এআই কি কখনো মানুষের চেয়ে বেশি সৃজনশীল হতে পারবে

ছবি: অঙ্কিতা কাটারিয়া

চ্যাটজিপিটি বা জেমিনাই এখন নিমেষেই কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে, এমনকি জোকসও শোনাচ্ছে। এসব দেখে মনে হতেই পারে, মানুষের দিন বুঝি শেষ! সৃজনশীলতার কাজটুকু বোধ হয় এবার রোবটদের মাথায় উঠতে চলল। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে অন্য কথা। এআইয়ের এর নাকি একটা গাণিতিক সীমা আছে, যা পার হওয়া অসম্ভব।

ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং ইনোভেশন বিভাগের অধ্যাপক ডেভিড ক্রপলি সম্প্রতি একটি গবেষণা করেছেন। তাঁর সোজা কথা, এআইয়ের দৌড় ওই অ্যামেচার বা শৌখিন শিল্পীদের পর্যন্তই। সত্যিকারের এক্সপার্ট মানুষের সৃজনশীলতাকে টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা এআইয়ের নেই।’

চ্যাটজিপিটি বা জেমিনাইয়ের মতো এআই মডেলগুলো এখন নিমেষেই কবিতা লিখে ফেলছে
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

তিনি আরও বলছেন, ‘চ্যাটজিপিটি গল্প বা কবিতা লিখলেই সেটাকে সৃজনশীলতা বলা যাবে না। কিছু একটা তৈরি করা আর সৃজনশীল হওয়া আলাদা জিনিস।’

সমস্যা হলো, আমাদের সমাজের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের সৃজনশীলতা গড়পড়তা মানের। তাই সাধারণ মানুষ যখন এআইয়ের কাজ দেখে, তারা মুগ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যারা সত্যিকারের সৃজনশীল, তারা ঠিকই এআইয়ের কাজের ফাঁকফোকর ধরে ফেলেন। এআই খুব চমৎকারভাবে মানুষের নকল করতে পারে, কিন্তু সে কখনোই একজন পেশাদার শিল্পীর মানের কাজ দিতে পারে না।

আরও পড়ুন
অধ্যাপক ডেভিড ক্রপলি বলছেন, ‘চ্যাটজিপিটি গল্প বা কবিতা লিখলেই সেটাকে সৃজনশীলতা বলা যাবে না। কিছু একটা তৈরি করা আর সৃজনশীল হওয়া আলাদা জিনিস।’

একটা এআই সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবে না, ‘আজ আমি আমার ছোটবেলার কষ্টের স্মৃতি নিয়ে একটা গল্প লিখব, তাতে যদি সমাজ আমাকে একঘরে করে দেয়, তো দিক!’ এআইয়ের কোনো ট্রমা নেই, হারানোর ভয় নেই, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস নেই। মানুষের সৃষ্টির পেছনে একটা কেন থাকে, একটা জেদ থাকে। এআই শুধু হাজার হাজার তথ্য ঘেঁটে সবচেয়ে সম্ভাব্য উত্তরটা বের করে দেয়। ওটার কোনো উদ্দেশ্য নেই।

সৃজনশীলতা যদি হয় অসংখ্য তথ্য মেলানোর খেলা, তবে এআইয়ের জেতার কথা
ছবি: গেটি ইমেজ

তবে সবাই এ কথা মানতে নারাজ। যুক্তরাষ্ট্রের ভোরপাল হেজ নামে একটি এআই কনসালটেন্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়া রাইবচিন বলছেন, ‘আমরা মানুষের সৃজনশীলতাকে একটু বেশিই রোমান্টিকভাবে দেখি। মানুষও তো শূন্য থেকে কিছু বানায় না। আমরা যা দেখি, পড়ি বা শিখি, সেগুলোই মগজে নতুন করে সাজাই। একে বলে কম্বিনেটরিক্স। এআইও ঠিক তাই করে। বরং এআইয়ের কাছে তথ্য আছে মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। সৃজনশীলতা যদি হয় অসংখ্য তথ্য মেলানোর খেলা, তবে তো এআইয়ের জেতার কথা।’

আরও পড়ুন
একটি এআই কনসালটেন্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়া রাইবচিন বলছেন, ‘আমরা মানুষের সৃজনশীলতাকে একটু বেশিই রোমান্টিকভাবে দেখি। মানুষও তো শূন্য থেকে কিছু বানায় না।'

যুক্তরাজ্যের প্যাশনেট এজেন্সির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও গোর গ্যাসপারিয়ান নামে আরেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, তাঁর কাজে এআই এমন সব নতুন আইডিয়া দেয়, যা মানুষের মাথাতেও আসে না। একে সৃজনশীলতা না বলাটা বোকামি। অনেকে বলছেন, এআই বোকা নয়, আসলে আমরাই তাকে ঠিকমতো প্রশ্ন করতে পারি না। আপনি যদি এআইকে দায়সারা নির্দেশ দেন, সে তো দায়সারা কাজই করবে। তাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে, তার সঙ্গে তর্ক করতে হবে, প্রেক্ষাপট দিতে হবে, তবেই বেরিয়ে আসবে আসল কাজ।

এআই মাঝে মাঝে এমন সব নতুন আইডিয়া দেয়, যা মানুষের মাথাতেও আসে না
ছবি: লিংকডইন

যুক্তরাষ্ট্রের হিলিয়াম এসইওর চিফ টেকনোলজি অফিসার পল ডিমট অবশ্য এক তিক্ত সত্যের দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি বলছেন, ‘আমরা আসলে গোলপোস্ট সরিয়ে নিচ্ছি। যখনই মেশিন এমন কিছু করে, যা আগে শুধু মানুষ করতে পারত, তখনই আমরা সৃজনশীলতার সংজ্ঞা বদলে ফেলি। আমরা মেনে নিতে পারছি না যে যন্ত্রও আমাদের মতো ভাবতে পারে।’

তর্কটা তাই এখনই থামছে না। এআই হয়তো গণিতের প্যাঁচে আটকে আছে, কিন্তু মানুষের মনের প্যাঁচ খোলা কি এত সহজ?

লেখক: ফ্রন্টেন্ড ডেভলপার, সফটভেঞ্চ

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন