সৌরজগতে শুধু পৃথিবীতেই কেন টেকটোনিক প্লেট আছে
পৃথিবীর বিশাল সব পর্বতমালা, ভয়ংকর ভূমিকম্প কিংবা মহাদেশগুলোর ধীরে ধীরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরে যাওয়া—এই সব কিছুর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে আমাদের পায়ের অনেক নিচের টেকটোনিক প্লেট!
কিন্তু যত দূর আমরা জানি, আমাদের সৌরজগতের আর কোনো গ্রহ বা উপগ্রহে বর্তমানে এমন সক্রিয় ও সুগঠিত টেকটোনিক প্লেটের অস্তিত্ব নেই!
কিন্তু কেন? কেন পুরো সৌরজগতের মধ্যে শুধু পৃথিবীতেই এমন প্লেট আছে। সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ থেকে কেন এটি আলাদা?
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির জিওডায়নামিসিস্ট ব্র্যাডফোর্ড ফোলি এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমরা এর নিখুঁত উত্তর এখনো জানি না। আজকের দিনে ভূপ্রকৃতিবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্যগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম!’
জিওফিজিসিস্ট রাসেল পিসক্লিওয়েক বলেন, যখন দুটি প্লেট একে অপরের দিকে এগিয়ে এসে ধাক্কা খায় এবং একটি প্লেট অন্যটির নিচে ঢুকে যায়, তখন সাগরের পানি ওই পাথরের স্তরের সঙ্গে নিচে চলে যায়।
টেকটোনিক প্লেট আসলে কী
পৃথিবীর ওপরের শক্ত আবরণ এবং তার ঠিক নিচের ম্যান্টলের ওপরের অংশটিকে একসঙ্গে লিথোস্ফিয়ার বলা হয়। পৃথিবীর এই লিথোস্ফিয়ার কোনো আস্ত ডিমের খোসার মতো নয়; বরং এটি একটি ভাঙা জিগস পাজলের মতো প্রায় ১৫টি বড় বড় টুকরোয় বিভক্ত। এই টুকরোগুলোকেই আমরা বলি টেকটোনিক প্লেট। এরা সব সময় একে অপরের দিকে এগোচ্ছে, ধাক্কা খাচ্ছে অথবা দূরে সরে যাচ্ছে। এই প্লেটগুলো ঠিক কীভাবে বা কেন প্রথম ভেঙে টুকরো হয়েছিল, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো বিতর্ক আছে। তবে পৃথিবীর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই প্লেটগুলোকে এখনো সচল রেখেছে।
পৃথিবীতে প্লেটগুলোর এমন সচল থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় জাদুকরী উপাদানটি হলো আমাদের মহাসাগরের তরল পানি! টরন্টো ইউনিভার্সিটির জিওফিজিসিস্ট রাসেল পিসক্লিওয়েক এই বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, যখন দুটি প্লেট একে অপরের দিকে এগিয়ে এসে ধাক্কা খায় এবং একটি প্লেট অন্যটির নিচে ঢুকে যায়, তখন সাগরের পানি ওই পাথরের স্তরের সঙ্গে নিচে চলে যায়। এই পানি তখন পাথরগুলোর মাঝে একধরনের লুব্রিকেন্ট বা পিচ্ছিলকারক পদার্থ হিসেবে কাজ করে! পানির এই পিচ্ছিল করার ক্ষমতার কারণেই প্লেটগুলো এত সহজে একে অপরের ওপর দিয়ে বা নিচ দিয়ে পিছলে যেতে পারে।
তাহলে সৌরজগতের অন্য পাথুরে গ্রহগুলোর কী অবস্থা? উদাহরণ হিসেবে আমরা মঙ্গলের কথা ভাবতে পারি। মঙ্গল গ্রহের ভেতরেও পৃথিবীর মতো উত্তপ্ত ম্যান্টলের নড়াচড়া আছে। কিন্তু এর ওপরের ভূত্বকটি পৃথিবীর মতো অনেকগুলো প্লেটে ভাঙা নয়!
পৃথিবীর এই লিথোস্ফিয়ার কোনো আস্ত ডিমের খোসার মতো নয়; বরং এটি একটি ভাঙা জিগস পাজলের মতো প্রায় ১৫টি বড় বড় টুকরোয় বিভক্ত। এই টুকরোগুলোকেই আমরা বলি টেকটোনিক প্লেট।
বিজ্ঞানী ফোলির মতে, মঙ্গলের এই অবস্থাকে বলা হয় স্ট্যাগন্যান্ট লিড বা আটকে পড়া ঢাকনা। অর্থাৎ, এর ওপরের পুরো ভূত্বকটি একটিমাত্র বিশাল এবং অখণ্ড প্লেট দিয়ে তৈরি, যা পুরো গ্রহটিকে একটি হাঁড়ির ঢাকনার মতো ঢেকে রেখেছে! ভেতরের লাভা নড়াচড়া করলেও ওপরের এই শক্ত ঢাকনাটি কখনো ভাঙে না বা সরে যায় না।
পৃথিবী ছাড়া সৌরজগতে টেকটোনিক প্লেটের সবচেয়ে কাছাকাছি কিছু যদি থেকে থাকে, তবে তা আছে বৃহস্পতির বরফে ঢাকা উপগ্রহ ইউরোপাতে। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেন, ইউরোপার ওপরের বরফের খোলসের কিছু অংশ ভেঙে প্লেটের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল এবং একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিল।
নিচের একটু উষ্ণ পানি হয়তো এই বরফের প্লেটগুলোকে ভাসিয়ে রেখেছিল। কিন্তু বরফ যেহেতু পানির চেয়ে হালকা, তাই পৃথিবীর পাথরের প্লেটগুলো যেমন ভারী হয়ে ম্যান্টলের নিচে ডুবে যায়, ইউরোপার বরফের প্লেটগুলো সেভাবে নিচে ডুবতে পারে না। তাছাড়া ইউরোপার এই প্লেটের নড়াচড়া পুরো উপগ্রহজুড়ে ঘটে না। এটি অনেকটা জোড়াতালি দেওয়া, কোথাও হয়তো একটু নড়াচড়া হচ্ছে, আবার কোথাও একদম শান্ত! এটি সব সময় ঘটেও না, মাঝে মাঝে শুরু হয়, আবার থেমে যায়।
ফোলির মতে, আমাদের আসল সমস্যা হলো, আমাদের কাছে তুলনা করার মতো অন্য কোনো গ্রহ নেই। সৌরজগতে পৃথিবীই একমাত্র উদাহরণ। আমাদের কাছে যদি পৃথিবীর মতো আরও এক শ পাথুরে গ্রহ থাকত, তাহলে আমরা সহজেই মিলিয়ে দেখতে পারতাম ঠিক কোন কোন কারণে একটি গ্রহে টেকটোনিক প্লেট তৈরি হয়। কিন্তু মাত্র একটি গ্রহ দিয়ে এই বিশাল রহস্যের সমাধান করা সত্যিই অনেক কঠিন!