হঠাৎ বদলে যাচ্ছে সৌরজগতের একটি ছোট্ট বস্তুর রিং, রহস্য ধরল জেমস ওয়েব

শিল্পীর কল্পনায় চ্যারিকলো গ্রহাণুর ছবিছবি: সাইডট নিউজ

মহাকাশে বলয় বলতেই আপনার চোখের সামনে নিশ্চয়ই শনি গ্রহের সেই রাজকীয় ছবি ভেসে ওঠে। সৌরজগতের সবচেয়ে সুন্দর এই অলংকারের জন্য শনির কদর সবার চেয়ে আলাদা। আমাদের চেনা ইউরেনাস, নেপচুন বা বৃহস্পতিরও রিং আছে, তবে সেগুলো শনির মতো অতটা জাঁকজমকপূর্ণ নয়। কিন্তু মহাকাশের নিয়মকানুন যে কতটা অদ্ভুত, তা প্রমাণ করতে এবার মঞ্চে হাজির হয়েছে একেবারে ছোট্ট একটি মহাজাগতিক পাথরখণ্ড। এর নাম চ্যারিকলো।

আকারে মাত্র ২৫০ কিলোমিটার চওড়া এই গ্রহাণুটি সূর্যের চারদিকে ঘুরছে শনি ও ইউরেনাসের ঠিক মাঝখান দিয়ে। বিজ্ঞানীরা একে ডাকেন সেন্টর পরিবারের সদস্য বলে। গ্রিক পুরাণের অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক ঘোড়ার রূপকথার দানবদের মতো, মহাকাশের এই সেন্টররাও গ্রহাণু ও ধূমকেতুর এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত ক্ষুদ্র হওয়ার পরও এর চারপাশে রয়েছে চমৎকার দুটি পুরু রিং! সম্প্রতি মহাকাশের সবচেয়ে শক্তিশালী চোখ জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ এই রিংগুলোর এমন এক অদ্ভুত পরিবর্তন ধরেছে, যা বিজ্ঞানীদের রীতিমতো অবাক করেছে।

২০১৩ সালে যখন প্রথম চ্যারিকলোর রিং আবিষ্কার হয়, তখন জ্যোতির্বিজ্ঞানের দুনিয়ায় রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা আগে ভাবতেন, রিং থাকার মতো আভিজাত্য শুধু বড় গ্রহগুলোরই মানায়। কিন্তু চ্যারিকলো এবং এর চেয়েও ছোট কাইরন নামে আরেকটি বস্তু প্রমাণ করে দিয়েছে, মহাকাশে ছোটদেরও ফ্যাশন করার অধিকার আছে! তবে সেই ফ্যাশন যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমন অদ্ভুতভাবে বদলাবে, তা কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি।

আরও পড়ুন
আকারে মাত্র ২৫০ কিলোমিটার চওড়া চ্যারিকলো গ্রহাণুটি সূর্যের চারদিকে ঘুরছে শনি ও ইউরেনাসের ঠিক মাঝখান দিয়ে। বিজ্ঞানীরা একে ডাকেন সেন্টর পরিবারের সদস্য বলে।

স্পেনের ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোফিজিক্স অব আন্দালুসিয়ার একদল গবেষক ২০২২ সালের অক্টোবরে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ দিয়ে এই গ্রহাণুটির ওপর নজরদারি শুরু করেন। মহাকাশের এত দূরের কোনো ছোট বস্তুকে সরাসরি দেখা যায় না। তাই বিজ্ঞানীরা স্টেলার অকালটেশন নামে একটি দারুণ কৌশল ব্যবহার করেন। এর মানে, চ্যারিকলো যখন কোনো দূরের তারার সামনে দিয়ে পার হয়, তখন তারার আলো কতটুকু বাধা পেল বা কমে গেল, তা মেপে এই গ্রহাণু ও এর রিংয়ের আকার-আকৃতি বোঝা যায়। ব্যাপারটা অনেকটা এমন—অনেক দূরে জ্বলতে থাকা একটি বাতির সামনে দিয়ে একটি মশা উড়ে গেলে বাতির আলো ঠিক যতটুকু ম্লান হয়, সেই ম্লান আলোর হিসাব কষে মশাটির ডানার আকার মেপে ফেলা!

