সৃজনশীলতায় মানুষকে ছাড়িয়ে গেল এআই!
চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো জেনারেটিভ এআই সিস্টেমগুলো কি আসলেই সৃজনশীল? নাকি এগুলো শুধুই তথ্যের ভাণ্ডার থেকে কপি-পেস্ট করে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কানাডার ইউনিভার্সিটি ডি মন্ট্রিয়লের সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক করিম জেরবি এবং এআই জগতের অন্যতম পথিকৃৎ অধ্যাপক ইয়োশুয়া বেঞ্জিও এক বিশাল গবেষণা চালিয়েছেন। মানুষের সৃজনশীলতা এবং লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের (LLM) ক্ষমতার মধ্যে এটাই এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় তুলনামূলক গবেষণা।
সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফল বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জেনারেটিভ এআই সিস্টেমগুলো এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে তারা সৃজনশীলতার নির্দিষ্ট কিছু মাপকাঠিতে গড়পড়তা মানুষকে পেছনে ফেলে দিতে সক্ষম। তবে একই সঙ্গে গবেষণায় এটাও পরিষ্কার হয়ে গেছে, পৃথিবীর সবচেয়ে সৃজনশীল মানুষদের মেধার কাছে এআই এখনো হার মানতে বাধ্য।
মানুষের গড় সৃজনশীলতার চেয়ে এগিয়ে এআই
গবেষকেরা চ্যাটজিপিটি, ক্লড, জেমিনিসহ বেশ কিছু প্রধান লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের সৃজনশীলতা যাচাই করেছেন। তাদের এই পারফরম্যান্স তুলনা করা হয়েছে ১ লাখ মানুষের ওপর চালানো পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে। ফলাফলটি রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। দেখা গেছে, জিপিটি-৪ (GPT-4) এর মতো কিছু এআই সিস্টেম ভাষাগত বৈচিত্র্যময় সৃজনশীলতার পরীক্ষায় গড়পড়তা মানুষের চেয়ে বেশি স্কোর করেছে।
অধ্যাপক করিম জেরবি বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমাদের গবেষণা প্রমাণ করছে, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলভিত্তিক কিছু এআই এখন সুনির্দিষ্ট কিছু কাজে গড়পড়তা মানুষের চেয়ে ভালো করছে। এই ফলাফল অনেকের কাছেই বিস্ময়কর, এমনকি কিছুটা অস্বস্তিকরও হতে পারে। তবে আমাদের গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সবচেয়ে ভালো এআই সিস্টেমগুলো এখনো শীর্ষস্থানীয় সৃজনশীল মানুষদের স্তরে পৌঁছাতে পারেনি।’
গবেষণার সহ-লেখক অ্যান্টোইন বেলেমেয়ার-পেপিন এবং পিএইচডি গবেষক ফ্রাঁসোয়া লেসপিনাস আরও গভীরে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাটার্ন খুঁজে পেয়েছেন। যদিও কিছু এআই মডেল গড় মানুষকে হারিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু সৃজনশীলতার সর্বোচ্চ চূড়াটি এখনো মানুষের দখলেই আছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী মানুষদের মধ্যে যারা সবচেয়ে সৃজনশীল, তাঁদের গড় স্কোর এআইয়ের চেয়ে বেশি। আর যদি শীর্ষ ১০ শতাংশ সৃজনশীল মানুষের কথা ধরা হয়, তবে তাদের সঙ্গে এআইয়ের ব্যবধান আরও অনেক বেশি। অর্থাৎ, মানুষের মস্তিষ্কের সেরা কল্পনাশক্তি এখনো যন্ত্রের ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অধ্যাপক করিম জেরবি বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমাদের গবেষণা প্রমাণ করছে, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলভিত্তিক কিছু এআই এখন সুনির্দিষ্ট কিছু কাজে গড়পড়তা মানুষের চেয়ে ভালো করছে।'
সৃজনশীলতার পরিমাপ হলো কীভাবে
মানুষ বনাম যন্ত্রের এই লড়াইয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে গবেষকেরা একটি বিশেষ পদ্ধতির সাহায্য নিয়েছিলেন। এর নাম ডাইভারজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন টাস্ক বা DAT। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা, যা দিয়ে মাপা হয় কেউ একটি নির্দিষ্ট বিষয় থেকে কত ভিন্ন ভিন্ন এবং মৌলিক ধারণা তৈরি করতে পারে।
কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জে ওলসন এই টাস্কটি তৈরি করেছেন। পরীক্ষায় আপনাকে এমন ১০টি শব্দ বলতে হবে, যেগুলোর একটির সঙ্গে অন্যটির কোনো সম্পর্ক নেই। শব্দগুলো হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের। যেমন, বিড়াল ও কুকুর বললে আপনার স্কোর কম আসবে, কারণ এই দুটিই প্রাণী।
