নক্ষত্রহীন কোনো উপগ্রহে কি প্রাণ থাকতে পারে

গ্রহ তার বিশাল মহাকর্ষ বল দ্বারা চাঁদকে নিজের দিকে টানেছবি: আইস্টক

মহাকাশের ঘুটঘুটে অন্ধকারে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিছু গ্রহ। এদের কোনো নিজস্ব নক্ষত্র নেই, কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানাও নেই। বিজ্ঞানীরা এদের নাম দিয়েছেন রোগ প্ল্যানেট বা ভবঘুরে গ্রহ। এদের সংখ্যা কিন্তু নেহাত কম নয়; আমাদের ছায়াপথে যতগুলো নক্ষত্র আছে, ঠিক ততগুলোই ভবঘুরে গ্রহ থাকতে পারে। আর এদের অনেকগুলোরই নিজস্ব চাঁদ আছে, যার কোনো কোনোটা আবার আমাদের পৃথিবীর সমান বড়! জার্মানির মিউনিখের লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডেভিড ডালবুডিং এবং তাঁর দলের নতুন এক গবেষণা বলছে, সূর্য থেকে যোজন যোজন দূরে থাকা এসব ছন্নছাড়া গ্রহের চাঁদে তরল পানি, এমনকি প্রাণের অস্তিত্বও থাকতে পারে!

আমাদের ছায়াপথে যতগুলো নক্ষত্র আছে, ঠিক ততগুলোই ভবঘুরে গ্রহ থাকতে পারে
ছবি: নাসা

প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক, সূর্য ছাড়া এসব চাঁদে তাপ আসবে কোথা থেকে? আর তাপ না থাকলে তো তরল পানি জমে বরফ হয়ে যাওয়ার কথা! এর সহজ উত্তর হলো, টাইডাল হিটিং বা জোয়ার-ভাটা জনিত তাপ। গ্রহের বিশাল মহাকর্ষ বল যখন তার চাঁদকে নিজের দিকে টানে এবং ছাড়ে, তখন চাঁদের ভেতরে একধরনের ঘর্ষণ তৈরি হয়। এই ঘর্ষণের ফলেই ভেতর থেকে বিপুল তাপ উৎপন্ন হয়। আমাদের সৌরজগতের শনি গ্রহের চাঁদ এনসেলাডাস বা বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপাতেও ঠিক এই কারণেই বরফের স্তরের নিচে বিশাল তরল মহাসাগর টিকে আছে। এমনকি বৃহস্পতির আরেক চাঁদ আইওতে যে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত হয়, তার পেছনেও সূর্যের কোনো হাত নেই, পুরোটাই এই টাইডাল হিটিংয়ের খেলা।

আরও পড়ুন
গ্রহের বিশাল মহাকর্ষ বল যখন তার চাঁদকে নিজের দিকে টানে এবং ছাড়ে, তখন চাঁদের ভেতরে একধরনের ঘর্ষণ তৈরি হয়। এই ঘর্ষণের ফলেই ভেতর থেকে বিপুল তাপ উৎপন্ন হয়।

কিন্তু ইউরোপা বা এনসেলাডাসের মতো চাঁদে তো বিশাল বরফের আচ্ছাদন আছে, যা ভেতরের তাপকে বাইরে যেতে দেয় না। ভবঘুরে চাঁদের পৃষ্ঠে তরল পানি থাকলে, বরফের আচ্ছাদন ছাড়া সেই তাপ আটকে থাকবে কীভাবে? শুরুতে লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক গবেষক জুলিয়া রোসেটি ধারণা করেছিলেন, হয়তো কার্বন ডাই-অক্সাইডের এক বিশাল বায়ুমণ্ডল সেই তাপ ধরে রাখতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, তাপ আটকে রাখার জন্য বায়ুমণ্ডলের যে বিশাল চাপ দরকার, সেই প্রচণ্ড চাপে এবং তুলনামূলক কম তাপে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিজেই জমে তরল বা বরফ হয়ে যায়। ফলে বায়ুমণ্ডলটাই ধসে পড়ে এবং চাঁদটি পুরোপুরি জমে যায়।

ইউরোপা উপগ্রহে বিশাল বরফের আচ্ছাদন আছে, যা ভেতরের তাপকে বাইরে যেতে দেয় না
ছবি: নাসা

