সোশ্যাল মিডিয়ায় সবার জীবন এত রঙিন, আপনার বোরিং কেন

আপনার নিউজফিড শুধু চমকপ্রদ ও অসাধারণ সব ঘটনাতেই ভরে থাকে কেন?ছবি: গেটি ইমেজ

ছুটির দিনে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম স্ক্রল করছেন। হঠাৎ দেখলেন আপনার এক বন্ধু প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে দারুণ এক ছবি দিয়েছে। একটু নিচেই আরেক কলিগ স্কাইডাইভিং করার রোমাঞ্চকর কোনো ভিডিও আপলোড করেছে। এসব দেখতে দেখতে হঠাৎ আপনার মনে হলো, ‘ইশ! দুনিয়ার সব মানুষ কত মজা করছে, সবার জীবন কত রঙিন! আর আমি এখানে সোফায় শুয়ে শুয়ে বোরিং জীবন কাটাচ্ছি।’

এমন অনুভূতি কি আপনারও হয়? যদি হয়ে থাকে, তবে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। আপনি একা নন, সোশ্যাল মিডিয়ার এই ঝলমলে দুনিয়া আমাদের অনেকের মনেই এমন এক হীনম্মন্যতা তৈরি করে। কিন্তু, কেন আপনার নিউজফিড শুধু এমন চমকপ্রদ ও অসাধারণ সব ঘটনাতেই ভরে থাকে? আমরা সাধারণত এর জন্য ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদমকে দোষ দিই। কিন্তু নতুন এক গবেষণা বলছে, দোষটা অ্যালগরিদমের নয়, বরং আমাদের নিজেদের!

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া টেকের পাম্পলিন কলেজ অব বিজনেসের সহকারী অধ্যাপক অ্যালিস জ্যাং এবং বিজনেস ইনফরমেশন টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বিশ্বনাথ ভেঙ্কটেশ সম্প্রতি এ নিয়ে একটি গবেষণা করেছেন। তাঁদের মতে, মানুষ স্বভাবতই একটু রোমাঞ্চকর বা উত্তেজনার বিষয়গুলোর প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। বাস্তব জীবনের মতো সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই একই নিয়ম খাটে। এর থেকেই তৈরি হয় এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ, যার নাম দিয়েছেন তাঁরা ‘রেয়ারনেস বায়াস ডিফিউশন’।

আরও পড়ুন
আমরা সাধারণত সোশ্যাল মিডিয়ার এই ঝলমলে দুনিয়া জন্য ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদমকে দোষ দিই। কিন্তু নতুন এক গবেষণা বলছে, দোষটা অ্যালগরিদমের নয়, বরং আমাদের নিজেদের!

বিষয়টা একটু সহজ করে বুঝিয়ে বলি। ধরুন, আপনি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠেন, ব্রাশ করেন, জ্যাম ঠেলে অফিসে যান এবং কাজ শেষে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন। পৃথিবীর ৯৯ শতাংশ মানুষের দৈনন্দিন রুটিন ঠিক এমনই একঘেয়ে বা সাধারণ। কিন্তু কেউ কি কখনো সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ট্যাটাস দেয় যে, ‘আজ আমি খুব সুন্দর করে দাঁত ব্রাশ করেছি।’ দেয় না। মানুষ শুধু তাদের জীবনের বিরল, চমৎকার বা অসাধারণ মুহূর্তগুলোই অনলাইনে শেয়ার করে।

সমস্যাটা শুরু হয় তখন, যখন আপনি দিনের পর দিন এই বিরল ঘটনাগুলোই শুধু দেখতে থাকেন। মানুষের মস্তিষ্ক তখন এই বিরল ঘটনাগুলোকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়। অধ্যাপক অ্যালিস জ্যাং বলেছেন, ‘মানুষ ভাবতে শুরু করে, বাকি সবাই হয়তো প্যারিসে ঘুরে বেড়াচ্ছে বা দারুণ কিছু করছে; শুধু সে নিজেই ঘরে বসে একঘেয়ে জীবন পার করছে।’

তাহলে দোষটা কি অ্যালগরিদমের? এমআইএস কোয়ার্টারলি জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণা আমাদের প্রচলিত ধারণাকে একেবারে পাল্টে দিয়েছে। আমরা ভাবি, সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম হয়তো ইচ্ছে করেই আমাদের এসব দেখাচ্ছে। কিন্তু সত্যিটা হলো, এটা আমাদের মানুষেরই এক সহজাত মনস্তাত্ত্বিক ত্রুটি। আমরা নিজেরাই নতুনত্ব বা বৈচিত্র্য খুঁজি। সাধারণ জিনিস আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। আমাদের এই মানসিক ত্রুটি বা বায়াসকেই সোশ্যাল মিডিয়া একটা প্যাটার্নে পরিণত করে।

