৩,৫০০ বছর আগের হাতের লেখা পড়ে ফেলল এআই
প্রাচীন সভ্যতার রহস্য উন্মোচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন যেন নতুন এক দরজা খুলে দিচ্ছে। হাজার হাজার বছর আগে কাদামাটির ফলকে খোদাই করা লেখাগুলো এত দিন গবেষকদের কাছে ছিল জটিল ধাঁধার মতো। সেগুলো এখন অনেক দ্রুত পড়তে ও বুঝতে সাহায্য করছে নতুন একটি এআই প্রযুক্তি। সম্প্রতি জার্মানির একদল গবেষক এমন একটি এআই টুল তৈরি করেছেন, যা সাড়ে তিন হাজার বছর আগের হিট্টাইট সভ্যতার লেখকদের হাতের লেখা আলাদা করে শনাক্ত করতে পারে। প্রত্নতত্ত্ব ও ভাষাবিজ্ঞানের জগতে একে বড় অগ্রগতি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
হিট্টাইটরা ছিল প্রাচীন আনাতোলিয়ার একটি শক্তিশালী সভ্যতা। বর্তমান তুরস্কের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে তাদের বসতি ও প্রভাব ছিল। তারা প্রশাসন, ধর্মীয় আচার, যুদ্ধ, আইন এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা তথ্য কাদামাটির ফলকে লিখে রাখত। এসব লেখা তৈরি হতো কিউনিফর্ম নামে পরিচিত একধরনের খোদাই পদ্ধতিতে। ধারালো স্টাইলাস (লেখার হাতিয়ার) দিয়ে নরম কাদায় চাপ দিয়ে তৈরি করা হতো চিহ্নগুলো। পরে ফলক শুকিয়ে শক্ত হয়ে যেত।
হিট্টাইট ভাষা ছিল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাপরিবারের অংশ। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন লিখিত ভাষাগুলোর মধ্যে এটিও একটি। তবে গবেষকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। হাজার বছরের ব্যবধানে অসংখ্য ফলক ভেঙে গেছে। সেগুলোর টুকরো ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা জাদুঘরে। ফলে কোন ভাঙা অংশ কোন মূল নথির অন্তর্ভুক্ত ছিল, তা বোঝা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
বর্তমান তুরস্কের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে হিট্টাইটদের বসতি ও প্রভাব ছিল। তারা প্রশাসন, ধর্মীয় আচার, আইন এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা তথ্য কাদামাটির ফলকে লিখে রাখত।
এই জটিল কাজ সহজ করতেই তৈরি হয়েছে প্যালিওগ্রাফিকাম নামে নতুন এআই ব্যবস্থা। জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব ভ্যুরৎসবুর্গ এবং মাইনৎস একাডেমি অব সায়েন্সেস অ্যান্ড লিটারেচারের গবেষকেরা এটি তৈরি করেছেন। সফটওয়্যারটি ডিজিটাল ছবিতে থাকা কিউনিফর্ম চিহ্ন বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন লেখকের হাতের লেখার সূক্ষ্ম পার্থক্য শনাক্ত করতে পারে।
প্রথম দেখায় কিউনিফর্ম চিহ্নগুলো প্রায় একই রকম মনে হয়। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, প্রতিটি লেখকের লেখার নিজস্ব ভঙ্গি ছিল। কেউ স্টাইলাস একটু টেনে লিখত, ফলে চিহ্নে হালকা বাঁক তৈরি হতো। কেউ আবার চিহ্নগুলোর মাঝে বেশি ফাঁক রাখত। কারও চাপ ছিল গভীর, কারও তুলনামূলক হালকা। আধুনিক হাতের লেখার মতোই এই ছোট ছোট পার্থক্যগুলো লেখকের পরিচয় বহন করে।
আগে গবেষকদের একটি ফলকের টুকরোর সঙ্গে আরেকটি টুকরোর লেখার মিল খুঁজতে দিনের পর দিন সময় লাগত। কখনো পাঁচটি খণ্ডের তুলনা করতেই তিন দিন কেটে যেত। এখন একই কাজ এআই কয়েক মিনিটে করতে পারছে। গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে হাজার হাজার কর্মঘণ্টা বাঁচাবে।
