তবে ধরে নেওয়া যায় সেখানে একটি গ্রহ আছে।

শিল্পীর কল্পনায় নাসার বিখ্যাত কেপলার স্পেস টেলিস্কোপের ছবি
ছবি: নাসা / ইএসএ / সিএসএ / এসটিএসসিএল

এই পদ্ধতিতে একসঙ্গে হাজার হাজার নক্ষত্রের ওপর নজর রাখা যায়। গ্রহটি কত বড় এবং তার কক্ষপথ কেমন, তা-ও জানা যায়। সবচেয়ে বড় কথা, গ্রহটিতে বায়ুমণ্ডল আছে কি না এবং সেখানে প্রাণের কোনো বায়োসিগনেচার বা গ্যাস আছে কি না, তা-ও এই পদ্ধতিতে আলো বিশ্লেষণ করে জানা সম্ভব! তবে অসুবিধা হলো, গ্রহটির কক্ষপথ যদি ঠিক আমাদের চোখের সোজাসুজি না হয়, তবে এই পদ্ধতিতে তাকে জীবনেও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

আরও পড়ুন
একটি গ্রহ ঘুরতে ঘুরতে যখন আমাদের এবং তার নক্ষত্রের ঠিক মাঝখান দিয়ে যায়, তখন নক্ষত্রের আলো সামান্য একটু কমে যায় বা ম্লান হয়। একেই বলে ট্রানজিট।

৩. গ্র্যাভিটেশনাল মাইক্রোলেন্সিং

এটি একটি বিরল কিন্তু দারুণ পদ্ধতি। আইনস্টাইন বলে গেছেন, মহাকর্ষের কারণে আলো বেঁকে যায়। যখন একটি নক্ষত্র দূরের অন্য কোনো নক্ষত্রের ঠিক সামনে দিয়ে যায়, তখন সামনের নক্ষত্রের মহাকর্ষ পেছনের নক্ষত্রের আলোকে লেন্সের মতো বাঁকিয়ে উজ্জ্বল করে দেয়।

মহাকর্ষের কারণে আলো বেঁকে যায়
ছবি: রোয়েন কেলি

এখন সামনের নক্ষত্রটির চারপাশে যদি কোনো গ্রহ থাকে, তবে সেই গ্রহের ভরের কারণে আলোর উজ্জ্বলতায় আরও একটি ছোট আকস্মিক ঝিলিক দেখা যায়। একেই বলে মাইক্রোলেন্সিং।

গ্রহের ভর মাপার জন্য এটি দারুণ একটি পদ্ধতি। কিন্তু মহাকাশ এতই বিশাল যে, দুটি নক্ষত্র ঠিক এক লাইনে আসার ঘটনা খুব বিরল। আর একবার এমনটা ঘটলে, সেই গ্রহকে দ্বিতীয়বার পর্যবেক্ষণ করে নিশ্চিত হতে কয়েক দশক পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে!

৪. ডিরেক্ট ইমেজিং

নক্ষত্রের তীব্র আলোর কারণে এক্সোপ্ল্যানেটের সরাসরি ছবি তোলা প্রায় অসম্ভব। তবে বিজ্ঞানীদের ডিকশনারিতে অসম্ভব শব্দটা বেশি দিন টেকে না! বিজ্ঞানীরা এখন কিছু কিছু গ্রহের সরাসরি ছবি তুলতে পারছেন। তবে এগুলো সাধারণ গ্রহ নয়। এই গ্রহগুলো বয়সে একেবারেই তরুণ এবং জন্মের সময়কার প্রচণ্ড তাপের কারণে এগুলো এখনো অবলোহিত আলোতে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে। এই গ্রহগুলো যদি তাদের নক্ষত্র থেকে বেশ দূরে থাকে, তবে বিজ্ঞানীরা বিশেষ প্রযুক্তিতে নক্ষত্রের আলোকে ঢেকে দিয়ে সরাসরি গ্রহটির ইনফ্রারেড ছবি তুলে ফেলেন। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা কিছু গ্রহের নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করার দারুণ সব টাইম-ল্যাপ্স ভিডিও পর্যন্ত তৈরি করেছেন!

লেখক: ফ্রন্টেন্ড ডেভলপার, সফটভেঞ্চ

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

আরও পড়ুন