এখানেই জাদুকরী এক বিকল্প সমাধান নিয়ে এসেছে হাইড্রোজেন গ্যাস। হাইড্রোজেন অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় ছাড়া তরল বা বরফ হয় না। এমনিতে হাইড্রোজেন গ্যাস ইনফ্রারেড এনার্জি বা তাপ ধরে রাখতে পারে না, তাপ সোজা মহাকাশে বেরিয়ে যায়। কিন্তু যখন এর ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে, তখন অণুগুলোর মধ্যে অবিরাম সংঘর্ষ তৈরি হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে কলিশন-ইনডিউসড অ্যাবজরপশন। তখন এই হাইড্রোজেন গ্যাসই একটা বিশাল গ্রিনহাউস কম্বলের মতো কাজ করে। ফলে কেবল গ্রহের টাইডাল হিটিংয়ের তাপেই চাঁদের পৃষ্ঠে পানি তরল অবস্থায় থাকার মতো যথেষ্ট উষ্ণতা তৈরি হয়।

গবেষকেরা বিকিরণ ও রাসায়নিক মডেল ব্যবহার করে বিভিন্ন কম্পিউটার সিমুলেশন চালিয়ে দেখেছেন, যদি এমন কোনো চাঁদে পৃথিবীর সমান বায়ুমণ্ডলীয় চাপ থাকে, তবে সেখানে সাড়ে ৯ কোটি বছর পর্যন্ত পানি তরল থাকতে পারে। আর অবাক করা বিষয় হলো, চাপ যদি পৃথিবীর চেয়ে ১০০ গুণ বেশি হয়, তবে পানি তরল থাকতে পারে টানা ৪৩০ কোটি বছর! আমাদের পৃথিবীর বয়সও ঠিক এমনই।

আরও পড়ুন
যখন হাইড্রোজেন গ্যাসের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে, তখন অণুগুলোর মধ্যে অবিরাম সংঘর্ষ তৈরি হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে কলিশন-ইনডিউসড অ্যাবজরপশন।

যেখানে তরল পানি আছে, সেখানে প্রাণ সৃষ্টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আরএনএ (RNA) তৈরির দারুণ সুযোগ থাকে। ভবঘুরে গ্রহের চারপাশে এসব চাঁদের কক্ষপথ সাধারণত বেশ উপবৃত্তাকার বা ডিম্বাকার হয়। ফলে চাঁদের পৃষ্ঠের পানিতে বিশাল জোয়ার-ভাটা তৈরি হয়। পৃথিবীতে চাঁদের আকর্ষণে যেমন জোয়ার-ভাটা হয়, এখানে ঘটে ঠিক তার উল্টো ঘটনা। গ্রহের আকর্ষণে চাঁদে জোয়ার-ভাটা হয়। এই ক্রমাগত ভেজা ও শুকনো চক্র আরএনএ তৈরির জন্য একদম আদর্শ পরিবেশ। পৃথিবীতেও শুরুর দিকে এভাবেই প্রাণের সঞ্চার হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। আর ওই ভবঘুরে চাঁদে এই জোয়ার-ভাটার আকার হবে পৃথিবীর চেয়ে বহুগুণ বড়!

পৃথিবীতে চাঁদের আকর্ষণে জোয়ার-ভাটা হয়
ছবি: নাসা

এখনো পর্যন্ত আমরা সরাসরি এমন কোনো ভবঘুরে গ্রহের চাঁদের খোঁজ পাইনি। তবে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র বলছে, আমাদের গ্যালাক্সিতেই এমন শত শত কোটি চাঁদ থাকার সম্ভাবনা প্রবল। প্রযুক্তির যে হারে উন্নতি হচ্ছে, তাতে এমন কোনো চাঁদের খোঁজ পাওয়া হয়তো এখন শুধুই সময়ের ব্যাপার। কে জানে, হয়তো একদিন আমরা সত্যিই এমন কোনো সূর্যহীন চাঁদে প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পাব! স্বপ্ন দেখতে তো আর দোষ নেই।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, গণিত বিভাগ, পদ্মা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শরীয়তপুর

সূত্র: ইউনিভার্স টুডে

আরও পড়ুন