বিশ্ব বদলে দেওয়া এক জাদুর বাক্স

একবিংশ শতাব্দী এখনও চলছে, কিন্তু এই সময়টাই আমাদের ভাবনার ভাষা বদলে দিচ্ছে। আগে যেসব প্রশ্নের উত্তর সহজ মনে হতো, সেগুলো এখন নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। মানুষ, জীবন, প্রকৃতি ও মহাবিশ্ব যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। এই বদলের পেছনে আছে কিছু শক্তিশালী ধারণা। সেগুলো শুধু ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলছে। নিউ সায়েন্টিস্ট-এ প্রকাশিত তেমন ২১টি ধারণার সঙ্গে আমরা ধীরে ধীরে পরিচিত হব। সেগুলো একবিংশ শতাব্দীর চিন্তাজগৎকে নতুন পথে নিয়ে গেছে। তৃতীয় পর্বে থাকছে স্মার্টফোন

প্রকৃত স্মার্টফোনের যুগ শুরু হয় একবিংশ শতকের শুরুতেছবি: ফ্রিপিক

সবার পকেটে একটি করে কম্পিউটার ঢুকিয়ে দেওয়ার ধারনা মোটেও ছোট বিষয় নয়। মোবাইল টেলিফোনের এই আধুনিক সংস্করণটি আক্ষরিক অর্থেই স্মার্ট বা চটপটে। বিশাল ডিসপ্লে ও শক্তিশালী অপারেটিং সিস্টেমের এই যন্ত্রটি মুহূর্তে অনেক কাজ করে ফেলতে পারে। ওয়েব ব্রাউজিং, ই-মেইল, গান শোনা, ভিডিও দেখাসহ কী নেই এতে! সহজ কথায়, স্মার্টফোন হলো হাতের মুঠোয় এঁটে যাওয়া একটি কম্পিউটার, যাতে সিম কার্ড ভরে কথাও বলা যায়।

মাঝে মধ্যে এমন একটি বিপ্লবী জিনিস আসে, যা সবকিছু বদলে দেয়। ২০০৭ সালে অ্যাপলের একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কথাটি বলেছিলেন স্টিভ জবস। প্রযুক্তি-নির্বাহীরা সাধারণত তাঁদের পণ্য নিয়ে বাড়িয়ে বলতে পছন্দ করেন। কিন্তু স্টিভ জবসের এই কথাটি একটুও অতিরঞ্জিত ছিল না। আইফোনের হাত ধরেই অ্যাপ শব্দটি আমাদের সবার আপন হয়ে ওঠে।

ইতিহাসের প্রথম স্মার্টফোনটি ডিজাইন করেছিল আইবিএম
ছবি: সায়েন্স মিউজিয়াম / বিবিসি

একই সঙ্গে কম্পিউটার ঢুকে পড়ে প্রত্যেকের পকেটে। তবে ইতিহাসের প্রথম স্মার্টফোনটি ডিজাইন করেছিল আইবিএম (ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস করপোরেশন)। ১৯৯৩ সালে বাজারে আসা বেলসাউথ ফোনে একটি টাচস্ক্রিন ইন্টারফেস ছিল। এর মাধ্যমে ক্যালেন্ডার, ঠিকানার তালিকা ও ক্যালকুলেটরের মতো ফাংশন ব্যবহার করা যেত।

প্রকৃত স্মার্টফোনের যুগ শুরু হয় একবিংশ শতকের শুরুতে। সলিড-স্টেট কম্পিউটার মেমোরি ও ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট সস্তা হওয়ায় এটি সম্ভব হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ইন্টারনেট সংযোগ। ২০০১ সালে তৃতীয় প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক চালু হওয়ার ফলে স্মার্টফোন ব্যবহারের চিত্রটাই বদলে যায়। থ্রিজির আগে ফোনে কেবল কল ও টেক্সট মেসেজ পাঠানোর মতো ধীরগতি ছিল। কিন্তু থ্রিজি আসার ফলে ছবি, ভিডিও ক্লিপ, গান, ই-মেইল পাঠানো সহজ হয়ে যায়। এমনকি ভিডিও কলে দুজন দুজনার মুখ দেখে কথাও বলা সম্ভব হয়।

আরও পড়ুন
১৯৯৩ সালে বাজারে আসা বেলসাউথ ফোনে একটি টাচস্ক্রিন ইন্টারফেস ছিল। এর মাধ্যমে ক্যালেন্ডার, ঠিকানার তালিকা ও ক্যালকুলেটরের মতো ফাংশন ব্যবহার করা যেত।

