একটি ল্যাপটপ তৈরিতে কত কার্বন নিঃসরণ হয়
একটি ল্যাপটপ কেনার সময় আমরা সাধারণত র্যাম, প্রসেসর বা দামের দিকেই নজর দিই। কিন্তু এর আড়ালে এমন একটি হিসাব থেকে যায়, যা বিলের কাগজে কোথাও লেখা থাকে না। মেশিনটি হাতে আসার আগেই বাতাসে মিশে যায় কয়েক শ কিলোগ্রাম কার্বন ডাই-অক্সাইড। এই সংখ্যা ঠিক কত, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যেও দ্বিমত রয়েছে। ডেল বা লেনোভো নিজেদের ল্যাপটপের জন্য যে লাইফসাইকেল অ্যাসেসমেন্ট প্রকাশ করে, সেগুলোর সংখ্যাও একেক রকম। একটি ছোট ম্যাকবুক এয়ারের সঙ্গে ভারী গেমিং ল্যাপটপের তুলনা চলে না; কারণ এর ভেতরের উপাদান, ব্যাটারির আকার ও স্ক্রিনের প্রযুক্তিসহ অনেককিছুই আলাদা।
তবু এসব থেকে মোটামুটি একটি চিত্র পাওয়া যায়। বিভিন্ন লাইফসাইকেল বিশ্লেষণ মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, একটি সাধারণ ল্যাপটপ তৈরিতে গড়ে ২০০ থেকে ৩৩০ কিলোগ্রামের কাছাকাছি কার্বন সমতুল্য নির্গমন হয়। কমপ্যাক্ট মডেলের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ১৫০ কেজির আশপাশে নেমে আসতে পারে; আবার বড় ওয়ার্কস্টেশন-ক্লাস ল্যাপটপের ক্ষেত্রে সেটি কখনো কখনো ৬০০ কেজিও ছাড়িয়ে যায়। এই নির্গমনের সিংহভাগ, অর্থাৎ ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশই ল্যাপটপ তৈরির পর্যায়ে ঘটে। বাকিটা শিপিং বা পরিবহন এবং বিদ্যুৎ খরচের কারণে হয়।
বিভিন্ন লাইফসাইকেল বিশ্লেষণ মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, একটি সাধারণ ল্যাপটপ তৈরিতে গড়ে ২০০ থেকে ৩৩০ কিলোগ্রামের কাছাকাছি কার্বন সমতুল্য নির্গমন হয়।
মাদারবোর্ড, স্ক্রিন ও এসএসডি—কার্বন নির্গমনের দিক থেকে এই তিনটি অংশই সবচেয়ে ভারী। মাদারবোর্ডে সিলিকন চিপ বসাতে হয়। আর সিলিকন চিপ বানাতে প্রয়োজন অতি উচ্চ তাপমাত্রার ফার্নেস বা চুল্লি, বিশুদ্ধ কোয়ার্টজ এবং প্রচুর বিদ্যুৎ। এই বিদ্যুতের বেশির ভাগই এখনো আসে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর গ্রিড থেকে; বিশেষ করে তাইওয়ান ও চীনের যেসব কারখানায় বিশ্বের অধিকাংশ চিপ তৈরি হয়, সেখানে। ল্যাপটপের স্ক্রিন তৈরিতে দরকার লিকুইড ক্রিস্টাল ও ইন্ডিয়াম টিন অক্সাইড। ইন্ডিয়াম একটি বিরল ধাতু, এটি তুলতে বিপুল পরিমাণে মাটি খুঁড়তে হয়; অথচ ধাতু মেলে সামান্যই। ব্যাটারিতে ব্যবহৃত হয় লিথিয়াম, কোবাল্ট ও নিকেল। এসব ধাতুর খনন আর পরিশোধনেও কম শক্তির প্রয়োজন হয় না।
একটি মাঝারি মানের ল্যাপটপ তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার লিটার পানি ব্যবহৃত হয়। খনি থেকে ধাতু তোলার প্রক্রিয়ায় মাটি সরাতে হয় প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোগ্রাম। মূলত ল্যাপটপের নির্দিষ্ট কোনো জন্মস্থান নেই। এর কাঁচামাল আসে এক মহাদেশ থেকে, চিপ তৈরি হয় তাইওয়ানে, স্ক্রিন তৈরি হয় কোরিয়ায়, ব্যাটারি হয়তো চীনে এবং শেষ অ্যাসেম্বলি হয় ভিয়েতনামে। এর মাঝে থাকে পরিবহন—সমুদ্রপথে কার্বন নির্গমনের ক্ষতি কম হলেও আকাশপথে তা অনেক বেশি। কেবল বিমানে যন্ত্রাংশ পাঠানোর কারণেই পরিবহন খাতে গড়ে প্রায় ৩০ কেজি কার্বন যোগ হয়; যদিও প্রস্তুতকারকেরা দাবি করেন, এটি মোট নির্গমনের মাত্র ৬ থেকে ১২ শতাংশ।
মূলত ল্যাপটপের নির্দিষ্ট কোনো জন্মস্থান নেই। এর কাঁচামাল আসে এক মহাদেশ থেকে, চিপ তৈরি হয় তাইওয়ানে, স্ক্রিন তৈরি হয় কোরিয়ায়, ব্যাটারি হয়তো চীনে এবং শেষ অ্যাসেম্বলি হয় ভিয়েতনামে।
