অ্যানথ্রপিক কেন নিজেদের নতুন মডেল বন্ধ করতে বাধ্য হলো
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুনিয়ায় এখন রীতিমতো তোলপাড় চলছে। আপনি নিশ্চয়ই এত দিনে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি বা গুগলের জেমিনির নাম শুনেছেন কিংবা ব্যবহারও করেছেন। এই দৌড়ে তাদের অন্যতম বড় প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যানথ্রপিক এবং তাদের তৈরি এআই মডেল ক্লড। সম্প্রতি তারা এমন এক এআই মডেল বাজারে এনেছিল, যাকে তারা নিজেরাই আখ্যা দিয়েছিল ‘অত্যধিক ক্ষমতাবান’ হিসেবে। কিন্তু এই ক্ষমতা দেখানোর কয়েক দিনের মাথায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের এক আকস্মিক নির্দেশে নিজেদের এই শক্তিশালী মডেলটি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে কোম্পানিটি।
আপনার মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে, এমন কী হলো যে বাজারে আসার পরপরই একটি এআই মডেলকে এভাবে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হলো? চলুন, পুরো বিষয়টি একটু সহজভাবে বোঝার চেষ্টা করি।
নিজেদের এআইকে বাজারে ছাড়ার জন্য তারা অত্যধিক ক্ষমতাবান বলে দাবি করেছিল। যদিও অনেক সমালোচক তখন বলেছিলেন, এটি হয়তো অ্যানথ্রপিকের শুধু একটি ব্যবসার প্রচার বাড়ানোর কৌশল।
ক্লড ফেবল ৫ এবং মিথোস ৫ আসলে কী
অ্যানথ্রপিকের নতুন এই এআই প্রোগ্রামগুলোর নাম ক্লড ফেবল ৫ এবং মিথোস ৫। এগুলো বাজারে থাকা অন্যান্য এআই মডেলের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত বলে দাবি করেছিল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। চলতি বছরের এপ্রিলে মডেলটির পরীক্ষামূলক সংস্করণ উন্মুক্ত করার সময়ই অর্থ, প্রযুক্তি ও সরকারি পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা এর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।
অ্যানথ্রপিক তখন জানিয়েছিল, এই এআই এত বেশি বুদ্ধিমান যে, এটি ব্যবহার করে সাইবার বা কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাক করা সম্ভব! তাই সুরক্ষার জন্য তারা এর ভেতরে নানা ধরনের নিরাপত্তাবলয় তৈরি করেছে। নিজেদের এআইকে বাজারে ছাড়ার জন্য তারা অত্যধিক ক্ষমতাবান বলে দাবি করেছিল। যদিও অনেক সমালোচক তখন বলেছিলেন, এটি হয়তো অ্যানথ্রপিকের শুধু একটি ব্যবসার প্রচার বাড়ানোর কৌশল।
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছিল, এই এআই প্রোগ্রামগুলোর নাম ক্লড ফেবল ৫ এবং মিথোস ৫ এত বেশি বুদ্ধিমান যে, এটি ব্যবহার করে সাইবার বা কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাক করা সম্ভব!
হঠাৎ কেন বন্ধ হলো এই মডেল
ব্যাপারটি ঘোলাটে হয় মডেলটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার পর। মার্কিন নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ অ্যানথ্রপিককে নির্দেশ দেয়, ফেবল ৫ মডেলটি কোনোভাবেই বিদেশি নাগরিকেরা ব্যবহার করতে পারবেন না। এই নির্দেশের প্রভাব এতটাই ব্যাপক ছিল যে, নিয়ম মেনে চলতে গিয়ে অ্যানথ্রপিককে তাদের সব গ্রাহকের জন্যই ফেবল ৫ এবং মিথোস ৫ মডেল দুটির কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিতে হয়। কোম্পানির ওয়েবসাইটে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
মার্কিন সরকারের ঠিক কী নিয়ে আপত্তি ছিল, তা আনুষ্ঠানিকভাবে পরিষ্কার করা হয়নি। তবে অ্যানথ্রপিকের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন সরকার মূলত জেলব্রেকিং নামে একটি পদ্ধতির সন্ধান পেয়েছিল, যা দিয়ে এই এআইয়ের নিরাপত্তাবলয় ভেঙে ফেলা সম্ভব।
আপনি হয়তো ভাবছেন জেলব্রেকিং জিনিসটা আবার কী? সহজ কথায়, যেকোনো সাইবার নেটওয়ার্ক বা সফটওয়্যারকে সুরক্ষিত রাখার জন্য এর ভেতরে কিছু বিধিনিষেধ বা নিয়ম দেওয়া থাকে, যাতে কেউ এর অপব্যবহার করতে না পারে। হ্যাকাররা যখন বিশেষ কোনো কৌশলে এই বিধিনিষেধ ভেঙে ফেলে এবং গোপন তথ্যে প্রবেশাধিকার পায় বা বন্ধ থাকা ফিচারগুলো চালু করে ফেলে, সেই প্রক্রিয়াটিকেই বলা হয় জেলব্রেকিং। সরকার আশঙ্কা করছিল, এই জেলব্রেকিংয়ের মাধ্যমে এআইয়ের অপব্যবহার করা হতে পারে।
তবে অ্যানথ্রপিকের দাবি অন্য রকম। তারা জানিয়েছে, এই পদ্ধতিতে যে সামান্য কিছু দুর্বলতা বা ত্রুটি খুঁজে পাওয়া গেছে, তা অত্যন্ত সাধারণ। এমনকি জেলব্রেকিং ছাড়াই বাজারে থাকা অন্যান্য সাধারণ এআই মডেল দিয়েও এই ত্রুটিগুলো অনায়াসেই বের করা সম্ভব।
অ্যানথ্রপিকের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন সরকার মূলত জেলব্রেকিং নামে একটি পদ্ধতির সন্ধান পেয়েছিল, যা দিয়ে এই এআইয়ের নিরাপত্তাবলয় ভেঙে ফেলা সম্ভব।
ট্রাম্প প্রশাসন বনাম অ্যানথ্রপিক
এই প্রযুক্তিগত বিতর্কের পেছনে বড় একটি রাজনৈতিক ও আইনি লড়াইও চলছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে অ্যানথ্রপিকের সমালোচনা করেছেন। পরিস্থিতি এতটাই চরমে পৌঁছায় যে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই কোম্পানিটিকে সরবরাহব্যবস্থার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো দেশীয় কোম্পানিকে প্রকাশ্যে এ ধরনের তকমা দেওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম! সাধারণত শত্রু দেশের কোনো কোম্পানির প্রযুক্তি মার্কিন সরকারের ব্যবহারের জন্য নিরাপদ না হলে এমন তকমা দেওয়া হয়।
এর প্রতিবাদে পেন্টাগনের বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা ঠুকে দিয়েছে অ্যানথ্রপিক। একজন মার্কিন বিচারক আপাতত পেন্টাগনের ওই নির্দেশের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। ফলে মামলা চলাকালীন মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করা সংস্থাগুলো অ্যানথ্রপিকের এআই টুল ব্যবহার করতে পারবে।
সব মিলিয়ে প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার এক অদ্ভুত জটিল সমীকরণে আটকে গেছে অ্যানথ্রপিকের নতুন মডেলগুলো। একটি এআই মডেল আসলেই কি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মতো ক্ষমতাবান হয়ে উঠছে, নাকি এগুলো নিছকই রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্নায়ুযুদ্ধ; তা হয়তো সামনের দিনগুলোতেই আরও পরিষ্কার হবে!
