এআইয়ের চাহিদা পূরণে সমুদ্রে তৈরি হচ্ছে ভাসমান ডেটা সেন্টার
মাঝসমুদ্রে ভাসছে বিশাল একটি গলফ বল! উচ্চতা প্রায় ৮৫ মিটার, লন্ডনের বিখ্যাত বিগ বেনের সমান। ইস্পাতের তৈরি এই অদ্ভুত কাঠামোটি কোনো জাহাজ নয়। এটি আসলে আস্ত একটি ডেটা সেন্টার। ঢেউয়ের তালে তালে এটি নিজে থেকেই বিদ্যুৎ তৈরি করছে। আর সেই বিদ্যুৎ দিয়ে চলছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সব কাজ।
এআইয়ের জয়জয়কার এখন চারদিকে। কিন্তু এই এআই চালাতে কত বিদ্যুৎ লাগে জানেন? এআইয়ের ডেটা সেন্টারগুলো এরই মধ্যে বিশ্বের অনেক ছোট দেশের চেয়েও বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই বিদ্যুতের চাহিদা ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে। এটি জাপানের মতো দেশের মোট বিদ্যুৎ খরচের চেয়েও অনেক বেশি! বিদ্যুতের এই বিশাল চাহিদা মেটাতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো মহাকাশে ডেটা সেন্টার বসানোর কথাও ভাবছে। সেখানে তারা সার্বক্ষণিক সৌরশক্তি ব্যবহার করতে পারবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগনভিত্তিক স্টার্টআপ প্যানথালাসা পৃথিবীর বুকেই এর সমাধান খুঁজছে। তবে ডাঙায় নয়, মাঝসমুদ্রে।
প্যানথালাসা মাঝসমুদ্রে ভাসমান ও স্বয়ংক্রিয় ডেটা সেন্টার বানাচ্ছে। তারা ১৪ কোটি ডলারের তহবিল পেয়েছে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় এসব ডেটা সেন্টার বসানো হবে। ফলে স্থলের বিদ্যুতের গ্রিডের ওপর কোনো চাপ পড়বে না। কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই চলবে কম্পিউটিংয়ের বিশাল কাজ।
ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই বিদ্যুতের চাহিদা ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে। এটি জাপানের মতো দেশের মোট বিদ্যুৎ খরচের চেয়েও অনেক বেশি!
এদের ডেটা সেন্টারগুলো দেখতে গলফ বল এবং বলটি ধরে রাখা স্ট্যান্ডের মতো। বলের নিচের স্ট্যান্ডের অংশে একটি লম্বা টিউব থাকে। এর নিচের দিকটা খোলা। ঢেউয়ের কারণে কাঠামোটি যখন ওঠানামা করে, তখন ওই টিউব দিয়ে সমুদ্রের পানি হুশ করে ওপরে ফাঁপা বলের ভেতর ঢুকে যায়। বলের ভেতর বাতাস থাকে, তাই এটি সহজে ভাসতে পারে। এই চলন্ত পানি ভেতরের টারবাইন ঘোরায়। তা থেকেই তৈরি হয় বিদ্যুৎ। এই বিদ্যুৎ দিয়েই ডেটা সেন্টারের জিপিইউ, অন্যান্য হার্ডওয়্যার এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগের যন্ত্রপাতি চলে। এগুলো জাহাজ দিয়ে টেনে সমুদ্রে নেওয়া হয়, এরপর নিজস্ব প্রপেলারের সাহায্যে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছায়।
সাধারণ ডেটা সেন্টার ঠান্ডা রাখতে প্রচুর পানি লাগে। কিন্তু প্যানথালাসার সার্ভারগুলো পানির নিচে শক্তভাবে আটকানো মডিউলে থাকে। পাত্রের দেওয়ালটাই এখানে তাপবিনিময়কারী হিসেবে কাজ করে। সার্ভারের তাপ চারপাশের ঠান্ডা পানিতে মিশে যায়। সমুদ্রের স্রোত সেই তাপকে ছড়িয়ে দেয়। তবে এতে সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানের কোনো ক্ষতি হবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
সমুদ্রে ডেটা সেন্টার বসানোর আইডিয়াটি দারুণ। তবে এটি কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির সাবেক গবেষক জোনাথন কুমি বলেন, ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ তৈরির প্রযুক্তি পুরোনো। এটি কাজও করে। তবে সমুদ্রের পরিবেশ খুব রুক্ষ। নোনা পানি ও ঢেউ যন্ত্রপাতির মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
সাধারণ ডেটা সেন্টার ঠান্ডা রাখতে প্রচুর পানি লাগে। কিন্তু প্যানথালাসার সার্ভারগুলো পানির নিচে শক্তভাবে আটকানো মডিউলে থাকে। পাত্রের দেওয়ালটাই এখানে তাপবিনিময়কারী হিসেবে কাজ করে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রক্ষণাবেক্ষণ। এই ডেটা সেন্টারে কোনো মানুষ থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রের আপটাইম ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ জ্যাকুলিন ডেভিস বলেন, ডেটা সেন্টারে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্কিংয়ে। মানুষ ছাড়া মাঝসমুদ্রে এগুলো ঠিক করা খুব কঠিন। এখনো ডেটা সেন্টারে কোনো বড় ঝামেলা হলে সরাসরি মানুষের হাতের ছোঁয়া লাগে। কুলিং কম্প্রেসার রিস্টার্ট দেওয়ার মতো কাজে মানুষের বিকল্প নেই বললেই চলে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো নেটওয়ার্কের গতি। প্যানথালাসা ডেটা আদান-প্রদানের জন্য স্টারলিংক স্যাটেলাইট ব্যবহার করবে। ফাইবার অপটিক কেবলের তুলনায় এর গতি কম। তাই চ্যাটবট বা সার্চ ইঞ্জিনের মতো দ্রুত কাজের জন্য এটি সুবিধাজনক নয়। তবে এআই মডেল ট্রেনিং বা বৈজ্ঞানিক সিমুলেশনের মতো যেসব কাজে অনেক সময় লাগে, সেগুলোর জন্য এটি বেশ কাজের।
সমুদ্রে ডেটা সেন্টার বসানোর এই ধারণা কিন্তু নতুন নয়। আইকিদো টেকনোলজিস সমুদ্রে বায়ুকলের সঙ্গে ডেটা সেন্টার যুক্ত করার কাজ করছে। মিতসুই ও.এস.কে. জাহাজের ওপর ডেটা সেন্টার বসানোর গবেষণা করছে। মাইক্রোসফটও আগে প্রজেক্ট নাটিকের মাধ্যমে পানির নিচে সার্ভার বসিয়ে পরীক্ষা করেছিল।
তবে এসব প্রযুক্তি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়েই আছে। ডাঙায় বিশাল ডেটা সেন্টার বানালে খরচ অনেক কমে যায়। মাঝসমুদ্রে এত বড় অবকাঠামো বানানো অনেক কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই সাধারণ ডেটা সেন্টারের সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে প্যানথালাসাকে এখনো কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে।