মহাবিশ্বের অদৃশ্য শক্তি এবং স্ট্রিং থিওরি

বিজ্ঞানীদের মতে, স্ট্রিং থিওরি দিয়ে আমাদের ডার্ক এনার্জিযুক্ত মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করা যায়ছবি: কোয়ান্টাম ম্যাগাজিন

১৯৯৮ সাল। মহাকাশবিজ্ঞানীদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! তাঁরা টেলিস্কোপে চোখ রেখে দেখলেন, মহাবিশ্ব শুধু প্রসারিতই হচ্ছে না, বরং এই প্রসারণের গতি দিনদিন বাড়ছে। এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে এক রহস্যময় শক্তি। এই শক্তির নাম দেওয়া হয় ডার্ক এনার্জি—গুপ্তশক্তি। ডার্ক এনার্জি হলো ধনাত্মক শক্তি। অথচ আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে সুন্দর তত্ত্ব স্ট্রিং থিওরি এতদিন বলছিল উল্টো কথা।

স্ট্রিং থিওরির সমীকরণগুলো কাজ করত এমন এক মহাবিশ্বে, যার শক্তি ঋণাত্মক। বিজ্ঞানীরা একে বলেন অ্যান্টি-ডি সিটার স্পেস। সোজা কথায়, আমরা বাস করি ধনাত্মক শক্তির জগতে, আর স্ট্রিং থিওরি কাজ করে ঋণাত্মক শক্তির কাল্পনিক জগতে। সমালোচকেরা তাই হাসাহাসি করে বলতেন, ‘স্ট্রিং থিওরি কেবল গণিতের খাতায়ই সুন্দর, বাস্তবে এর কোনো দাম নেই।’

মহাবিশ্বের প্রসারণের পেছনে কলকাঠি নাড়ছে রহস্যময় ডার্ক এনার্জি
ছবি: ইউনিভার্স টুডে / নাসা

কিন্তু এই অপবাদ সম্ভবত মুছতে যাচ্ছে। সম্প্রতি দুই পদার্থবিদ এমন এক গাণিতিক পথ দেখিয়েছেন, যা স্ট্রিং থিওরি দিয়ে আমাদের ডার্ক এনার্জিযুক্ত মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে পারে। স্পেনের ইনস্টিটিউট ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিকসের দুই বিজ্ঞানী ব্রুনো বেন্টো এবং মিগুয়েল মন্টেরো এই অসাধ্য সাধন করেছেন। তাঁরা স্ট্রিং থিওরি ব্যবহার করে এমন একটি মডেল দাঁড় করিয়েছেন, যা আমাদের মহাবিশ্বের মতোই ধনাত্মক বা ডি-সিটার মহাবিশ্বের বর্ণনা দেয়। বেলজিয়ামের পদার্থবিদ থমাস ভ্যান রিট তো বলেই দিয়েছেন, ‘স্ট্রিং থিওরি থেকে পাওয়া ধনাত্মক শক্তির মহাবিশ্বের এটিই প্রথম স্পষ্ট উদাহরণ।’

আরও পড়ুন
স্ট্রিং থিওরির সমীকরণগুলো কাজ করত এমন এক মহাবিশ্বে, যার শক্তি ঋণাত্মক। বিজ্ঞানীরা একে বলেন অ্যান্টি-ডি সিটার স্পেস।

বিজ্ঞানী বেন্টো এবং মন্টেরো ব্যবহার করেছেন ৭৫ বছর পুরোনো এক কোয়ান্টাম ভেলকি, যার নাম ক্যাসিমির ইফেক্ট। ব্যাপারটা একটু সহজ করে বলি। মহাশূন্য বা ভ্যাকুয়াম আসলে পুরোপুরি খালি নয়। সেখানে প্রতিনিয়ত কণা উঁকি দেয় আবার মিলিয়ে যায়। এদের বলা হয় ভার্চ্যুয়াল কণা।

আপনি যদি খুব কাছাকাছি দুটো ধাতব পাত রাখেন, তবে ওই চিপার মধ্যে সব ধরনের কণা ঢুকতে পারবে না। ফলে বাইরের চেয়ে ভেতরের চাপ কমে যাবে। এই চাপের পার্থক্যের নামই ক্যাসিমির ইফেক্ট। স্ট্রিং থিওরি বলে, মহাবিশ্বে আমাদের চেনা ৪টি মাত্রা (দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা ও সময়) ছাড়াও আরও বাড়তি মাত্রা বা ডাইমেনশন আছে। এগুলো খুবই ছোট হয়ে কুঁকড়ে আছে। বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, এই কুঁকড়ে থাকা মাত্রাগুলোর ভেতরেও যদি ক্যাসিমির ইফেক্টের মতো ঘটনা ঘটে?