কিন্তু বিড়াল ও বই বললে স্কোর বেশি আসবে, কারণ এদের অর্থের মধ্যে কোনো মিল নেই। উদাহরণ হিসেবে আমরা এরকম ১০টি শব্দ লিখতে পারি। যেমন, গ্যালাক্সি, কাঁটাচামচ, স্বাধীনতা, শ্যাওলা, হারমোনিকা, কোয়ান্টাম, নস্টালজিয়া, মখমল, হারিকেন এবং সালোকসংশ্লেষণ। এখানে প্রতিটি শব্দ অন্যটির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
মানুষের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষার ফলাফল সাধারণত তাদের অন্যান্য সৃজনশীল কাজের (যেমন লেখালেখি বা সমস্যা সমাধান) দক্ষতার সঙ্গে মিলে যায়। যদিও এটি একটি ভাষাগত পরীক্ষা, কিন্তু এটি কেবল শব্দভাণ্ডারের পরীক্ষা নয়। বরং এটি মস্তিষ্কের সেই ক্ষমতা যাচাই করে, যা বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। এই পরীক্ষার আরেকটি সুবিধা হলো, এটি মাত্র দুই থেকে চার মিনিটে শেষ করা যায়।
মানুষ বনাম যন্ত্রের এই লড়াইয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে গবেষকেরা একটি বিশেষ পদ্ধতির সাহায্য নিয়েছিলেন। এর নাম ডাইভারজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন টাস্ক বা DAT। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা।
শব্দজট থেকে সৃজনশীল লেখা
শুধু শব্দ চয়নের পরীক্ষায় এআই ভালো করলেই কি তাকে সৃজনশীল বলা যায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষকেরা আরও এক ধাপ এগিয়ে যান। তাঁরা এআই এবং মানুষকে দিয়ে হাইকু, সিনেমার প্লট এবং ছোটগল্প লিখিয়ে নেন। হাইকু মানে তিন লাইনের জাপানি কবিতা।
এখানেও ফলাফলের সেই একই প্যাটার্ন দেখা যায়। এআই মাঝেমধ্যেই গড়পড়তা মানুষের চেয়ে ভালো গল্প বা কবিতা লিখেছে। কিন্তু যখনই অভিজ্ঞ এবং দক্ষ লেখকদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, তখন দেখা গেছে মানুষের লেখা অনেক বেশি গভীর এবং মৌলিক। অর্থাৎ, সাধারণ মানের কাজে এআই এগিয়ে থাকলেও, উচ্চমানের শিল্পকর্মে মানুষই সেরা।
এআইয়ের সৃজনশীলতা কি নিয়ন্ত্রণ করা যায়
গবেষণায় একটি কৌতূহলী প্রশ্ন উঠে আসে, আমরা কি এআইয়ের সৃজনশীলতাকে ইচ্ছামতো বাড়াতে বা কমাতে পারি? হ্যাঁ, পারি। এআই মডেলের একটি সেটিংস আছে যাকে বলা হয় তাপমাত্রা।
এই তাপমাত্রা কম থাকলে এআই খুব নিরাপদ এবং সাধারণ উত্তর দেয়। কিন্তু তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিলে এআই ঝুঁকি নিতে শুরু করে, তখন তার উত্তরগুলো অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় এবং মৌলিক হয়। এ ছাড়া গবেষকেরা দেখেছেন, এআইকে নির্দেশ দেওয়ার ভাষা পরিবর্তন করেও সৃজনশীলতা বাড়ানো যায়। যেমন, এআইকে যদি শব্দের উৎপত্তি নিয়ে ভাবতে বলা হয়, তখন সে অনেক অদ্ভুত এবং সৃজনশীল আইডিয়া বের করতে পারে। অর্থাৎ এআইয়ের সৃজনশীলতা অনেকটাই মানুষের নির্দেশনার ওপর নির্ভরশীল।
এআই মাঝেমধ্যেই গড়পড়তা মানুষের চেয়ে ভালো গল্প বা কবিতা লিখেছে। কিন্তু যখনই দক্ষ লেখকদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, তখন দেখা গেছে মানুষের লেখা অনেক বেশি গভীর এবং মৌলিক।
যন্ত্র কি মানুষের জায়গা দখল করবে
এই গবেষণাটি আমাদের সেই চিরচেনা ভয়ের একটি ভারসাম্যপূর্ণ উত্তর দিয়েছে। এআই কি সৃজনশীল পেশাজীবীদের চাকরি খেয়ে ফেলবে? যদিও কিছু নির্দিষ্ট কাজে এআই মানুষের সমকক্ষ হয়ে উঠেছে, কিন্তু মানুষের সৃজনশীলতার যে গভীরতা, তা এআইয়ের নেই।
অধ্যাপক করিম জেরবি বলেন, ‘এআই কিছু পরীক্ষায় মানুষের সমান দক্ষতা দেখালেও আমাদের এই প্রতিযোগিতার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জেনারেটিভ এআই আসলে মানুষের সৃজনশীলতার জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার। এটি নির্মাতাদের বা শিল্পীদের প্রতিস্থাপন করবে না, বরং তাদের কল্পনা এবং সৃষ্টির জগতকে বদলে দেবে। যারা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে জানবে, তাদের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে যাবে।’
ভবিষ্যতে হয়তো মানুষ বনাম যন্ত্রের লড়াই হবে না। বরং মানুষ এবং যন্ত্র মিলে নতুন ধরনের সৃজনশীল কাজ করবে। এআই হবে মানুষের কল্পনাশক্তির সহযোগী, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।