সৌরজগতের শেষ কোথায়

সৌরজগতে এক বিশাল জায়গা! আটটি গ্রহ, প্লুটোর মতো বামন গ্রহ, শত শত চাঁদ ও লাখো-কোটি গ্রহাণু মিলে সূর্যের চারপাশেই ঘুরপাক খাচ্ছে। লাটিম যেমন বনবন করে ঘোরে, আমাদের এই মহাজাগতিক বস্তুগুলোও ঠিক তেমনি হাজার হাজার মাইল গতিতে ঘুরছে। কিন্তু এই সৌরজগতের সীমানা আসলে কোথায়? ঠিক কোন জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালে বলা যাবে, এরপরে আর সূর্যের রাজত্ব নেই?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া মোটেও সহজ কথা নয়। কারণ আপনি কাকে জিজ্ঞেস করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে উত্তর বদলে যেতে পারে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার মতে, সৌরজগতের সীমানা হতে পারে তিনটি। ১. কুইপার বেল্ট, ২. হেলিওপজ এবং ৩. ওর্ট ক্লাউড।

আটটি গ্রহ, শত শত চাঁদ ও লাখো-কোটি গ্রহাণু মিলে সূর্যের চারপাশেই ঘুরপাক খাচ্ছে
ছবি: গেটি ইমেজ

লস আলামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির গবেষক ড্যান রেইসেনফেল্ড বলছেন, ‘এই তিনটি সীমানার প্রত্যেকের পক্ষেই শক্ত যুক্তি আছে।’ তাহলে চলুন, এক এক করে এই তিনটি সীমানা সম্পর্কে জানা যাক এবং বোঝার চেষ্টা করি, আসলে আমাদের সৌরজগতের শেষ কোথায়।

আরও পড়ুন
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার মতে, সৌরজগতের সীমানা হতে পারে তিনটি। ১. কুইপার বেল্ট, ২. হেলিওপজ এবং ৩. ওর্ট ক্লাউড।

১. কুইপার বেল্ট

সূর্য থেকে পৃথিবী যতটা দূরে, সেই দূরত্বকে বলা হয় ১ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট বা AU। সেই হিসেবে, কুইপার বেল্ট সূর্য থেকে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ AU দূরে অবস্থিত। এটি মূলত বিশাল এক পাথুরে বলয়। এখানে আছে অসংখ্য গ্রহাণু এবং প্লুটোর মতো বামন গ্রহ।

অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী মনে করেন, কুইপার বেল্টই হলো সৌরজগতের শেষ সীমানা। তাঁদের যুক্তি হলো, সৌরজগত যখন তৈরি হচ্ছিল, তখন গ্যাস ও ধুলোর যে চাকতি থেকে গ্রহগুলো জন্ম নিয়েছিল, তার ধ্বংসাবশেষ এই পর্যন্তই বিস্তৃত। তাই একেই শেষ সীমান্ত বলা উচিত। আপনি যদি সূর্য ও গ্রহগুলোকেই শুধু সৌরজগত ভাবেন, তবে কুইপার বেল্টকেই শেষ সীমানা।

অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কুইপার বেল্টকে সৌরজগতের শেষ সীমানা মনে করেন
ছবি: স্টার ওয়াল্ক

কিন্তু ক্যালটেকের বিজ্ঞানী মাইক ব্রাউন এই ধারণার সঙ্গে একদমই একমত নন। কেন? কারণ সৌরজগত সৃষ্টির পর গ্রহগুলো অনেক নড়াচড়া করেছে, অনেক বস্তুকে ধাক্কা দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া বিজ্ঞানীদের ধারণা, কুইপার বেল্টের বাইরেও প্ল্যানেট নাইন বা নবম গ্রহ লুকিয়ে থাকতে পারে। এমনকি ২০২৩ সালের অক্টোবরে কুইপার বেল্টের বাইরেও নতুন কিছু বস্তু আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলো ইঙ্গিত দেয়, হয়তো দূরে আরও একটি ‘দ্বিতীয় কুইপার বেল্ট’ আছে। তাই এই জায়গাকে সীমানা মানতে অনেকেরই আপত্তি।

আরও পড়ুন
সৌরজগত যখন তৈরি হচ্ছিল, তখন গ্যাস ও ধুলোর যে চাকতি থেকে গ্রহগুলো জন্ম নিয়েছিল, তার ধ্বংসাবশেষ এই পর্যন্তই বিস্তৃত। তাই কুইপার বেল্টকেই শেষ সীমান্ত বলা উচিত।

২. হেলিওপজ

বেশিরভাগ বিজ্ঞানী এবং নাসা বর্তমানে এই জায়গাটিকেই সৌরজগতের সীমানা হিসেবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। সূর্য থেকে অনবরত আগুনের ফুলকির মতো প্লাজমা বের হতে থাকে। একে বলে সৌরবায়ু। এই সৌরবায়ু সূর্যের চারপাশে একটা বিশাল চুম্বকীয় বুদবুদ তৈরি করে, যার নাম হেলিওস্ফিয়ার। কিন্তু মহাকাশের অন্য নক্ষত্র থেকেও তো ক্ষতিকর সব রশ্মি ছুটে আসে।

