সব গ্যালাক্সি কি একই দিকে ঘোরে

গ্যালাক্সি বলতেই আমাদের মাথায় ঘুরতে থাকে মহাকাশে ঘূর্ণায়মান চাকতির মতো কোনো মহাজাগতিক বিশালাকার বস্তু, যার মধ্যে রয়েছে অসংখ্য নক্ষত্র, গ্যাসীয় পদার্থ, ধূলিকণা, ডার্ক ম্যাটারসহ আরও কত কী! স্কুলের বইয়ে গ্যালাক্সির এই চাকতি ধরনের ছবি দেখতে দেখতে একটা বদ্ধমূল ধারণা আমাদের মনে গেঁথে গেছে; ছায়াপথগুলো যেন একেকটা স্বাধীন নক্ষত্রের দ্বীপ, যেগুলো গ্যাস, ধূলিকণা সংগ্রহ করতে করতে গড়ে ওঠে, মহাশূন্যে ঘুরতে থাকে, বিবর্তিত হয়, আবার একসময় অন্য কোনো ছায়াপথের সঙ্গে মিশে যায়। গঠনগত দিক থেকে ছায়াপথগুলোর ঘূর্ণন এলোমেলো হওয়া উচিত; কিন্তু বাস্তবে সেরকম কোনো বিশৃঙ্খলা বিজ্ঞানীদের নজরে পড়ে না। অবাক করার বিষয় হচ্ছে, এই বিশাল মহাবিশ্বের বিশৃঙ্খলা এত কম!

গ্যালাক্সিগুলোর ঘূর্ণনের জন্য দায়ী এক বৃহৎ কসমিক ওয়েব। এটি মহাবিশ্বের এমন এক বৃহত্তম কাঠামো, যা পুরো মহাবিশ্বকে একটি সুতোর জালের ন্যায় সংযুক্ত করে রেখেছে। বিজ্ঞানীরা একে মহাজাগতিক ফিলামেন্টও বলে থাকেন।

গ্যালাক্সিগুলোর ঘূর্ণনের জন্য দায়ী এক বৃহৎ কসমিক ওয়েব
ছবি: ম্যাক্স-প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স

মূলত এটি ডার্ক ম্যাটার, গ্যাস, ছায়াপথ ও ক্লাস্টার দিয়ে তৈরি মহাশূন্যে ভাসমান সুবিশাল এক নেটওয়ার্ক। এর অন্দরেই ছায়াপথগুলো বেড়ে ওঠে, নক্ষত্ররা এর সঙ্গে সঙ্গেই ভাসতে থাকে; অবশেষে মহাকর্ষের টানে জটিল আকার ধারণ করে। আসলে ছায়াপথগুলো বিচ্ছিন্নভাবে তৈরি হয় না, আর মহাজাগতিক বড় স্কেলে পদার্থগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কোনো মহাজাগতিক কাঠামোও তৈরি করে না। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, মহাজাগতিক জালগুলো কীভাবে ছায়াপথের ঘূর্ণনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?

আরও পড়ুন
গ্যালাক্সিগুলোর ঘূর্ণনের জন্য দায়ী এক বৃহৎ কসমিক ওয়েব। এটি মহাবিশ্বের এমন এক বৃহত্তম কাঠামো, যা পুরো মহাবিশ্বকে একটি সুতোর জালের ন্যায় সংযুক্ত করে রেখেছে।

