মোবাইল চার্জে দৈনিক কতটা বিদ্যুৎ খরচ হয়
মোবাইল ফোন রাতে চার্জে রেখে ঘুমাতে যান প্রায় সবাই। সকালে ব্যাটারির চার্জ শতভাগ দেখে সন্তুষ্ট হন। কিন্তু ভেতরে কতটা বিদ্যুৎ পুড়ল, সেই হিসাব কেউ রাখেন না।
ব্যাটারির ক্ষমতা মাপা হয় মিলিঅ্যাম্পিয়ার-আওয়ারে। আজকালকার ফোনে এই সংখ্যা ৪ থেকে ৫ হাজারের মধ্যে থাকে। ভোল্টেজ ধরা হয় সাধারণত ৩.৮ ভোল্টের আশপাশে। দুটো গুণ করলে শক্তির প্রকৃত পরিমাণ বের হয় ওয়াট-আওয়ারে। সংখ্যাটা দাঁড়ায় ১৫ থেকে ১৯-এর মধ্যে। শূন্য থেকে পূর্ণ চার্জে ব্যাটারির নিজের চাহিদা এতটুকুই।
দেয়ালের সকেট থেকে যে বিদ্যুৎ টানা হয়, সেটি পুরোপুরি ব্যাটারিতে পৌঁছায় না। চার্জার অল্টারনেটিং কারেন্ট বা এসিকে ডাইরেক্ট কারেন্ট বা ডিসিতে বদলায়। এই বদলানোর সময় কিছুটা শক্তি তাপ হয়ে যায়, যা হাতের তালুতেই টের পাওয়া যায়। এই শক্তির অপচয় বা ক্ষয়ের পরিমাণ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। তাই প্রতি চার্জে আসল খরচ গিয়ে দাঁড়ায় ১৮ থেকে ২৩ ওয়াট-আওয়ার।
ব্যাটারির ক্ষমতা মাপা হয় মিলিঅ্যাম্পিয়ার-আওয়ারে। আজকালকার ফোনে এই সংখ্যা ৪ থেকে ৫ হাজারের মধ্যে থাকে। ভোল্টেজ ধরা হয় সাধারণত ৩.৮ ভোল্টের আশপাশে।
সংখ্যাটা প্রথম শুনলে হাস্যকর রকম ছোট মনে হয়। একটি টিউবলাইট এক ঘণ্টা জ্বললে যতটা বিদ্যুৎ খরচ হয়, তার চেয়েও কম শক্তিতে একটি ফোন চার্জ হয়। তবে হিসাবটা তো কেবল একজনের নয়। বাংলাদেশে মোবাইল সংযোগের সংখ্যা এখন ১৮ দশমিক ৭ কোটির কাছাকাছি। প্রতিটি হ্যান্ডসেট দিনে অন্তত একবার চার্জ হয়।
একজন মানুষের হিসাবে বছরে সাড়ে ৬ থেকে সাড়ে ৮ ইউনিট বা কিলোওয়াট-আওয়ার বিদ্যুৎ খরচ হয় শুধু ফোন চার্জে। এই সংখ্যা দিয়ে গুণ করলে জাতীয় পর্যায়ে তা দাঁড়ায় প্রায় দেড় বিলিয়ন কিলোওয়াট-আওয়ার। পাওয়ার সেলের হিসাবে দেশের বার্ষিক মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার মিলিয়ন কিলোওয়াট-আওয়ারের কাছাকাছি। সেই বিশাল সংখ্যার পাশে ফোন চার্জের অংশ নেহাতই ভগ্নাংশ। তবু ভগ্নাংশ হলেও শূন্য নয়।
ফাস্ট চার্জার নিয়ে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। অনেকের মনে হয়, বেশি গতি মানেই বেশি বিদ্যুৎ খরচ। আসলে তা নয়। প্রতি সেকেন্ডে বেশি শক্তি সরবরাহ করা হয় বলে সময় কমে আসে। কিন্তু ব্যাটারিতে জমা করার মোট শক্তি আগে থেকেই নির্দিষ্ট। ফলে মোট বিদ্যুৎ খরচে খুব একটা হেরফের হয় না, শুধু ঘড়ির কাঁটা দ্রুত ঘোরে।