যে সীমানায় গিয়ে সূর্যের সৌরবায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বাইরের নক্ষত্রের রেডিয়েশনকে আর ঠেকাতে পারে না, সেই অদৃশ্য দেওয়ালকেই বলে হেলিওপজ। ইতিহাসে মাত্র দুটি মানুষের তৈরি নভোযান এই সীমানা পার হতে পেরেছে। ২০১২ সালে ভয়েজার ১ এবং ২০১৮ সালে ভয়েজার ২।

যে সীমানায় গিয়ে সূর্যের সৌরবায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে, সেই অদৃশ্য দেওয়ালকেই বলে হেলিওপজ
ছবি: উইকিপিডিয়া

এই যানগুলো যখন হেলিওপজ পার হচ্ছিল, তখন তাদের সেন্সরে রেডিয়েশন ও চুম্বকীয় ক্ষেত্রের তীব্র পরিবর্তন ধরা পড়েছিল। অর্থাৎ, তখন বোঝা গেছে, এই নভোযান দুটি সত্যিই কোনো বর্ডার পার করল।

তবে এখানেও একটা সমস্যা আছে। হেলিওস্ফিয়ার কিন্তু ফুটবলের মতো গোল নয়। আমরা যেহেতু মহাকাশ দিয়ে ছুটে চলেছি, তাই এর আকার অনেকটা এবড়োখেবড়ো। সূর্যের সামনের দিকে এটি প্রায় ১২০ AU পর্যন্ত বিস্তৃত, কিন্তু পেছনের দিকে এটি প্রায় ৩৫০ AU লম্বা একটা লেজের মতো ছড়িয়ে আছে। একটা আঁকাবাঁকা সীমানাকে কি সৌরজগতের পারফেক্ট বর্ডার বলা যায়।

আরও পড়ুন
যে সীমানায় গিয়ে সূর্যের সৌরবায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বাইরের নক্ষত্রের রেডিয়েশনকে আর ঠেকাতে পারে না, সেই অদৃশ্য দেওয়ালকেই বলে হেলিওপজ।

৩. ওর্ট ক্লাউড

সৌরজগতের সীমানার তৃতীয় এবং সবচেয়ে বিশাল দাবিদার হলো ওর্ট ক্লাউড। এটি সূর্য থেকে প্রায় ১ লাখ AU পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে! যাঁরা মনে করেন সূর্যের মহাকর্ষ বল যত দূর পর্যন্ত কাজ করে তত দূরই সৌরজগত, তাঁদের কাছে ওর্ট ক্লাউডই হলো আসল সীমানা। ফ্রান্সের বোরডো অ্যাস্ট্রোফিজিক্স ল্যাবরেটরির জ্যোতির্বিজ্ঞানী শন রেপন্ড বলেন, ‘ওর্ট ক্লাউড ছাড়া অন্য কিছুকে সৌরজগতের শেষ ভাবাটা আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়। কারণ এটাই সেই শেষ জায়গা যেখানে কোনো বস্তু সূর্যের চারপাশে ঘুরতে পারে।’

তাত্ত্বিকভাবে এটি সঠিক হলেও সমস্যা হলো, ওর্ট ক্লাউড এতই দূরে যে এটি আসলে ইন্টারস্টেলার স্পেস বা নক্ষত্রদের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় পড়ে গেছে। তাছাড়া এর শেষ কোথায়, তা নিয়েও বিজ্ঞানীদের মধ্যে ধোঁয়াশা আছে।

ওর্ট ক্লাউড সূর্য থেকে প্রায় ১ লাখ AU পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে
ছবি: বিবিসি স্কাই নাইট ম্যাগাজিন

তাহলে শেষটা কী দাড়াল? সৌরজগতেরে সীমানা কোথায়? হেলিওপজকেই বেশিরভাগ বিজ্ঞানী নিরাপদ উত্তর হিসেবে বেছে নেন। কারণ এটি একটি ভৌত সীমানা। এই সীমানা পার হলে আপনি টের পাবেন যে পরিবেশ বদলে গেছে।

তবে মাইক ব্রাউন পুরো বিতর্কটাকে খুব সহজ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এটা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। আপনি কোন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন, তার ওপর ভিত্তি করেই সীমানা নির্ধারিত হবে।’

আপনি যদি সূর্যের চুম্বকীয় ক্ষমতার কথা ভাবেন, তবে হেলিওপজই শেষ। আর যদি ভাবেন সূর্যের মহাকর্ষের জোর কত দূর, তবে আপনাকে পাড়ি দিতে হবে সুদূর ওর্ট ক্লাউড পর্যন্ত।

বুঝতেই পারছেন, মহাকাশের এই বিশাল সীমানা নির্ধারণ করা মানুষের তৈরি মানচিত্রের মতো সহজ নয়! তাই সৌরজগতের সীমানা কোথায়, তা জানার আগে জানতে হবে, আপনি সৌরজগত নিয়ে কী ভাবছেন। আপনার প্রশ্নের ধরণ অনুযায়ী বদলে যাবে সৌরজগতের সীমানা!

সূত্র: লাইভ সায়েন্স, স্পেস ডটকম ও নাসা

আরও পড়ুন