এটি বুঝতে গেলে আমাদের টাইডাল টর্ক তত্ত্বটি একটু বুঝতে হবে। এই তত্ত্ব বলে, ছায়াপথের কৌণিক ভরবেগের সৃষ্টি হয়েছে তার চারপাশে অসমভাবে বিন্যস্ত পদার্থগুলোর পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ায় উদ্ভূত টর্কের কারণে। আসলে সৃষ্টির শুরুতে মহাবিশ্বের সর্বত্র পদার্থের বণ্টন সমান ছিল না। সে কারণে জায়গায় জায়গায় ঘনত্বের পার্থক্য তৈরি হয় এবং জন্ম নেয় অসম মহাকর্ষীয় টান। ফলে নির্মীয়মাণ গ্যালাক্সিগুলো, অর্থাৎ প্রোটোগ্যালাক্সিগুলো একসময় টর্কের কবলে পড়ে, যার কারণে তারা কৌণিক ভরবেগ অর্জন করে। ১৯৬৯ সালে জিম পিবলস প্রথম এই ধারণা দেন।

তার মানে এই নয় যে সমস্ত ছায়াপথ একই দিকে ঘোরে; কিছু ছায়াপথ ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরে, আবার কিছু বিপরীত দিকেও ঘোরে। যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী লিওর শামির জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের অত্যাধুনিক ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখেন, তিন ভাগের দুই ভাগ ছায়াপথ ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরে, আর অবশিষ্ট এক ভাগ ঘোরে বিপরীত দিকে। ২৬৩টি ছায়াপথের ঘূর্ণন বিশ্লেষণ করে শামির এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মাঝে এই ফলাফল একই সঙ্গে কৌতূহলোদ্দীপক ও বিতর্কিত। জেমস ওয়েবের তোলা ছবি বিশ্লেষণে খুব সতর্ক না থাকলে অজস্র ছবির মাঝে গুরুত্বপূর্ণ ছবি বাছাই করা, তাদের শ্রেণিবিন্যাস, ছবির ধরন, এমনকি টেলিস্কোপের জ্যামিতিও অনেক সময় প্রকৃত পর্যবেক্ষণের পথকে বন্ধুর করে তোলে।

জেমস ওয়েবের তোলা ছবিতে লাল রঙের গ্যালাক্সিগুলো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির দিকে ঘোরে এবং নীল রঙের গ্যালাক্সিগুলো ঘোরে বিপরীত দিকে

এ ছাড়া ভরভিত্তিক পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কম ভরের গ্যালাক্সিগুলোর স্পিন মহাজাগতিক ফিলামেন্টের দৈর্ঘ্যের সঙ্গে সমান্তরালভাবে থাকে। অপেক্ষাকৃত ভারী গ্যালাক্সিগুলোর স্পিন মহাজাগতিক ফিলামেন্টের সঙ্গে থাকে উল্লম্বভাবে। সাধারণত ফিলামেন্টের চারপাশ থেকে ঠান্ডা হাইড্রোজেন গ্যাস ফিলামেন্টের ভেতরের দিকে সর্পিলাকারে আকর্ষিত হয়। এই গ্যাস যখন কম ভরের গ্যালাক্সির কেন্দ্রের দিকে প্রবেশ করে, তখন তা ফিলামেন্টের অক্ষের সমান্তরালে গ্যালাক্সিটিকে ঘোরাতে শুরু করে। ফলে গ্যালাক্সির ঘূর্ণন অক্ষ ফিলামেন্টের সঙ্গে মিলে যায়।

আরও পড়ুন
নির্মীয়মাণ গ্যালাক্সিগুলো, অর্থাৎ প্রোটোগ্যালাক্সিগুলো একসময় টর্কের কবলে পড়ে, যার কারণে তারা কৌণিক ভরবেগ অর্জন করে। ১৯৬৯ সালে জিম পিবলস প্রথম এই ধারণা দেন।