শুরুতে স্মার্টফোনে স্ক্রিনের সঙ্গে বাটন কি-বোর্ড থাকত, সাধারণত ‘QWERTY’ বিন্যাসে। এখন আর বাটন কি-বোর্ড দেখা যায় না, পুরো বিষয়টি চলে গেছে টাচস্ক্রিনে। নির্দিষ্ট অ্যাপ খুললেই প্রয়োজন মতো কি-বোর্ড হাজির হয়। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উচ্চমানের ক্যামেরা, ওয়াই-ফাই হটস্পট এবং ফোর-জি বা ফাইভ-জির মতো দ্রুতগতির ইন্টারনেট। অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে অ্যাপলের আইওএস ছাড়াও গুগলের অ্যান্ড্রয়েড ওএস বিশ্বজুড়ে রাজত্ব করছে।

এখন আর স্মার্টফোনে বাটন কি-বোর্ড দেখা যায় না, পুরো বিষয়টি চলে গেছে টাচস্ক্রিনে
ছবি: রয়টার্স

সব পরিণতি অবশ্য প্রত্যাশিত ছিল না। এখন চাইলেই আমরা যেকোনো মুহূর্তে ফোনের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারি। এতে আমরা ধীরে ধীরে আরও একা হয়ে যাচ্ছি। নিরাপত্তা ও আসক্তিসহ নানান উদ্বেগের কারণে অনেক দেশ স্কুলে ফোন নিষিদ্ধ করেছে। ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়া তো ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধই করে দিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেটা সায়েন্টিস্ট মার হিকস বলেন, ‘সবকিছুর সমাধান যখন একটা যন্ত্রে আটকে যায়, তখন অবশ্যই তার ক্ষতিকর একটা প্রভাব থাকবেই। স্মার্টফোন এমন এক ডিভাইস, যা ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা ধ্বংস করে দিচ্ছে। লজ্জা কমিয়ে দিচ্ছে। শুধু জনসমক্ষে নয়, আমরা কোথাও এখন আর গোপনীয়তা নিয়ে চিন্তিত নই।’

আরও পড়ুন
নিরাপত্তা ও আসক্তিসহ নানান উদ্বেগের কারণে অনেক দেশ স্কুলে ফোন নিষিদ্ধ করেছে। ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়া তো ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধই করে দিল।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের নৃতত্ত্ববিদ ড্যানিয়েল মিলার মনে করেন, স্মার্টফোন এখন শুধু ফোন নয়, এটি আমাদের আলাদা জগৎ হয়ে গেছে। এই বহনযোগ্য ডিজিটাল জগত মুহূর্তে আমাদের বন্ধু ও পরিবারের ডিজিটাল ভুবনে নিয়ে যেতে পারে। ফলে আমরা আমাদের জীবন কাটাই শারীরিক ও ডিজিটাল বাস্তবতার মধ্যে বারবার খোলস বদলাতে বদলাতে।

তবুও সারা বিশ্বে স্মার্টফোনের ব্যাপক প্রভাব উপেক্ষা করা যায় না। মোবাইল অপারেটরদের বাণিজ্য সংগঠন জিএসএমএর তথ্য অনুযায়ী, এখন বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৭ জনেরই একটি স্মার্টফোন আছে। এই যন্ত্রটি এতই সার্বজনীন হয়েছে যে, নিম্ন আয়ের অনেক দেশ ডেস্কটপ কম্পিউটারের সব কাজ স্মার্টফোনেই করে ফেলছে।

এখন বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৭ জনেরই একটি স্মার্টফোন আছে
ছবি: চ্যাটজিপিটি

স্মার্টফোনভিত্তিক ফিনটেক প্ল্যাটফর্ম এখন ১৭০টিরও বেশি দেশে ৭ কোটির বেশি ব্যবহারকারীর পেমেন্ট পরিচালনা করছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রয়োজন কমছে। কৃষকদের ফসল পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে হাসপাতালের চিকিৎসকদের ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতির বিকল্প হিসেবেও স্মার্টফোন ব্যবহৃত হয়। স্মার্টফোন এখন কেবল নিজের গণ্ডিতেই আটকে নেই; এর ইশারায় ড্রোন ওড়ে, নিয়ন্ত্রণ করা যায় ঘরের এসি কিংবা ফ্যান।

 

লেখক: ফ্যাক্ট-চেকার, সত্যিফাই

সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট ও ব্রিটানিকা

আরও পড়ুন