কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরির বাজার নিয়ে নানারকম জল্পনা-কল্পনা করছেন অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। অনেকেই অদূর ভবিষ্যতে চাকরি হারানোর আশঙ্কা করছেন। তাদের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দেয় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের একটি প্রতিবেদন। তবে এ প্রতিবেদন শুধু আশঙ্কাই বাড়ায়নি, জুগিয়েছে নতুন আশা। জানিয়েছে, চাকরির বাজারে কাদের কদর বাড়বে।
এ প্রতিবেদন বলছে, আগামী ৫ বছরে প্রায় এক-চতুর্থাংশ চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়বে। সম্প্রতি প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাইজেশন, নবায়নযোগ্য শক্তি ও সাপ্লাই চেইন স্থানান্তরের দ্রুত বিকাশ বৈশ্বিক শ্রমবাজারে আনবে বড় পরিবর্তন।
একে ‘অস্থিরতার এক নতুন যুগ’ হিসেবে অভিহিত করেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)। যেখানে অনেক কর্মীরই কাজ করার মতো যথাযথ দক্ষতা থাকবে না। তবে নতুন এ সময়ে লাভবান হবেন প্রযুক্তি, ডাটা অ্যানালিটিকস বা সাইবার সিকিউরিটিতে দক্ষ কর্মীরা।
বিশ্বব্যাপী নিয়োগকর্তারা ২০২৭ সালের মধ্যে ৬ কোটি ৯০ লাখ নতুন পদ সৃষ্টি এবং ৮ কোটি ৩০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।
ডব্লিউইএফ-এর এ গবেষণায় বিশ্বের ৪৫টি দেশে ৮০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপ চালানো হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত কর্মীসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখ। বিশ্বব্যাপী নিয়োগকর্তারা ২০২৭ সালের মধ্যে ৬ কোটি ৯০ লাখ নতুন পদ সৃষ্টি এবং ৮ কোটি ৩০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন। অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ চাকরি হারিয়ে যাবে এ সময়ের মধ্যে। আর এর ভুক্তভোগী হবেন মূলত গৎবাঁধা কাজ করেন যাঁরা, তাঁরা। শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে প্রশাসনিক পদে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ কর্মী ছাঁটাই হতে পারে পৃথিবীজুড়ে। এ ছাড়া, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সরবরাহঘাটতি ও মুদ্রাস্ফীতিসহ ম্যাক্রো-ইকোনমিক ঘটনাগুলো এআইয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ শ্রম বাজারকে অস্থির করে তুলবে। তবে আগামী পাঁচ বছরে কর্মসংস্থানে প্রযুক্তির সম্মিলিত প্রভাব ইতিবাচক হবে বলেই বিশ্বাস করে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম।
এর আগে, গত মার্চে গোল্ডম্যান স্যাকস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, জেনারেটিভ এআই বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০ কোটি চাকরিকে হুমকির মুখে ফেলবে।
সাম্প্রতিক সময়ে চ্যাপজিপিটির উত্থান আমরা সবাই দেখেছি। ওপেনএআই নামের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাটি তৈরি করেছে। এটা মানুষের ভাষায় যে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। চ্যাট জিপিটি চালু হওয়ার মাত্র ৫ দিনের মাথায় এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। যেকোনো হিসেবেই এটি বিস্ময়কর। এত দ্রুত সাধারণত এত বেশি উন্নতি দেখা যায় না।
তবে কোন ক্ষেত্রগুলোর চাহিদা বাড়বে? ডব্লিউইএফ-এর মতে, গ্রিন টেকনোলজি বা সবুজ প্রযুক্তি এবং পুনর্নবায়নযোগ্য শক্তির বিস্তার ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মূল চালিকাশক্তি হবে। স্থায়িত্ব (সাসটেইনেবিলিটি) বিশেষজ্ঞ, বিজনেস ইন্টেলিজেন্স অ্যানালিস্ট, ইনফরমেশন সিকিউরিটি অ্যানালিস্ট, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি প্রকৌশলী, সোলার এনার্জি ইনস্টলেশন এবং সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার—এই পদগুলো থাকবে শ্রমবাজারের চাহিদার শীর্ষে।
এ ছাড়া, বৃত্তিমূলক ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন ৩০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। ফলে শিক্ষাখাতে প্রবৃদ্ধি হবে আনুমানিক ১০ শতাংশ।
কৃষিতে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে বিশ্বজুড়ে। সামনের দিনে আধুনিক কৃষি সরঞ্জাম চালানোর মতো মানুষের প্রয়োজন হবে আরও বেশি। কৃষি বিশেষজ্ঞ মানুষের চাহিদাও বাড়বে। ফলে প্রায় ৩০ লাখ নতুন চাকরি যোগ হবে বর্তমান শ্রমবাজারে।
অটোমেশন এবং ডিজিটাইজেশনের কারণে সৃষ্ট অস্থিরতার এই নতুন যুগে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে প্রশাসনিক নানা পদ। ২০২৭ সালের মধ্যে ক্যাশিয়ার ও টিকেট কেরানি, ডাটা এন্ট্রি, অ্যাকাউন্টিং, বুককিপিং ও পেরোল কেরানি এবং প্রশাসনিক ও নির্বাহী সচিবসহ ২ কোটি ৬০ লাখ গৎবাঁধা চাকরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে আশংকা করা হয়েছে নতুন গবেষণায়। অন্যদিকে বিশ্লেষণাত্মক (অ্যানালাইটিক্যাল) এবং সৃজনশীল কাজের জন্য দক্ষ মানুষের প্রয়োজন বাড়বে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য বিশ্বব্যাপী প্রায় ৬০ শতাংশ কর্মীর দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন। এজন্য প্রয়োজন যথাযথ প্রশিক্ষণ। তবে এ মূহুর্তে মাত্র ৫০ শতাংশ কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সক্ষমতা আছে পৃথিবীজুড়ে। তথ্য ফোর্বসের।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে, একে কাজে লাগানো শিখতে হবে। তথ্য প্রযুক্তির বিপ্লবের সময় কম্পিউটারের কারণে বহু চাকরি হারিয়ে গিয়েছিল। তবে এর বিপরীতে তৈরি হয়েছিল নতুন নতুন আরও বেশি কর্মসংস্থান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বেলাতেও এমনটা বলা যায়। তাই ভয় নয়। নতুন উদ্যোমে বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে প্রস্তুত হতে হবে ভবিষ্যতের জন্য।
সূত্র: ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, ফোর্বস