তবে ল্যাপটপ ব্যবহারের পর্যায়ে চিত্রটি কিছুটা উল্টে যায়। রোজ কয়েক ঘণ্টা চালালে একটি ল্যাপটপ বছরে ৪৪ থেকে ৮৮ কেজি কার্বন নির্গমনের জন্য দায়ী হয়। এটি নির্ভর করে বিদ্যুতের উৎসের ওপর। কয়লানির্ভর গ্রিড হলে নির্গমন বেশি হয়, সৌর বা জলবিদ্যুৎ হলে কম। চার-পাঁচ বছরের আয়ুষ্কালে এই নির্গমন যোগ করলেও তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ল্যাপটপ তৈরির সময়কার নির্গমনকে ছাড়িয়ে যায় না। এর মানে দাঁড়ায়, ল্যাপটপের পরিবেশগত ক্ষতির সবচেয়ে বড় অংশটি দোকানে পৌঁছানোর অনেক আগেই ঘটে যায়।
একক ল্যাপটপের হিসাবে সংখ্যাটি ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু সামগ্রিক স্কেলে এটি অনেক বড় হয়ে দাঁড়ায়। শুধু ২০২১ সালেই বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৫ কোটি কম্পিউটার ও ল্যাপটপ বিক্রি হয়েছিল। প্রতিটির গড় নির্গমন ৩০০ কেজি ধরলে শুধু এক বছরের বিক্রিতেই বাতাসে যোগ হয় সাড়ে ৭ কোটি টন কার্বন, যা কোনো মাঝারি আকারের দেশের বার্ষিক নির্গমনের কাছাকাছি। পুরো তথ্যপ্রযুক্তি খাত মিলিয়ে তা বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশের জন্য দায়ী।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই হিসাবটি অবশ্য একটু ভিন্ন। এখানে ল্যাপটপ তৈরি হয় না বললেই চলে; বরং সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় ল্যাপটপ আমদানি করা হয়, যার বেশির ভাগই আসে চীন বা ভিয়েতনাম থেকে। উৎপাদনের এই কার্বন খরচ বাংলাদেশের নিজস্ব নির্গমন হিসেবে কোথাও লেখা হয় না। অর্থাৎ ব্যবহার করা হছে এখানে, খরচের হিসাব লেখা হচ্ছে অন্য দেশের খাতায়। রিমোট কাজ, ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন ক্লাস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে ব্যক্তিগত কম্পিউটারের চাহিদাও দ্রুত বেড়েছে।
প্রতিটির গড় নির্গমন ৩০০ কেজি ধরলে শুধু এক বছরের বিক্রিতেই বাতাসে যোগ হয় সাড়ে ৭ কোটি টন কার্বন, যা কোনো মাঝারি আকারের দেশের বার্ষিক নির্গমনের কাছাকাছি।
এর সমাধানের একটি অন্যতম পথ হতে পারে রিফার্বিশড ডিভাইস। পুরোনো ল্যাপটপ মেরামত করে বাজারে আনলে নতুন ল্যাপটপের তুলনায় প্রায় ৮৫ শতাংশ কম কার্বন খরচ হয়। কারণ মাদারবোর্ড, চেসিস ও স্ক্রিনের মতো সবচেয়ে ভারী অংশগুলো এ ক্ষেত্রে নতুন করে বানাতে হয় না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দক্ষিণ এশিয়ায় রিফার্বিশড মার্কেট এখনো সেভাবে শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে পারেনি। কারণ, এসব ডিভাইসে সাধারণত ওয়ারেন্টি থাকে না, ব্যাটারির স্বাস্থ্য নিয়েও একধরনের অনিশ্চয়তা থেকে যায়; সর্বোপরি পুরোনো মাল নিয়ে মানুষের মধ্যে একধরনের সামাজিক দ্বিধাও কাজ করে।
ডিভাইসের আয়ু বাড়ানোটাও একটি ভালো সমাধান হতে পারে। একটি ল্যাপটপ তিন বছরের বদলে ছয় বছর ব্যবহার করলে বছরপ্রতি নির্গমনের ভাগ কমে অর্ধেকে নেমে আসে। কিন্তু সফটওয়্যার আপডেট, ব্যাটারির ক্ষয় এবং নতুন মডেল কেনার তাগিদ; সব মিলিয়ে প্রায়ই ডিভাইসের কার্যকর আয়ু কমে যায়।
ল্যাপটপের স্ক্রিনের আলো জ্বলার আগেই লেখা হয়ে যায় ধাতুর ইতিহাস, খনির ইতিহাস আর জাহাজের ডেকে কাটা দিনগুলোর হিসাব। আমরা কি-বোর্ডে টাইপ করার মুহূর্তে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ করি, তা ল্যাপটপ তৈরির বিশাল কার্বন খরচের তুলনায় নিতান্তই সামান্য!