ক্যাসিমির ইফেক্ট
ছবি: উইকিপিডিয়া

তাঁরা হিসাব করে দেখলেন, এই কুঁকড়ে থাকা মাত্রাগুলোর ভেতরের চাপ ও ফ্লাক্স মিলে এমন এক শক্তি তৈরি করে, যা হুবহু ডার্ক এনার্জির মতো আচরণ করে! ফ্লাক্স হলো একধরনের তড়িৎচৌম্বকীয় বলরেখা। মজার ব্যাপার হলো, তাঁদের গাণিতিক মডেলে ডার্ক এনার্জির যে মান এসেছে, তা ধনাত্মক। তাঁদের এই নতুন থিওরি একটা ভবিষ্যদ্বাণী করেছে—ডার্ক এনার্জি স্থির নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি দুর্বল হয়ে যাবে।

২০২৫ সালে ডার্ক এনার্জি স্পেকট্রোস্কোপিক ইন্সট্রুমেন্ট মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করে যে তথ্য দিয়েছে, তার সঙ্গে এই থিওরি মিলে যাচ্ছে! পর্যবেক্ষণেও দেখা গেছে, ডার্ক এনার্জি হয়তো সময়ের সঙ্গে শক্তি হারাচ্ছে। আইনস্টাইন ভেবেছিলেন এই শক্তি ধ্রুবক বা কনস্ট্যান্ট, কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, আইনস্টাইন হয়তো এখানে ভুল ছিলেন।

আরও পড়ুন
স্ট্রিং থিওরি বলে, মহাবিশ্বে আমাদের চেনা ৪টি মাত্রা- দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা ও সময় ছাড়াও আরও বাড়তি মাত্রা বা ডাইমেনশন আছে। এগুলো খুবই ছোট হয়ে কুঁকড়ে আছে।

সবই তো ভালো, কিন্তু একটা বড় গণ্ডগোল এখনো মেটেনি। বেন্টো ও মন্টেরো যে মহাবিশ্বের মডেল তৈরি করেছেন, তা পাঁচ মাত্রার (5D)! অথচ আমরা থাকি চার মাত্রার (4D) জগতে। মানে তাঁদের সমীকরণে একটা ডাইমেনশন বেশি রয়ে গেছে। বিজ্ঞানী আন্তোনিও প্যাডিলা যেমনটা বলেছেন, ‘তাঁরা একটা পাঁচ মাত্রার সমাধান বের করেছেন, কিন্তু আমরা তো পাঁচ মাত্রার জগতে থাকি না!’

গবেষকরাও সেটা মানছেন। ব্রুনো বেন্টো বলেছেন, ‘আমরা যদি এটাকে চার মাত্রায় নামিয়ে আনতে না পারি, তবে এটাই শেষ কথা নয়।’

স্ট্রিং থিওরি কাজ করে ঋণাত্মক শক্তির কাল্পনিক জগতে
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

তবুও বিজ্ঞানীরা আশাবাদী। কারণ, এতদিন স্ট্রিং থিওরি ধনাত্মক এনার্জির ধারের কাছেও যেতে পারছিল না। এখন অন্তত দরজাটা খুলেছে। পাঁচ মাত্রা থেকে চার মাত্রায় নামিয়ে আনার জন্য এখন নতুন উদ্যমে কাজ শুরু হবে। স্ট্রিং থিওরি কি শেষ পর্যন্ত আমাদের মহাবিশ্বের থিওরি অব এভরিথিং হতে পারবে? উত্তরটা সময়ের হাতেই তোলা থাক। তবে এটুকু বলা যায়, বিজ্ঞানের গল্পে একটা নতুন অধ্যায় শুরু হলো মাত্র!

লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়, শশিকর, মাদারীপুর

সূত্র: কোয়ান্টাম ম্যাগাজিন

আরও পড়ুন