নতুন বাবা হওয়ার আনন্দ যে কারণে বিষাদে পরিণত হয়
ম্যাট লুইস-কার্টারের জন্য বাবা হওয়ার খবরটা অনেকটা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই ছিল। তাঁর সঙ্গী চেস যখন হঠাৎ করেই অন্তঃসত্ত্বা হলেন, ম্যাট বুঝতে পারছিলেন না এই নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে তিনি কীভাবে মানিয়ে নেবেন। ২০২১ সালের জুলাই মাসে যখন তাঁর কন্যা সন্তানের জন্ম হলো, তখন ম্যাটের ভেতরে অদ্ভুত এক শূন্যতা কাজ করছিল। সন্তানের প্রতি তাঁর কোনো মায়াই জন্মাল না। উল্টো তিনি এক গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যেতে শুরু করলেন।
বাড়ি থেকে পালানোর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দৌড়াতেন ম্যাট। মনে যে ভীষণ কষ্ট, সেটা সঙ্গী চেসকে বুঝতে দিতেন না। চেস এমনিতেই নতুন মা হওয়ার শারীরিক ও মানসিক ধকল সামলাচ্ছেন, তার ওপর নিজের বোঝা চাপাতে চাননি ম্যাট। কিন্তু ভেতরে ভেতরে পরিস্থিতি এতই খারাপ হচ্ছিল যে, ৩৭ বছর বয়সী এই ফিটনেস ট্রেইনার জীবনে প্রথমবারের মতো নিজের মৃত্যুর কথা ভাবতে শুরু করলেন!
ঠিক এক বছর পর ম্যাট গুগল ঘাঁটতে গিয়ে একটা আর্টিকেলের সন্ধান পেলেন। বাবাদের পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন। লেখাটা পড়ার পর ম্যাটের মনে হলো, তাঁরও ঠিক এই সমস্যাটাই হচ্ছে! এর আগে ম্যাটের মতো ৪০ শতাংশ মানুষ কখনো শোনেইনি যে নতুন বাবাদেরও পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন হতে পারে।
সন্তান জন্মের পর মায়েদের শরীরে হরমোনের বিশাল পরিবর্তন আসে, এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু বাবাদের শরীরে কি পরিবর্তন আসে না? বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাবারাও প্রায় সমান মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যান। রাত জেগে থাকা, ঘুমের অভাব, দায়িত্ব বেড়ে যাওয়া, নিজের আগের পরিচয় হারিয়ে ফেলা—সব মিলিয়ে একজন নতুন বাবার মানসিক অবস্থাও টালমাটাল হয়ে যায়।
ভেতরে ভেতরে ম্যাটের পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হচ্ছিল যে, ৩৭ বছর বয়সী এই ফিটনেস ট্রেইনার জীবনে প্রথমবারের মতো নিজের মৃত্যুর কথা ভাবতে শুরু করলেন!
পরিসংখ্যান বলছে, নতুন মায়েদের মধ্যে যেখানে ১৩ শতাংশ পিপিডিতে ভোগেন, সেখানে বাবাদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৮.৪ শতাংশ। আরও ভয়ংকর তথ্য হলো, যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন মায়েদের তুলনায় নতুন বাবাদের আত্মহত্যার হার প্রায় সাত গুণ বেশি!
অথচ সমাজ বা চিকিৎসাব্যবস্থা বাবাদের এই নীরব সমস্যাকে কখনো সেভাবে পাত্তাই দেয়নি। সবাই মনে করে, বাবার কাজ তো শুধু রোজগার করা ও পরিবারকে সাপোর্ট দেওয়া। তাঁর আবার ডিপ্রেশন কিসের?
ম্যাট লুইস-কার্টার যখন মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন, তখন কোনো ডাক্তার তাঁকে একবারও জিজ্ঞেস করেননি, ‘ম্যাট, তুমি কেমন আছো?’ ম্যাট নিজেও কিছু বলেননি, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, ‘চেসের শরীরের ওপর দিয়ে এত ঝড় যাচ্ছে, সেখানে আমার মন খারাপের কথা বলাটা স্বার্থপরতা।’
সমস্যা হলো, কোনো বাবা যদি নিজের থেকে সাহায্য চাইতেও যান, ডাক্তাররা অনেক সময় তাঁদের রোগ ধরতেই পারেন না। কারণ পিপিডি মাপার জন্য সারা বিশ্বে যে প্রশ্নমালা ব্যবহার করা হয়, সেটা আসলে মায়েদের কথা মাথায় রেখে বানানো। সেখানে জানতে চাওয়া হয়, আপনি কি সারাদিন কাঁদেন? আপনার কি খুব মন খারাপ লাগে?