আবার দুটি কম ভরের গ্যালাক্সি ফিলামেন্ট বরাবর তীব্র বেগে এগিয়ে যাওয়ার সময় যাত্রাপথে একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেলে তাদের নিজস্ব কৌণিক ভরবেগ একে অপরকে প্রভাবিত করে। এই সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট বড় গ্যালাক্সিটির ঘূর্ণন অক্ষ সম্পূর্ণ ঘুরে গিয়ে মহাজাগতিক ফিলামেন্টের সঙ্গে উল্লম্ব হয়ে যায়। গ্যালাক্সির এই ঘূর্ণন বিন্যাসে লুকিয়ে আছে তার সৃষ্টিরহস্য ও বিবর্তনের হদিস। বিশেষত ঘূর্ণনের দিক বিশ্লেষণ করে জানা যায়, গ্যালাক্সিটি কী গ্যাস শোষণ করে বড় হয়েছে, নাকি কোনো বড় সংঘর্ষের সাক্ষী বহন করছে। অন্যভাবে বললে, গ্যালাক্সির কৌণিক ভরবেগ বা স্পিন তার স্মৃতির কাজ করে।

ঘূর্ণনের দিক বিশ্লেষণ করে জানা যায়, গ্যালাক্সিটি কী গ্যাস শোষণ করে বড় হয়েছে, নাকি কোনো বড় সংঘর্ষের সাক্ষী বহন করছে
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

মহাবিশ্বের রহস্যসন্ধানী পাঠকের মনে একটি প্রশ্ন উঁকি দিতে পারে। গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ তথা মহাবিশ্বের সব উপাদান প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছে, তবে কি এই মহাবিশ্বও ঘূর্ণায়মান? এককথায় বলা যায় না। কারণ, এ ক্ষেত্রে আধুনিক কসমোলজির মূল দুই ভিত্তি সমজাতীয়তা ও সমসত্ত্বতার নীতি লঙ্ঘিত হয়। মহাবিশ্বের যদি কোনো ঘূর্ণন থাকত, তাহলে কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ডে তার হদিস পাওয়া যেত। কিন্তু বিজ্ঞানীরা সেরকম কোনো হদিস এখনো পাননি।

আরও পড়ুন
বিখ্যাত গণিতবিদ কুর্ট গোডেল ১৯৪৯ সালে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সূত্রের ওপর ভিত্তি করে একটি ঘূর্ণায়মান মহাবিশ্বের মডেল তৈরি করেছিলেন। যদিও তাঁর মডেলে কিছু অদ্ভুত সমস্যা ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইস্তভান সাজাপুদি গত বছরে তাঁর এক গবেষণায় দাবি করেন, মহাবিশ্ব খুবই ধীরগতিতে ঘুরছে; ৫০০ বিলিয়ন বছরে একবার ঘুরপাক খায় মাত্র। কিন্তু সেই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত জ্যোতির্বিজ্ঞান মহলে সাদরে গৃহীত হয়নি। কারণ এ ক্ষেত্রে ল্যাম্বডা-সিডিএম মডেল ধাক্কা খাচ্ছে। তবে সাজাপুদি প্রথম নন, বিখ্যাত গণিতবিদ কুর্ট গোডেল ১৯৪৯ সালে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সূত্রের ওপর ভিত্তি করে একটি ঘূর্ণায়মান মহাবিশ্বের মডেল তৈরি করেছিলেন। যদিও গোডেলের মডেলে কিছু অদ্ভুত সমস্যা ছিল। আলোর বক্রগতি, টাইম লুপের মতো বিষয়কে তিনি গণনায় নিয়ে এসেছিলেন। সাজাপুদি তাঁদের মডেলে সন্তর্পণে এসব সমস্যা পাশ কাটিয়ে গেছেন।

মহাবিশ্বের ঘূর্ণনের গাণিতিক সম্ভাবনা থাকলেও পরীক্ষামূলক পোক্ত কোনো প্রমাণ পদার্থবিদদের কাছে নেই। বর্তমানে সুপারকম্পিউটারের সাহায্যে জটিল সিমুলেশন চালানো হচ্ছে; অদূর ভবিষ্যতে যদি কোনো গ্রহণযোগ্য ফলাফল মেলে, তবে হাবল টেনশনের মতো মস্ত বড় ধাঁধার সমাধান হতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী।

লেখক: পদার্থবিদ, স্টেট ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি, কলকাতা

আরও পড়ুন