এবার মানুষের মস্তিষ্কের কোষ দিয়ে তৈরি হচ্ছে বিশ্বের প্রথম জীবন্ত ডেটা সেন্টার
কল্পবিজ্ঞানের মুভিগুলোতে আমরা প্রায়ই দেখি, বিশাল এক ল্যাবরেটরিতে কাঁচের জারের ভেতর মানুষের মস্তিষ্ক রাখা আছে। তার সঙ্গে হাজারো তার জুড়ে দিয়ে চালানো হচ্ছে সুপারকম্পিউটার! দৃশ্যগুলো দেখে আমরা রোমাঞ্চিত হই ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই হয়তো ভাবি; এসব তো কেবলই পরিচালকের বুনো কল্পনা! কিন্তু সেই কল্পনাই এবার আক্ষরিক অর্থে বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। বিশাল সব ডেটা সেন্টারে সারি সারি সিলিকন চিপের বদলে এবার জায়গা করে নিচ্ছে জীবন্ত কোষ, মানুষের মস্তিষ্কের নিউরন!
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি যে অবিশ্বাস্য গতিতে এগোচ্ছে, বিশেষ করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যে রমরমা অবস্থা, তাতে বিশ্বজুড়ে বিশাল সব ডেটা সেন্টারের প্রয়োজনীয়তা আকাশ ছুঁয়েছে। এই ডেটা সেন্টারগুলোর প্রাণভোমরা হলো আধুনিক সব সিলিকন চিপ। কিন্তু সমস্যা হলো, এই অত্যাধুনিক চিপগুলোর দাম যেমন আকাশচুম্বী, তেমনি এগুলো চালাতে প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের। এই বিশাল বিদ্যুৎ খরচ ও চিপের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বিজ্ঞানীরা এক জাদুকরী পথের সন্ধান পেয়েছেন। সেই পথটি হলো জৈবিক কম্পিউটার তৈরি করা।
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক স্টার্টআপ কোম্পানি কোর্টিক্যাল ল্যাবস সম্প্রতি এক যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়ে গোটা প্রযুক্তি দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। তারা মানুষের মস্তিষ্কের নিউরন কোষ দিয়ে তৈরি এমন দুটি জৈবিক ডেটা সেন্টার নির্মাণ করতে যাচ্ছে, যা হয়তো প্রযুক্তির ইতিহাসটাই নতুন করে লিখে দেবে। এই কোর্টিক্যাল ল্যাবস আগে তাদের ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা নিউরনের সাহায্যে ক্লাসিক ভিডিও গেম পং খেলিয়ে বিশ্বজুড়ে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিল। মার্চ মাসের শুরুতেই তারা দেখিয়েছে, তাদের তৈরি ফ্ল্যাগশিপ জৈবিক কম্পিউটার সিএল১ মাত্র এক সপ্তাহের চেষ্টায় তুমুল জনপ্রিয় এবং জটিল ভিডিও গেম ‘ডুম’ (Doom) খেলাও দারুণভাবে আয়ত্ত করে ফেলেছে!
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক স্টার্টআপ কোম্পানি কোর্টিক্যাল ল্যাবস তাদের ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা নিউরনের সাহায্যে ক্লাসিক ভিডিও গেম পং খেলিয়ে বিশ্বজুড়ে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিল।
কিন্তু এই জীবন্ত কোষগুলো কীভাবে কাজ করে? বিজ্ঞানীরা মাইক্রো-ইলেকট্রোড অ্যারের ওপরে এই নিউরনগুলোকে লালনপালন করেন। এই কোষগুলোকে যখন কোনো ডেটা দেওয়া হয়, তখন ইলেকট্রোডের সাহায্যে তাদের উদ্দীপিত করা হয় এবং তাদের প্রতিক্রিয়া মাপা হয় খুব সূক্ষ্মভাবে। সাধারণ কম্পিউটারের মতো এদের কোনো নির্দিষ্ট কোড দিয়ে প্রোগ্রামিং করা যায় না; বরং এরা অনেকটা মানুষের মতোই বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে শেখে! যুক্তরাজ্যের এসেক্স ইউনিভার্সিটির গবেষক রেইনহোল্ড শেপারের মতে, ‘এই প্রযুক্তির সাহায্যে আমরা সাধারণ কম্পিউটারের মতো প্রোগ্রামিং করি না, বরং নিউরনকে কোনো কিছু শেখানোর নতুন জগৎ আবিষ্কার করছি।’
কোর্টিক্যাল ল্যাবস জানিয়েছে, তারা প্রাথমিকভাবে দুটি ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। এর মধ্যে প্রথমটি তৈরি হবে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে। সেখানে অন্তত ১২০টি সিএল১ ইউনিট যুক্ত থাকবে। আর দ্বিতীয়টি তৈরি হচ্ছে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে। শুরুতে সেখানে মাত্র ২০টি ইউনিট থাকলেও, সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পর এটিকে ১ হাজার ইউনিটের বিশাল ডেটা সেন্টারে রূপ দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে কোম্পানিটি। ফলে সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা ক্লাউড সার্ভিসের মাধ্যমে এই ব্রেন-কম্পিউটিং সেবা ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
