একই মায়ের বিড়ালছানা কেন ভিন্ন রঙের হয়

একই মায়ের ছানা হওয়া সত্ত্বেও বিড়ালদের একেকটির রং একেক রকম হয়ছবি: বিয়াক্কায়া / গেটি ইমেজ

মা বিড়ালের কোলে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে চারটি ছানা। দৃশ্যটি বেশ আদুরে হলেও একটি বিষয় অবাক করার মতো। একই মায়ের ছানা হওয়া সত্ত্বেও এদের একেকটির রং একেক রকম। দুটি ছানা হয়তো কুচকুচে কালো, একটি ধবধবে সাদা, অন্যটি আবার বাঘের মতো ডোরাকাটা। মানুষের ক্ষেত্রে যমজ ভাইবোনদের চেহারা বা গায়ের রঙে বেশ মিল থাকে। কিন্তু বিড়ালছানাদের বেলায় কেন দেখা যায় এমন আকাশ-পাতাল পার্থক্য?

বিড়ালের গায়ের রঙের এই বাহার দেখলে সত্যিই অবাক হতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাট ফ্যান্সিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুসারে, বিড়ালের গায়ের রং ও নকশা কয়েক ডজন রকমের হতে পারে। কোনোটি একদম এক রঙের, কোনোটি আবার ডোরাকাটা, কোনোটির গায়ে ছোপ ছোপ সুন্দর দাগ। বিড়ালের এই রংবেরঙের রূপের পেছনে মূল কারিগর হলো তাদের জিন বা বংশগতি।

বিড়ালের গায়ের রং ও নকশা কয়েক ডজন রকমের হতে পারে
ছবি: জগলুল পাশা

সেন্ট লুইসের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোনাথন লসোস বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। তিনি জানান, সাধারণত একটি মা বিড়াল একবারে ৩ থেকে ৫টি বাচ্চা দেয়। প্রতিটি ছানা আলাদা রঙের হতে পারে। বিড়ালের গায়ের রঙের পেছনে অনেকগুলো জিন কাজ করে। জিনগুলো একে অপরের সঙ্গে লুকোচুরি খেলার মতো আচরণ করে। কোনো কোনো জিন এতই শক্তিশালী যে এরা অন্য জিনের প্রভাবকে একদম ঢেকে দেয়।

আরও পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাট ফ্যান্সিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুসারে, বিড়ালের গায়ের রং ও নকশা কয়েক ডজন রকমের হতে পারে। কোনোটি একদম এক রঙের, কোনোটি আবার ডোরাকাটা।

বিষয়টি আরও সহজ করে বোঝা যাক। ধরুন, একটি বিড়ালের জিনে ডোরাকাটা প্যাটার্ন হওয়ার সংকেত আছে। কিন্তু সেই বিড়ালটি যদি উত্তরাধিকার সূত্রে এমন একটি সাদা রঙের শক্তিশালী জিন পায়, যা অন্য সব রংকে ঢেকে দিতে পারে, তবে বিড়ালটি শেষ পর্যন্ত ধবধবে সাদাই হবে। অর্থাৎ এর ভেতরে ডোরাকাটা নকশার জিন লুকিয়ে থাকলেও শক্তিশালী সাদা জিনের দাপটে তা আর প্রকাশ পায় না। অনেকটা উজ্জ্বল সূর্যের আলোয় আকাশের তারা ঢাকা পড়ে যাওয়ার মতো ব্যাপার। আবার এই জিনগুলো একটি নির্দিষ্ট নিয়ম বা ক্রম মেনে চলে। কিছু প্যাটার্ন তৈরির জিন রঙের জিনের সঙ্গে মিলেমিশে নতুন কোনো নকশা তৈরি করে। জিনের এই অদ্ভুত আচরণের কারণেই একই মায়ের গর্ভে থাকা ছানাগুলোর কোনোটা হয় সাদা, কোনোটা কালো, আবার কোনোটা ডোরাকাটা।