আরও পড়ুন
আমরা ভাবি, সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম হয়তো ইচ্ছে করেই আমাদের এসব দেখাচ্ছে। কিন্তু সত্যিটা হলো, এটা আমাদেরই এক সহজাত মনস্তাত্ত্বিক ত্রুটি। আমরা নিজেরাই নতুনত্ব বা বৈচিত্র্য খুঁজি।

তবে শুধু তত্ত্ব দিয়েই বিজ্ঞানীরা থেমে যাননি। বিষয়টি প্রমাণ করার জন্য তাঁরা ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। এর মধ্যে একটি পরীক্ষা ছিল বেশ মজার। তাঁরা গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের সামনে একটি কাল্পনিক শহরের গল্প তুলে ধরেন। গল্পটি ছিল এমন যে, শহরটিতে বিভিন্ন ধরনের অদ্ভুত সব দানব আক্রমণ করেছে! অংশগ্রহণকারীদের সামনে দানবের আক্রমণের কিছু দৃশ্য বারবার দেখানো হলো, আর কিছু দৃশ্য দেখানো হলো খুব কম।

ফলাফলে দেখা গেল এক অদ্ভুত ব্যাপার! অংশগ্রহণকারীরা অনলাইনে শেয়ার করার জন্য সেই দৃশ্যটিকেই সবচেয়ে বেশি বেছে নিচ্ছেন, যা তাঁরা সবচেয়ে কম দেখেছেন। অর্থাৎ, মানুষ সব সময়ই সেই জিনিসটাই অন্যদের জানাতে বা শেয়ার করতে চায়, যা একটু আলাদা, বিরল বা সচরাচর দেখা যায় না। মানুষের এই বায়াসটি কীভাবে বড় পরিসরে কাজ করে, তা বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা পরে হাজার হাজার কাল্পনিক ব্যবহারকারী দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া নেটওয়ার্কের একটি সিমুলেশন তৈরি করেছিলেন। সেখানেও একই ফলাফল দেখা যায়।

তাহলে সমাধান কোথায়? অ্যালিস জ্যাংয়ের মতে, মানুষের মনের এই ত্রুটি কোনোভাবেই পুরোপুরি সারানো সম্ভব নয়। আগের অনেক গবেষণাতেই মানুষকে খুব যৌক্তিক প্রাণী হিসেবে ধরে নেওয়া হতো, যা আদতে ভুল।

আরও পড়ুন
আপনি নিউজফিডে যা দেখছেন, তা বাস্তব জগতের আসল প্রতিচ্ছবি নয়; এই ছোট্ট সত্যিটা একবার মন থেকে বিশ্বাস করতে পারলেই অন্যের রঙিন জীবন দেখে নিজের ভেতরে কোনো হতাশা তৈরি হবে না।

তবে এই সমস্যার একটা সমাধান দিয়েছেন বিশ্বনাথ ভেঙ্কটেশ। তাঁর মতে, যেহেতু এই বায়াস আমরা দূর করতে পারব না, তাই আমাদের শুধু একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে; সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা যা দেখছি, সেটা মানুষের বাস্তব দৈনন্দিন জীবন নয়, সেটা হলো তাদের জীবনের কিছু হাইলাইট অংশ মাত্র।

ক্রিকেট বা ফুটবল খেলায় ঠিক যেমন সারা দিনের বোরিং মুহূর্তগুলো বাদ দিয়ে শুধু চার-ছক্কা বা গোলের মুহূর্তগুলো দিয়ে দুই মিনিটের হাইলাইট বানানো হয়, মানুষের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলও ঠিক তেমনই। সবাই তাদের জীবনের শুধু ভালো ও রঙিন অংশটুকুই সেখানে তুলে ধরে।

আপনার নিউজফিডে যা দেখছেন, তা বাস্তব জগতের আসল প্রতিচ্ছবি নয়; এই ছোট্ট সত্যিটা একবার মন থেকে বিশ্বাস করতে পারলেই অন্যের রঙিন জীবন দেখে নিজের ভেতরে কোনো হতাশা তৈরি হবে না। সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্মগুলো কখনো এই বায়াস দূর করতে পারবে না। তাই এই কৃত্রিম দুনিয়ার নেতিবাচক প্রভাব থেকে নিজের মানসিক শান্তি রক্ষার দায়িত্বটা কিন্তু দিন শেষে আপনাকেই নিতে হবে!

সূত্র: দ্য ইউনিভার্স টুডে

আরও পড়ুন