এসেক্স ইউনিভার্সিটির আরেক গবেষক মাইকেল ব্যারোস ইতিমধ্যেই তাঁর গবেষণার কাজে কোর্টিক্যাল ল্যাবসের এই ক্লাউড সেবা ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন, ‘জৈবিক কম্পিউটার তৈরি করা ভীষণ কঠিন এবং প্রচুর অর্থ ও পরিশ্রমের ব্যাপার। কিন্তু কোর্টিক্যাল ল্যাবস এই প্রথম এই প্রযুক্তিকে বিশাল পরিসরে সবার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করতে যাচ্ছে।’
গবেষক রেইনহোল্ড শেপারের মতে, ‘এই প্রযুক্তির সাহায্যে আমরা সাধারণ কম্পিউটারের মতো প্রোগ্রামিং করি না, বরং নিউরনকে কোনো কিছু শেখানোর নতুন জগৎ আবিষ্কার করছি।’
এই জৈবিক কম্পিউটারের সবচেয়ে বড় চমক হলো এর বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ক্ষমতা। বর্তমানে অত্যাধুনিক একটি এআই চিপ বা জিপিইউ চালাতে হাজার হাজার ওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। সেখানে কোর্টিক্যাল ল্যাবসের দাবি, তাদের প্রতিটি সিএল১ ইউনিট চালাতে মাত্র ৩০ ওয়াট বিদ্যুত প্রয়োজন হবে!
সাধারণ ডেটা সেন্টারগুলো অতিরিক্ত গরম হয়ে যায় বলে সেগুলো ঠান্ডা রাখতে বিশাল কুলিং সিস্টেমের পেছনে প্রচুর শক্তি খরচ হয়। কিন্তু এই জৈবিক ডেটা সেন্টারে কুলিংয়ের তেমন কোনো ঝামেলা নেই বললেই চলে! তবে যেহেতু এখানে সিলিকনের বদলে জীবন্ত কোষ থাকে, তাই কোষগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিয়মিত পুষ্টি উপাদান বা নিউট্রিয়েন্ট সরবরাহ করতে হয়।
তবে প্রযুক্তি দুনিয়ার এই নতুন পথে বেশ কিছু বড় কাঁটাও বিছানো রয়েছে। অক্সফোর্ড ব্রুকস ইউনিভার্সিটির গবেষক টিয়ের্ড ওল্ডে শেপার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘মানুষ যেমনটা ভাবছে, এই প্রযুক্তি কি এখনই ঠিক সেভাবে কাজ করবে? উত্তর, না। আমরা এখনো এই প্রযুক্তির একেবারে আঁতুড়ঘরে আছি।’
ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির স্টিভ ফারবার মনে করেন, একটি ছোট নিউরাল নেটওয়ার্ককে দিয়ে ভিডিও গেম খেলানো এবং বিশাল কোনো এআই ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল চালানো মোটেও এক কথা নয়। সাধারণ সিলিকন চিপের মতো লাখ লাখ জিপিইউয়ের বিপরীতে শত শত বায়োলজিক্যাল চিপ দিয়ে এখনই প্রচলিত গাণিতিক হিসাব-নিকাশ করানো বেশ কঠিন।
গবেষক টিয়ের্ড ওল্ডে শেপার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘মানুষ যেমনটা ভাবছে, এই প্রযুক্তি কি এখনই ঠিক সেভাবে কাজ করবে? উত্তর, না। আমরা এখনো এই প্রযুক্তির একেবারে আঁতুড়ঘরে আছি।’
সবচেয়ে বড় দুটি বাধা এখনো বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে। প্রথমত, এই জীবন্ত কোষগুলো গেম খেলা বা কোনো নির্দিষ্ট কাজ শেখার পর সেই ফলাফল কীভাবে স্মৃতিতে সংরক্ষণ করে রাখা হবে, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। দ্বিতীয়ত, এই জীবন্ত কোষগুলোর আয়ু অত্যন্ত সীমিত। এই নিউরনগুলোর জীবনকাল যখন শেষ হয়ে যায়, তখন এরা যা কিছু শিখেছিল, তার সব চিরতরে মুছে যায়। ফলে প্রতি ৩০ দিন পরপর পুরো সিস্টেমকে যদি নতুন করে সব শেখাতে হয়, তবে সেটি কোনোভাবেই একটি আদর্শ এবং টেকসই সমাধান হতে পারে না।
বাধা যতই থাকুক, পথ যতই দুর্গম হোক; মানুষের মস্তিষ্কের কোষ দিয়ে কম্পিউটার চালানোর এই সাহসী উদ্যোগ যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এক সম্পূর্ণ নতুন দিগন্তের দরজা খুলে দিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আজকের এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলো হয়তো আগামী দশকের প্রযুক্তি দুনিয়ার চেহারাটাই পাল্টে দেবে।