ম্যাট লুইস-কার্টার যখন মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন, তখন কোনো ডাক্তার তাঁকে একবারও জিজ্ঞেস করেননি, ‘ম্যাট, তুমি কেমন আছো?’ ম্যাট নিজেও কিছু বলেননি।
অস্ট্রিয়ার ইনসব্রুক ইউনিভার্সিটির গবেষক ফিলিপ শখ বলছেন, ‘পুরুষদের ডিপ্রেশনের লক্ষণ ও নারীদের লক্ষণ এক নয়। পুরুষেরা ডিপ্রেশনে পড়লে সাধারণত বসে বসে কাঁদেন না। তাঁরা বরং খিটখিটে হয়ে যান, কিংবা ম্যাটের মতো দৌড়ান। কেউ হয়তো কাজের মধ্যে ডুবে থাকার চেষ্টা করেন। মায়েদের স্কেল দিয়ে মাপতে গেলে বাবাদের এই পুরুষালি ডিপ্রেশনের লক্ষণগুলো চোখ এড়িয়ে যায়।’
ধরুন, কোনোভাবে বোঝা গেল যে একজন বাবার ডিপ্রেশন হয়েছে। এবার তাঁকে চিকিৎসকের কাছে পাঠাতে হবে। কিন্তু এখানেই বাঁধে আরেক বিপত্তি। অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির গবেষক রিচার্ড ফ্লেচার দীর্ঘ ২০ বছর ধরে বাবাদের নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর মতে, ‘বাবারাই তো থেরাপিতে যেতে চান না। তাঁরা জানেনই না থেরাপি কী, আর কাকে বিশ্বাস করা যায়।’
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের শেখানো হয়, ছেলেরা কাঁদে না, নিজের সমস্যা নিজেকেই মেটাতে হবে। ফলে থেরাপিতে গিয়ে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করাটাকে অনেক পুরুষ পরাজয় হিসেবে দেখেন।
তবে আশার কথা হলো, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পাল্টাচ্ছে। কানাডার ইউনিভার্সিটি হেলথ নেটওয়ার্কের ইশরাত হুসাইন বাবাদের জন্য বিশেষ ধরনের সাইকোসোশ্যাল ইন্টারভেনশন বা গ্রুপ সেশনের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে বাবাদের শেখানো হয় কীভাবে সন্তানের সঙ্গে খেলতে হয়, কীভাবে মানসিক চাপ সামলাতে হয়। এটিকে থেরাপি না বলে ট্রেনিং প্রোগ্রাম নাম দেওয়ায় বাবারা অনেক স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন এবং এর ফলও দারুণ ইতিবাচক পাওয়া যায়।
অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির গবেষক রিচার্ড ফ্লেচারের মতে, ‘বাবারাই তো থেরাপিতে যেতে চান না। তাঁরা জানেনই না থেরাপি কী, আর কাকে বিশ্বাস করা যায়।’
অস্ট্রেলিয়ায় ফ্লেচার এবং তাঁর দল ‘SMS4dads’ নামের একটি চমৎকার টেক্সট মেসেজ সার্ভিস চালু করেছেন। হবু এবং নতুন বাবাদের মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘আপনি কেমন আছেন? রেটিং দিন ১ থেকে ১০-এর মধ্যে।’ যদি কারও রেটিং খারাপ আসে, সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে প্রফেশনাল হেল্পলাইনে যুক্ত করা হয়। এই সাধারণ একটা মেসেজেই হাজার হাজার বাবা ভরসা পাচ্ছেন, অন্তত কেউ একজন তাঁদের খবর রাখছে। যুক্তরাজ্য সরকারও প্রথমবারের মতো মেনস হেলথ স্ট্র্যাটেজি নিয়ে ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
ম্যাট লুইস-কার্টার আজ একজন সুখী বাবা। তাঁর চার বছর বয়সী মেয়ে এখন তাঁর পৃথিবী। পিপিডি কাটিয়ে উঠতে তাঁর বেশ সময় লেগেছিল, প্রফেশনাল থেরাপিও নিতে হয়েছিল। তবে তিনি চান, অন্য বাবারা যেন তাঁর মতো অন্ধকারে একা কষ্ট না পান।
নতুন বাবা হওয়াটা একটা বিশাল দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাবারা যেন নিজেদের হারিয়ে না ফেলেন। কারণ ম্যাটের ভাষাতেই বলতে হয়, ‘বাবা যখন মানসিকভাবে শক্ত ও সুস্থ থাকেন, তখন পুরো পরিবারের জন্যই সেটা আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়।’