বর্তমানে প্যালিওগ্রাফিকামে প্রায় ৭০ হাজার ডিজিটাল ছবি সংরক্ষিত আছে। এসব ছবিতে রয়েছে ৫০ লাখেরও বেশি কিউনিফর্ম চিহ্ন। এআই পুরো ডেটাবেস ঘেঁটে একই ধরনের বা কাছাকাছি চিহ্নগুলো বের করে আনে। এরপর সেগুলো পাশাপাশি সাজিয়ে গবেষকদের সামনে উপস্থাপন করে, যাতে তুলনা করা সহজ হয়।
একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, প্রতিটি লেখকের লেখার নিজস্ব ভঙ্গি ছিল। কেউ স্টাইলাস একটু টেনে লিখত, ফলে চিহ্নে হালকা বাঁক তৈরি হতো। কেউ আবার চিহ্নগুলোর মাঝে বেশি ফাঁক রাখত।
এখানে শুধু গতি নয়, সময় নির্ধারণেও বড় ভূমিকা রাখছে প্রযুক্তিটি। হিট্টাইট ফলকে সাধারণত তারিখ লেখা থাকত না। ফলে কোন নথি কোন শতকের, তা নির্ধারণ করা ছিল দীর্ঘদিনের বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু মানুষের হাতের লেখার ধরন সময়ের সঙ্গে বদলায়। প্যালিওগ্রাফিকাম সেই পরিবর্তনের ধরন বিশ্লেষণ করে অনুমান করতে পারে, কোন লেখাটি কোন সময়ের কাছাকাছি।
এটি প্রত্নতত্ত্বে ডিজিটাল প্যালিওগ্রাফি নামে পরিচিত একটি নতুন ধারার উদাহরণ। প্যালিওগ্রাফি হলো প্রাচীন হাতের লেখা নিয়ে গবেষণা। এত দিন এই কাজ পুরোপুরি মানুষের চোখ ও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করত। এখন মেশিন লার্নিং সেই বিশ্লেষণকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাচ্ছে।
এই প্রকল্পের পেছনে ছিল কুকা নামে একটি গবেষণার উদ্যোগ, যা ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পরিচালিত হয়। পরে গবেষকেরা সফটওয়্যারটিকে আরও উন্নত করেন, যাতে বিপুলসংখ্যক ছবি দ্রুত বিশ্লেষণ করা যায়। এখন তাঁরা ব্যবহারকারীদের মতামত নিয়েও প্রযুক্তিটিকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা করছেন।
গবেষকদের পরবর্তী লক্ষ্য আরও বড়। তাঁরা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে চান, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলাদা আলাদা লেখককে শনাক্ত করতে পারবে। যদি তা সম্ভব হয়, তাহলে ইতিহাসবিদেরা জানতে পারবেন কোনো নির্দিষ্ট লেখক জীবনের বিভিন্ন সময়ে কী কী লিখেছিলেন। এমনকি কে রাজদরবারে কাজ করতেন, কে ধর্মীয় নথি লিখতেন কিংবা কে প্রশাসনিক নথি তৈরি করতেন—সেসব বিষয়ও ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে পারে।
প্যালিওগ্রাফি হলো প্রাচীন হাতের লেখা নিয়ে গবেষণা। এত দিন এই কাজ পুরোপুরি মানুষের চোখ ও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করত। এখন মেশিন লার্নিং সেই বিশ্লেষণকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাচ্ছে।
ফলে শুধু ভাষা নয়, পুরো একটি সভ্যতার সামাজিক কাঠামো সম্পর্কেও নতুন ধারণা পাওয়া যাবে। ইতিহাসবিদেরা তখন হিট্টাইট সমাজের লেখক শ্রেণির জীবন, প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নতি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভেতরের সম্পর্কগুলো আরও গভীরভাবে বুঝতে পারবেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সাধারণত মানুষের মনে ভবিষ্যতের প্রযুক্তির ছবিই ভেসে ওঠে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, এই প্রযুক্তিই এখন অতীতকে নতুনভাবে পড়তে সাহায্য করছে। হাজার বছর আগের মৃত ভাষা, ভাঙা ফলক এবং হারিয়ে যাওয়া লেখকদের পরিচয় ধীরে ধীরে আবার দৃশ্যমান হয়ে উঠছে কম্পিউটারের বিশ্লেষণে।
মানবসভ্যতার ইতিহাসের বড় অংশ এখনো মাটির নিচে কিংবা ভাঙা নিদর্শনের ভেতর লুকিয়ে আছে। সেই অন্ধকারে আলো ফেলতে এআই হয়তো ভবিষ্যতে প্রত্নতত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারগুলোর একটি হয়ে উঠবে।