বৃহস্পতি গ্রহের বজ্রপাত পৃথিবীর চেয়ে ১০০ গুণ শক্তিশালী
কালবৈশাখীর রাতে আকাশে যখন কানফাটানো শব্দে বাজ পড়ে, তখন বুকটা কেমন কেঁপে ওঠে। পৃথিবীতে একটি সাধারণ বজ্রপাতে প্রায় এক গিগাজুল শক্তি থাকে। এই শক্তি একটি আস্ত গাছকে চিরে ফেলার জন্য বা একটি শহরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অচল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু আপনি কি জানেন, আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ বৃহস্পতিতে যে বজ্রপাত হয়, তার সামনে পৃথিবীর এই ভয়ংকর বাজ অতি সামান্য।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এজিইউ অ্যাডভান্সেস জার্নালে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা বলছে, গ্যাসীয় দৈত্য বৃহস্পতি গ্রহে নিয়মিত এমন সব বজ্রপাত হয়, যা পৃথিবীর বজ্রপাতের চেয়ে অন্তত ১০০ গুণ বেশি শক্তিশালী!
বৃহস্পতির আবহাওয়া ও পৃথিবীর আবহাওয়া মোটেও এক নয়। এর ঝড়গুলোর আকার শুনলে আপনার চোখ কপালে উঠবে! গ্রহটির বিখ্যাত গ্রেট রেড স্পট ১০ হাজার মাইলেরও বেশি চওড়া ঘূর্ণি। সেখানে ঘণ্টায় ২০০ মাইল বেগে বাতাস বয় এবং এটি গত ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একটানা তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে! এই পুরোটা সময় ধরে এই দানবীয় ঝড়গুলো অগণিত ভয়ংকর বজ্রপাতের জন্ম দিয়ে চলেছে।
নভোযানগুলো আগে যখন বৃহস্পতির পাশ দিয়ে যেত, তখন গ্রহটির রাতের দিকে বড় বড় আলোর ঝলক দেখতে পেত। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ছিলেন না সেখানে কি সব সময়ই এমন ভয়ংকর বাজ পড়ে, নাকি ছোটখাটো বজ্রপাতও হয়? এই রহস্য সমাধান করে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার নভোযান জুনো। ২০১৬ সাল থেকে এটি বৃহস্পতিকে প্রদক্ষিণ করছে।
বৃহস্পতি গ্রহটির বিখ্যাত গ্রেট রেড স্পট ১০ হাজার মাইলেরও বেশি চওড়া ঘূর্ণি। সেখানে ঘণ্টায় ২০০ মাইল বেগে বাতাস বয় এবং এটি গত ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একটানা তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে!
২০২১ এবং ২০২২ সালের দিকে গ্রহটির উত্তর নিরক্ষীয় বলয়ে আবহাওয়া যখন একটু শান্ত ছিল, তখন জুনো, হাবল স্পেস টেলিস্কোপ এবং কিছু ভলান্টিয়ার বিজ্ঞানীর সাহায্যে গবেষকেরা সরাসরি নির্দিষ্ট কিছু ঝড়ের ওপর নজর রাখতে সক্ষম হন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি, বার্কলের বিজ্ঞানী মাইকেল ওং জানান, নির্দিষ্ট একটি ঝড়ের ওপর নজর রাখতে পারায় তাঁরা সরাসরি এই বজ্রপাতের শক্তি মাপতে পেরেছেন।
ফলাফল ছিল রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো! জুনোর মাইক্রোওয়েভ রেডিওমিটার যন্ত্রটি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিনবার বজ্রপাতের সংকেত ধরেছে। একবার তো এটি ২০৬টি পালস বা ধাক্কা রেকর্ড করে! বিজ্ঞানীরা ৬১৩টি মাইক্রোওয়েভ বার্স্ট বিশ্লেষণ করে দেখেন, এই বজ্রপাতগুলোর শক্তি সাধারণ পৃথিবীর বজ্রপাতের সমান থেকে শুরু করে অন্তত ১০০ গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে! কিছু কিছু গাণিতিক হিসাবে দেখা গেছে, এই শক্তি পৃথিবীর বজ্রপাতের চেয়ে ৫০০ থেকে ১০ হাজার গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে!
এখন প্রশ্ন হলো, বৃহস্পতির বজ্রপাত এত শক্তিশালী কেন? মূল প্রবন্ধে বলা হয়েছে, নাইট্রোজেনের চেয়ে হাইড্রোজেন ভারী হওয়ার কারণে এমনটা হয়। কিন্তু এর পেছনের আসল বিজ্ঞান হলো, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে থাকা নাইট্রোজেনের চেয়ে বৃহস্পতির হাইড্রোজেন অনেক বেশি হালকা। উল্লেখ্য, হাইড্রোজেনই মহাবিশ্বের সবচেয়ে হালকা মৌল।
বিজ্ঞানীরা ৬১৩টি মাইক্রোওয়েভ বার্স্ট বিশ্লেষণ করে দেখেন, বৃহস্পতি গ্রহের এই বজ্রপাতগুলোর শক্তি সাধারণ পৃথিবীর বজ্রপাতের সমান থেকে শুরু করে অন্তত ১০০ গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে!
মজার ব্যাপার হলো, এই মেঘ তৈরি করতে যে আর্দ্র বাতাসের দরকার, তা হাইড্রোজেনের চেয়ে অনেক ভারী! পৃথিবীতে জলীয় বাষ্প সাধারণ বাতাসের চেয়ে হালকা হওয়ায় তা সহজেই ওপরে উঠে যায়। কিন্তু বৃহস্পতির এই হালকা বায়ুমণ্ডলে ভারী জলীয় বাষ্পের মেঘকে ধাক্কা দিয়ে ওপরে তুলতে প্রকৃতির প্রচণ্ড শক্তির প্রয়োজন হয়। যখন এই বিশাল মেঘের স্তর অনেক ওপরে উঠে ঘর্ষণের সৃষ্টি করে, তখন যে ইলেকট্রিক চার্জ তৈরি হয়, তা অকল্পনীয় মাত্রার এক ভয়ংকর বজ্রপাতের জন্ম দেয়!
বিজ্ঞানী ওং-এর মতে, এই বিশাল মেঘের উচ্চতা এবং বায়ুমণ্ডলের দূরত্বের কারণেই হয়তো বৃহস্পতির বজ্রপাত এতটা দানবীয় আকার ধারণ করে।