পুরোনো ব্যাটারি চার্জ ধরে রাখতে একটু বেশি বিদ্যুৎ চায়। দুই বছরের পুরোনো ফোন তাই নতুন ফোনের চেয়ে সামান্য বেশি বিদ্যুৎ টানে। লিথিয়াম-আয়ন কোষের এই ক্ষয় কোনোভাবেই এড়ানো যায় না।
শতভাগ চার্জের পরও ফোন সকেটে গোঁজা থাকলে কী ঘটে? ফোনের সার্কিট কিন্তু বেশ স্মার্ট! পূর্ণ হলেই মূল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তবে খরচ একদম শূন্যে নামে না। ব্যাটারি সময়ে সময়ে সামান্য চার্জ হারায়। সেটি পূরণ করতে চার্জার মাঝেমধ্যে ছোট্ট বিদ্যুতের ঝলক পাঠায়। একে বলে ট্রিকল চার্জিং। রাতভর সকেটে থাকলে এই ঝলকগুলো জমে বছর শেষে সামান্য বাড়তি বিলে ঠেকে।
চার্জার প্লাগে গোঁজা, অথচ ফোন সংযুক্ত নয়; এমন অবস্থাতেও কিছুটা বিদ্যুৎ চুইয়ে যায়। একে বলে ফ্যান্টম লোড। পুরোনো চার্জারে এই ক্ষয়ের পরিমাণ একটু বেশি চোখে পড়ত। এখনকার ইউএসবি-সি এবং গ্যান (GaN) চার্জারে এটি প্রায় নেই বললেই চলে। তবু কোটি কোটি চার্জার সারাক্ষণ প্লাগে থাকলে এই সামান্য চুইয়ে যাওয়া বিদ্যুৎও জড়ো হয়ে একটি পরিমাপযোগ্য সংখ্যায় পৌঁছায়।
ব্যাটারির বয়স বাড়লে খরচও বাড়ে। এর ভেতরের রাসায়নিক গঠন সময়ের সঙ্গে বদলায়। তাই পুরোনো ব্যাটারি একই চার্জ ধরে রাখতে একটু বেশি বিদ্যুৎ চায়। দুই বছরের পুরোনো ফোন তাই নতুন ফোনের চেয়ে সামান্য বেশি বিদ্যুৎ টানে। লিথিয়াম-আয়ন কোষের এই ক্ষয় কোনোভাবেই এড়ানো যায় না।
চার্জার প্লাগে গোঁজা, অথচ ফোন সংযুক্ত নয়; এমন অবস্থাতেও কিছুটা বিদ্যুৎ চুইয়ে যায়। একে বলে ফ্যান্টম লোড। পুরোনো চার্জারে এই ক্ষয়ের পরিমাণ একটু বেশি চোখে পড়ত।
সব মিলিয়ে দৈনিক খরচ ১৮ থেকে ২৩ ওয়াট-আওয়ার। মাসে হিসাব করলে আধা থেকে এক ইউনিটের কাছাকাছি। বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুতের দামে এই খরচ বছরে ৪০ থেকে ৬০ টাকার বেশি ওঠে না।
সংখ্যাটা এত ছোট যে ভুলে যাওয়াই স্বাভাবিক। তবু প্রশ্নটা থেকেই যায়। একটি ফোন যদি এত সামান্য বিদ্যুতে চলে, তাহলে বিশ্বজুড়ে কয়েক শ কোটি ফোন মিলিয়ে যে বিদ্যুৎ পুড়ছে, সেটি কোথায় জমা হয়? উত্তরটা হয়তো ফোনের ভেতরে নেই, বরং লুকিয়ে আছে দূরের ডেটা সেন্টারগুলোর নিরন্তর গুনগুন শব্দে!