গত এক দশকের পুরোনো তথ্যের সঙ্গে জেমস ওয়েবের নতুন ডেটা মিলিয়ে গবেষক দলের প্রধান পাবলো সান্তোস-সাঞ্জ এক চমকপ্রদ বিষয় আবিষ্কার করেন। তিনি দেখলেন, চ্যারিকলোর দুটি রিং সম্পূর্ণ বিপরীত আচরণ করছে! ভেতরের দিকের রিংটি আগের চেয়ে অনেক বেশি অস্বচ্ছ বা ঘন হয়ে গেছে, অন্যদিকে বাইরের রিংটি হয়ে গেছে বেশ হালকা। এত ছোট একটি গ্রহাণুর রিং সাধারণত শান্ত ও স্থিতিশীল থাকার কথা। কিন্তু এমন নাটকীয় পরিবর্তন বুঝিয়ে দিচ্ছে, এর ভেতরের পদার্থবিজ্ঞান আমাদের আগের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি জটিল। সান্তোস-সাঞ্জের মতে, এই পরিবর্তনগুলো আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে যে মহাকাশের এই বলয়গুলো আসলে কীভাবে তৈরি হয়, কীভাবে বছরের পর বছর টিকে থাকে আর কোন জাদুবলে এরা নিজেদের স্থিতিশীলতা বজায় রাখে।

আরও পড়ুন
পাবলো সান্তোস-সাঞ্জ দেখলেন, চ্যারিকলোর দুটি রিং সম্পূর্ণ বিপরীত আচরণ করছে! ভেতরের দিকের রিংটি আগের চেয়ে বেশি অস্বচ্ছ বা ঘন হয়ে গেছে, অন্যদিকে বাইরের রিংটি হয়ে গেছে বেশ হালকা।

এই আবিষ্কারটি কেবল একটি গ্রহাণুর রিংয়ের পরিবর্তন দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের নিখুঁত সক্ষমতার মাইলফলক। একটু ভেবে দেখুন, সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্বের প্রায় ১৭ গুণ দূরে থাকা মাত্র ২৫০ কিলোমিটারের একটি বিন্দুর চারপাশের রিংয়ের পরিবর্তন মাপা হচ্ছে!

গবেষক দলের সদস্য ইউসেল কিলিক জানিয়েছেন, এই অসাধ্য সাধনের জন্য মহাকাশের তিনটি জিনিসের একেবারে কাঁটায় কাঁটায় নিখুঁত অবস্থানের তথ্য জানা প্রয়োজন ছিল। প্রথমত, চ্যারিকলো ঠিক কোন কক্ষপথে ঘুরছে তা জানা। দ্বিতীয়ত, পেছনের যে নক্ষত্রের আলো মেপে এই পরীক্ষা চলছে, মহাকাশে তার সঠিক অবস্থান জানা। এ কাজে অবশ্য ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির গায়া মিশনও ভূমিকা রেখেছে। আর তৃতীয়ত, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের নিজের অবস্থান নিখুঁত রাখা।

আরও পড়ুন
একটু ভেবে দেখুন, সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্বের প্রায় ১৭ গুণ দূরে থাকা মাত্র ২৫০ কিলোমিটারের একটি বিন্দুর চারপাশের রিংয়ের পরিবর্তন মাপা হচ্ছে!

জেমস ওয়েব পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরে এল২ ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্টে বসে মহাকাশের দিকে চোখ পেতে আছে। এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে পৃথিবী ও সূর্যের মহাকর্ষীয় টান একটি নিখুঁত ভারসাম্য তৈরি করে। কিন্তু সেখানেও টেলিস্কোপটিকে নিজের জায়গায় স্থির রাখার জন্য মাঝেমধ্যেই রকেটের থ্রাস্টার জ্বালিয়ে ছোটখাটো অরবিটাল কারেকশন করতে হয়। এত দূর থেকে, এতগুলো চলক নিখুঁতভাবে সামলে এমন একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তন ধরতে পারাটা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে সত্যিই এক অনন্য অর্জন।

এই ছোট্ট গ্রহাণুর রিং কেন এমন অদ্ভুতভাবে বদলাচ্ছে, তার আসল কারণ এখনো রহস্যের চাদরেই ঢাকা। তবে এই পরিবর্তনের ধারা ধরতে পারার সক্ষমতা বিজ্ঞানীদের সামনে মহাজাগতিক বিবর্তনের এক নতুন জানালা খুলে দিয়েছে। আগামী দিনগুলোতে হয়তো আমাদের সৌরজগতের অন্যান্য রিং সিস্টেম, এমনকি খোদ শনির বলয়ের অনেক অজানা রহস্যও এই ছোট্ট চ্যারিকলোর হাত ধরেই উন্মোচিত হবে।

সূত্র: স্পেস ডটকম

আরও পড়ুন