তবে বিড়ালের কিছু রং এদের লিঙ্গের ওপরও নির্ভর করে। যেমন তিন রঙের মিশ্রণ বা ক্যালিকো বিড়ালগুলো সব সময় মেয়ে বিড়াল হয়। কারণ এই রঙের জিনটি থাকে এক্স (X) ক্রোমোজোমে। মেয়ে বিড়ালের দুটি এক্স ক্রোমোজোম থাকে, তাই তারা কালো ও কমলা উভয় রঙের জিন ধারণ করতে পারে। জিনের এই সামান্য অদলবদলের কারণেই একই মায়ের ছানা হওয়া সত্ত্বেও এরা দেখতে একদম আলাদা হয়।

বিড়ালের কিছু রং এদের লিঙ্গের ওপরও নির্ভর করে
ছবি: উলিংয়ুন / গেটি ইমেজ

তবে শুধু জেনেটিকস নয়, বিড়ালছানাদের গায়ের রঙের ভিন্নতার পেছনে রয়েছে আরও একটি বড় কারণ। সেটি হলো মা বিড়ালের অদ্ভুত প্রজনন প্রক্রিয়া। অধিকাংশ প্রাণীর ডিম্বাণু একটি নির্দিষ্ট চক্র মেনে নির্গত হলেও বিড়ালের ক্ষেত্রে তা হয় না। এদের ডিম্বাণু ততক্ষণ পর্যন্ত নির্গত হয় না, যতক্ষণ না এরা কোনো পুরুষ বিড়ালের সংস্পর্শে আসে। প্রাণীবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ইনডিউসড ওভুলেশন। প্রকৃতির এই নিয়মটি বিড়ালের বংশবৃদ্ধির নিশ্চয়তা অনেক বাড়িয়ে দেয়।

আরও পড়ুন
বিড়ালের কিছু রং এদের লিঙ্গের ওপরও নির্ভর করে। যেমন তিন রঙের মিশ্রণ বা ক্যালিকো বিড়ালগুলো সব সময় মেয়ে বিড়াল হয়। কারণ এই রঙের জিনটি থাকে এক্স ক্রোমোজোমে।

মা বিড়াল এই সময়ে একের বেশি ডিম্বাণু ছাড়তে পারে। এখন বিড়ালটি যদি কয়েক দিনের ব্যবধানে আলাদা আলাদা পুরুষ বিড়ালের সঙ্গে মিলিত হয়, তবে গর্ভে থাকা প্রতিটি ডিম্বাণু ভিন্ন ভিন্ন বাবার মাধ্যমে নিষিক্ত হতে পারে। অর্থাৎ একই সঙ্গে জন্ম নেওয়া এই ভাইবোনদের বাবা কিন্তু আলাদা হতে পারে! বিজ্ঞানীরা এই অদ্ভুত ও বিরল ঘটনাকে বলেন হেটেরোপ্যাটার্নাল সুপারফেকান্ডেশন।

প্রাণীজগতে এটি কিন্তু বিরল নয়। কুকুর, ভেড়া এমনকি গরুর ক্ষেত্রেও এমনটা দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, প্রকৃতির এই ব্যবস্থাটি বিড়ালসহ অন্যান্য প্রাণীর টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একেক ছানার বাবা একেকজন হওয়ায় এদের মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্য অনেক বেড়ে যায়। ফলে কোনো মহামারি বা কঠিন পরিবেশে যখন রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ে, তখন সব ছানা মারা না গিয়ে অন্তত কেউ কেউ টিকে থাকার শক্তি পায়।

জিনের জটিল আচরণের জন্য বিড়ালছানাগুলো দেখতে এতটা রংবেরঙের আর বৈচিত্র্যময় হয়
ছবি: পপুলার সায়েন্স

গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামে থাকা বিড়ালের চেয়ে শহরের বিড়ালের মধ্যে এই রঙের ভিন্নতা অনেক বেশি। কারণ শহরে অনেক বিড়াল কাছাকাছি থাকে, তাই মা বিড়ালটির পক্ষে অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক পুরুষ সঙ্গীর সংস্পর্শে আসা সহজ হয়ে যায়। পরিসংখ্যান বলছে, শহরের প্রায় ৭০ থেকে ৮৩ শতাংশ বিড়ালছানার দলের বাবা আলাদা আলাদা হয়ে থাকে। মূলত জিনের জটিল আচরণ আর এই একাধিক পিতৃত্বের কারণেই বিড়ালছানাগুলো দেখতে এতটা রংবেরঙের আর বৈচিত্র্যময় হয়।

লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তা

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন