ভয় বা টেনশনে কি স্মৃতিশক্তি বাড়ে

মানসিক চাপ শরীরের জন্য খারাপছবি: গেটি ইমেজ

পরীক্ষার হলের টেনশনের মুহূর্তটা কল্পনা করুন। অথবা এমন একটা দিনের কথা ভাবুন, যেদিন আপনি অনেক ভয় পেয়েছিলেন। প্রচন্ড রেগে যাওয়ার কোনো মূহূর্তের কথাও ভাবতে পারেন। আপনার ভাবনায় যা-ই থাক না কেন, খেয়াল করলে দেখবেন জীবনের সাধারণ দিনগুলোর চেয়ে ওই বিশেষ মুহূর্তগুলো আমাদের অনেক বেশি স্পষ্ট মনে আছে। কীভাবে? কেন ওই বিশেষ স্মৃতি আমাদের এখনো মনে আছে? আমরা তো জানি মানসিক চাপ শরীরের জন্য খারাপ। তাহলে এই চাপের সময় ঘটা ঘটনাগুলো আমাদের মস্তিষ্ক এত যত্ন করে জমিয়ে রাখে কেন?

আমাদের শরীরের এক বিশেষ হরমোনের ভেতর এই রহস্যের সমাধান আছে। বিশেষ সেই হরমোনের নাম কর্টিসল। বিজ্ঞানীরা একে স্ট্রেস হরমোন বলেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক দেখিয়েছেন, এই হরমোনটি কীভাবে আমাদের আবেগী স্মৃতিগুলোকে মস্তিষ্কে জমিয়ে রাখে!

স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল
ছবি: ইউটি সাউথওয়েস্টার্ন মেডিকেল সেন্টার

ইয়েল ইউনিভার্সিটির সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এলিজাবেথ গোল্ডফার্ব ভাবলেন, সবাই তো বলে স্ট্রেস খারাপ। আমি দেখব এর কোনো ভালো দিক আছে কি না। তিনি ও তাঁর দল একটা মজার পরীক্ষা করলেন। তাঁরা কিছু মানুষকে ল্যাবে ডাকলেন। তারপর তাদের দুই ভাগে ভাগ করে দিলেন। এক দলকে খেতে দেওয়া হলো কর্টিসল হরমোন মেশানো ওষুধ, অন্য দলকে দিলেন সাধারণ প্লাসেবো ওষুধ। কে আসল ওষুধ খেয়েছেন আর কে নকল, তা অংশগ্রহণকারীরা জানতেন না।

আরও পড়ুন
ইয়েল ইউনিভার্সিটির সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এলিজাবেথ গোল্ডফার্ব ভাবলেন, সবাই তো বলে স্ট্রেস খারাপ। আমি দেখব এর কোনো ভালো দিক আছে কি না।

এরপর তাদের এমআরআই মেশিনের ভেতর ঢুকিয়ে বিভিন্ন ধরনের ছবি দেখানো হয়। ছবি দেখার সময় তাদের মস্তিষ্কের ভেতর কী ঘটছে, সেটা বিজ্ঞানীরা লাইভ দেখতে পাচ্ছিলেন। পরদিন যখন তাদের সেই ছবিগুলোর কথা জিজ্ঞেস করা হলো, দেখা গেল যাঁরা কর্টিসল ওষুধ খেয়েছিলেন, তাঁরা ওই ছবিগুলো অনেক বেশি নিখুঁতভাবে মনে রাখতে পেরেছেন। বিশেষ করে যেসব ছবির সঙ্গে কোনো আবেগ বা ইমোশন জড়িয়ে ছিল।

ওই ওষুধ খেয়ে মস্তিষ্কের ভেতর কি ঘটেছিল? আসলে আমাদের মস্তিষ্কের কাজ কারবার অনেকটা নেটওয়ার্কের মতো। এখানে আবেগ সামলানোর জন্য একটা টিম আছে, আবার স্মৃতি জমিয়ে রাখার জন্য আছে অন্য একটা টিম।

আমাদের মস্তিষ্ক অনেকটা নেটওয়ার্কের মতো কাজ করে
ছবি: সাই-টেক ডেইলি

সাধারণ সময় এই দুই টিম নিজেদের মতো কাজ করে। কিন্তু যখনই আপনি মানসিক চাপে পড়েন বা শরীরে কর্টিসল বেড়ে যায়, তখন এই হরমোনটি জাদুকরের মতো কাজ করে। এটি মস্তিষ্কের আবেগ ও স্মৃতির টিম দুটোর মধ্যে একটা শক্তিশালী বন্ধুত্ব তৈরি করে দেয়।

গবেষকরা দেখেছেন, কর্টিসল থাকার কারণে মস্তিষ্কের মেমোরি নেটওয়ার্কগুলো থেকে আবেগী তথ্যগুলো বেছে বেছে জমিয়ে রেখেছে। সোজা কথায়, কর্টিসল মস্তিষ্ককে সিগন্যাল দিয়ে জানায়, ‘এই ঘটনাটা গুরুত্বপূর্ণ, ভোলা যাবে না!’

আরও পড়ুন
যখনই আপনি মানসিক চাপে পড়েন বা শরীরে কর্টিসল বেড়ে যায়, তখন এই হরমোনটি জাদুকরের মতো কাজ করে। এটি মস্তিষ্কের আবেগ ও স্মৃতির টিম দুটোর মধ্যে একটা শক্তিশালী বন্ধুত্ব তৈরি করে।

কিন্তু এতে আমাদের লাভ কী? এলিজাবেথ গোল্ডফার্ব বলছেন, স্ট্রেস মানেই যে সবসময় খারাপ, তা কিন্তু নয়। প্রকৃতি আমাদের এভাবে তৈরি করেছে, যাতে আমরা বিপদের মুহূর্তগুলো মনে রাখতে পারি এবং ভবিষ্যতে সতর্ক হতে পারি।

তাই বলে কি সবসময় টেনশন করবেন? একদম না! তবে গবেষকদের টিপস হলো, আপনি যদি নতুন কিছু শিখতে চান এবং সেটা মনে রাখতে চান, তবে সেটার সঙ্গে কোনো আবেগের সংযোগ ঘটানোর চেষ্টা করুন।

স্ট্রেস মানেই যে সবসময় খারাপ, তা কিন্তু নয়
ছবি: ইঙ্ক ম্যাগাজিন

পড়ালেখার বিষয়বস্তুটা যদি বোরিং না হয়ে একটু মজার বা আবেগী হয়, তবে মস্তিষ্কের সেই স্ট্রেস মেকানিজম কাজে লাগিয়ে আপনি তা অনেক দিন মনে রাখতে পারবেন।

তাই পরীক্ষার আগে বা যেকোনো কারণে টেনশন হলে ঘাবড়ে যাবেন না। ভাববেন, আপনার মস্তিষ্ক হয়তো স্মৃতিগুলোকে ঝালাই করে নিচ্ছে!

লেখক: সহকারী শিক্ষক, গণিত বিভাগ, পদ্মা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শরীয়তপুর

সূত্র: সায়েন্স অ্যাডভান্স জার্নাল, ইউনিভার্সিটি অব ইয়েল এবং ফিউচারিটি ডটকম

আরও পড়ুন