কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে মৃত্যু হতে পারে ১০০ কোটি মানুষের, সতর্ক করলেন বিল গেটস

মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসছবি: গেটি ইমেজ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে আপনি হয়তো দারুণ সব স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এখন যা বলছেন, তা শুনলে আপনার রাতের ঘুম হারাম হয়ে যেতে পারে। একসময় এআই নিয়ে সবচেয়ে আশাবাদী মানুষগুলোর একজন ছিলেন তিনি। কিন্তু এখন তিনি সতর্ক করে বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন এক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, যার ফলে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে!

এনবিসির মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিল গেটস এই ভয়াবহ আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এআই প্রযুক্তি এখন এতই শক্তিশালী যে এটি ধ্বংসাত্মক ঘটনার জন্ম দিতে পারে। এই বিপদ থেকে বাঁচতে তিনি সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলেছেন। আপনি হয়তো ভাবছেন, প্রযুক্তি তো প্রযুক্তিবিদরাই সামলাবেন। কিন্তু গেটস বলছেন, এআইয়ের সুরক্ষাবলয় কেমন হবে, তা নির্ধারণ করতে এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাজনীতিবিদদেরো এই আলোচনায় যুক্ত হওয়া উচিত।

গেটস মূলত ভয় পাচ্ছেন খারাপ মানুষদের হাতে এই উন্নত প্রযুক্তি পড়ার পরিণতি নিয়ে। তাঁর এই ভয়ের যথেষ্ট কারণও আছে। সম্প্রতি এআই স্টার্টআপ অ্যানথ্রপিক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখানো হয়েছে কীভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও গোষ্ঠী ড্রোন হামলার ছক কষতে এবং বিপজ্জনক গবেষণার কাজে তাদের এআই মডেল ক্লড ব্যবহার করেছে।

আরও পড়ুন
বিল গেটসের মতে, এআই প্রযুক্তি এখন এতটাই শক্তিশালী যে এটি ধ্বংসাত্মক ঘটনার জন্ম দিতে পারে। এই বিপদ থেকে বাঁচতে তিনি সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলেছেন।

বিল গেটসের এই কথার সঙ্গে মিলে যায় অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেইয়ের কথা। গত সেপ্টেম্বরে এক প্রবন্ধে তিনি এআই কোম্পানিগুলোকে প্রযুক্তি উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। সে সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন এই লেখায়: এআইয়ের লাগাম টানার আহ্বান অ্যানথ্রপিক প্রধানের, মানবজাতির ভবিষ্যৎ কি বিপন্ন। দারিও আমোদেইয়ের মতে, এই গতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সরকারি নিয়মকানুন বা রেগুলেশন। ইলন মাস্ক এবং স্যাম অল্টম্যানও তাঁর এই লেখাকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। অ্যানথ্রপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সন পদত্যাগ করার আগে বলেছিলেন, ‘আমাদের জীবন নিয়ে জুয়া খেলা হচ্ছে’। ঠিক তার পরপরই আমোদেইয়ের এই প্রবন্ধটি আসে।

অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই
ছবি: মার্কাস শ্রাইবার/অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস

তবে সিলিকন ভ্যালির এই সতর্কবার্তা ওয়াশিংটনের কর্তাব্যক্তিদের খুব একটা টলাতে পারেনি। এআইয়ের উন্নয়ন থামানো বা ধীর করার বিষয়ে তাদের আগ্রহ কম। খোদ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমোদেইকে কটাক্ষ করে বলেছেন, তিনি নাকি ‘পারফেক্ট লিটল অ্যাঞ্জেল’ সাজার ভান করছেন! ট্রাম্প এআই নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে অনাগ্রহ দেখালেও, গত সপ্তাহে এআই কোম্পানিগুলোর ওপর নজরদারি করতে একটি এআই ফোর্স গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

আরও পড়ুন
দারিও আমোদেইয়ের মতে, প্রযুক্তি উন্নয়নের গতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সরকারি নিয়মকানুন বা রেগুলেশন। ইলন মাস্ক এবং স্যাম অল্টম্যানও তাঁর এই লেখাকে সমর্থন জানিয়েছিলেন।

অন্যদিকে মাইক্রোসফটের বর্তমান সিইও সত্য নাদেলা আবার সরকারি নিয়ন্ত্রণের বদলে কোম্পানির নিজস্ব নিয়ন্ত্রণের ওপরই বেশি জোর দিচ্ছেন। অল-ইন পডকাস্ট-এ তিনি বলেছেন, ‘কোনো এআই মডেলে যদি এমন কোনো ত্রুটি দেখা যায় যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে কোম্পানিগুলোর উচিত নিজেরাই সেই প্রোজেক্ট বন্ধ করে দেওয়া।’ তবে চলতি মাসে মাইক্রোসফট কর্মীদের কাছে পাঠানো এক মেমোতে নাদেলাও প্রযুক্তিকে নিরাপদ করার জন্য সময় নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।

সিলিকন ভ্যালিতে এখন মোটামুটি সবাই একমত, এআই কোম্পানিগুলোর আরও শক্তিশালী সুরক্ষাব্যবস্থা থাকা উচিত, যাতে ওপেনএআইয়ের হাগিং ফেস হ্যাক করার মতো ঘটনা আর না ঘটে। তবে এই সুরক্ষাব্যবস্থা কে বা কীভাবে কার্যকর করবে, তা নিয়ে সিইওদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ আছে।

বিল গেটস, যিনি এখন নাদেলা ও মাইক্রোসফটের অন্য কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিগত উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন, তিনি পুরো গ্রীষ্মকাল জুড়েই নিজের অবস্থান পাল্টেছেন। গত আগস্টে লেখা এক প্রবন্ধে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, এআইকে নিরাপদে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এই বিশ্বের নেই।

আরও পড়ুন
অল-ইন পডকাস্ট-এ নাদেলা বলেছেন, ‘কোনো এআই মডেলে যদি এমন কোনো ত্রুটি দেখা যায় যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে কোম্পানিগুলোর উচিত নিজেরাই সেই প্রোজেক্ট বন্ধ করে দেওয়া।’

আপনি হয়তো ভাবছেন সামনে কী হতে যাচ্ছে? গেটসের কথায়, ‘আমরা সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক এক বিশাল উত্থান-পতনের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছি। এর জন্য আমাদের প্রস্তুত হওয়ার সময় প্রয়োজন।’ বিশ্বব্যাপী এআইয়ের অগ্রগতি ধীর করার যদি কোনো বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা থাকে, তবে তিনি তা নির্দ্বিধায় সমর্থন করবেন বলেও জানিয়েছেন।

প্রযুক্তি যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে আপনি কি মনে করেন বিল গেটসের এই ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কাটা একটু বেশিই বাড়াবাড়ি, নাকি এটাই আমাদের নির্মম ভবিষ্যৎ হতে যাচ্ছে?

সূত্র: বিজনেস ইনসাইডার

আরও পড়ুন