ভয়ংকর জম্বি ফাঙ্গাস

জম্বি ফাঙ্গাস পিঁপড়াকে মেরে শরীর ফুঁড়ে বেরিয়েছে

ধরুন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরে থাইল্যান্ড এসেছেন। ভাবলেন, থাইল্যান্ড এসে রেইনফরেস্ট না দেখে চলে গেলে কীভাবে হয়? কাজেই দলবল নিয়ে কোনো এক রেইনফরেস্টে এসে ক্যাম্প করলেন। সবাই খুব খুশি, উত্তেজনায় ফুটছেন মনে মনে। এ ধরনের অ্যাডভেঞ্চারের মজাই আলাদা।

ছোট্ট করে আগুন জ্বেলে মাটিতে বসে রাতের খাবার সেরে নিলেন। তারপর সকাল সকাল ঘুরতে বেরোনো যাবে ভেবে ঘুমিয়ে পড়লেন একটু আগে আগে। মাঝরাতে বিচিত্র কোনো কারণে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। তাঁবু থেকে বেরিয়ে যা দেখলেন, তাতে আপনার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। জম্বি! এতদিন দেখে আসা সব জম্বি মুভি-সিরিজের কথা একে একে মনে পড়ে যাচ্ছে। ওয়াকিং ডেড! কেমন লাগবে তখন?

না, নিঃশ্বাস আটকে ফেলার কিছু নেই। নতুন করে এমন কিছুর সন্ধান পাওয়া যায়নি, যেটা মানুষকে জম্বি বানিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু পিঁপড়াদের জন্য ব্যাপারটা এত সুখকর নয়। থাইল্যান্ডের রেইনফরেস্টে আসলেই এমন একধরনের ছত্রাক আছে, যারা জীবন ধারণের জন্য অন্য প্রাণীকে আক্রমণ করে খুন করে এবং সেই মৃতদেহে জীবন যাপন করে নিজের ইচ্ছেমতো! খুন করার আগে এরা পোষককে দিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো কাজও করিয়ে নেয়। এই কাজটা করে তাদের মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।

সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, মুভিতে যেমন দেখা যায়, একটি এলাকায় একটি জম্বি ঢুকে পড়লে পুরো এলাকাটিই জম্বিদের দখলে চলে যেতে পারে, বাস্তবে জম্বি ফাঙ্গাসও ঠিক একই কাজ করে

না, ভুল শুনছেন না। এটা কোনো সায়েন্স ফিকশন নয়, নিখাদ বাস্তব। ওফিয়োকর্ডিসেপস ইউনিল্যাটেরালিস (Ophiocordyceps unilateralis) নামের এই ফাঙ্গাস ‘জম্বি ফাঙ্গাস’ নামে পরিচিত। অনেকে এটিকে ‘জম্বি-অ্যান্ট ফাঙ্গাস’ও বলেন। থাইল্যান্ড ও ব্রাজিলের বিভিন্ন রেইনফরেস্টে এরা দিব্যি জাঁকিয়ে আছে। ইউরোপ ছাড়া প্রায় সব মহাদেশেই কম-বেশি দেখা যায় এদের।

ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস এদের পর্যবেক্ষণ করেছিলেন সেই ১৮৫৯ সালে। তবে আরও অনেক আগে থেকেই রয়েছে এরা প্রকৃতিতে। এক গবেষণায় জার্মানির মেসেল পিট নামের ৪৭ মিলিয়ন বছর পুরোনো এক ফসিলে এদের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে। আসলে জম্বি ফাঙ্গাসের বসবাসের জন্য বনজ পরিবেশ প্রয়োজন। আর আবিষ্কৃত ফসিলটি যে সময়কালের, তখন জার্মানিসহ পুরো ইউরোপ মহাদেশের সবটুকু জুড়েই ছিল সবুজের ছড়াছড়ি।

আমাদের সৌভাগ্য, ছত্রাকের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, এরা ঢালাওভাবে সবাইকে আক্রমণ করে না। শুধু নির্দিষ্ট কোনো প্রজাতিকে আক্রমণ করে। তেমনই, এই জম্বি ছত্রাক আক্রমণ করে কার্পেন্টার পিঁপড়াকে। জম্বি ফাঙ্গাস জানে, এই পিঁপড়াকে আক্রমণ করলেই তারা সবচেয়ে ভালোভাবে নিজেদের জীবন যাপন পারবে—সে জন্যই এরা পরিকল্পিতভাবে এসব পিঁপড়াকে আক্রমণ করে।

সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, মুভিতে যেমন দেখা যায়, একটি এলাকায় একটি জম্বি ঢুকে পড়লে পুরো এলাকাটিই জম্বিদের দখলে চলে যেতে পারে, বাস্তবে জম্বি ফাঙ্গাসও ঠিক একই কাজ করে। পিঁপড়ারা সাধারণত মিলেমিশে বসবাস করে কলোনিতে। জম্বি ফাঙ্গাস যদি কোনো কলোনির একটি পিঁপড়াকে জম্বি বানিয়ে নিতে পারে, বাধা না পেলে ওই পিঁপড়ার মাধ্যমে এরা অনায়াসে দখল করে নিতে পারে পুরো কলোনি।

কিন্তু কীভাবে এরকম ‘মাইন্ড কন্ট্রোলিং’ করে এরা? সেটা বুঝতে হলে জানতে হবে জম্বি ফাঙ্গাসের জীবনচক্র।

জম্বি ফাঙ্গাস পিঁপড়াকে অনুকুল পরিবেশে নিয়ে এসে গাছের পাতার তলার পৃষ্ঠে ম্যান্ডিবল (দাঁত) দিয়ে কামড়ে ধরতে বাধ্য করেছে (ওপরে), পিঁপড়ার মাথা ফুঁড়ে বেরিয়েছে জম্বি ফাঙ্গাস (নিচে)
আরও পড়ুন

শুরুটা হয় স্পোর থেকে। এই স্পোরকে সরল করে বলা যায় ছত্রাকের ডিম। পুরোপুরি ডিমের মতো না হলেও ছত্রাকের বংশবৃদ্ধি মূলত এর মাধ্যমেই হয়। পূর্ণবয়স্ক কোনো জম্বি ছত্রাক মাটিতে স্পোর ফেলে রেখে যায়।

পিঁপড়ারা বনের মধ্য দিয়ে চলাচলের সময় অজান্তেই তুলে নেয় সেই স্পোর। তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্ধারিত হয়ে যায় পিঁপড়াটির ভাগ্য—মৃত্যু!

আগে ধারণা করা হতো, এ পরজীবী পোষক দেহের মস্তিষ্ক দখল করে নেয় এবং তাকে দিয়ে ইচ্ছেমতো কাজ করিয়ে নেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা গেছে, জম্বি ফাঙ্গাসে আক্রান্ত পিঁপড়ার মস্তিষ্ক কোনোরকম ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। বরং জম্বি ফাঙ্গাস পিঁপড়ার দেহের যতগুলো সম্ভব কোষ এবং পেশী দখল করে নেয়। এ সময় পিঁপড়ার দেহে একধরনের রাসায়নিক পদার্থ ছেড়ে দেয় এরা। এই রাসায়নিক পদার্থ পিঁপড়ার রক্ত বহনকারী অঙ্গ হিমোসিলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে পিঁপড়াটির নিজ দেহের ওপর আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। বলে রাখি, মানুষের দেহে যেমন শিরা এবং ধমনী দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হয়, পিঁপড়ার দেহে সেটা হয় হিমোসিলের মাধ্যমে। এ অবস্থায় এরা পোষক দেহের পেশীতন্তুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ প্রথমে একেবারে পরিকল্পিতভাবে পিঁপড়াটাকে অকেজো করে নেয় এই ছত্রাক, তারপর পেশীতন্তুগুলো দখল করে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তারপর পাপেট শোতে যেমনটা হয়, সেভাবে সুতো (পড়ুন, পেশী) ধরে পিঁপড়াগুলোকে ইচ্ছেমতো নাচাতে পারে এরা। 

পিঁপড়ারা বনের মধ্য দিয়ে চলাচলের সময় অজান্তেই তুলে নেয় সেই স্পোর। তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্ধারিত হয়ে যায় পিঁপড়াটির ভাগ্য—মৃত্যু!

জম্বি ফাঙ্গাস পিঁপড়াকে চালিয়ে অনুকুল পরিবেশে নিয়ে আসার পর কোনো গাছের পাতার তলার পৃষ্ঠে ম্যান্ডিবল (দাঁত) দিয়ে কামড়ে ধরতে বাধ্য করে। কামড়ে ধরার পরে এরা পিঁপড়ার সব পেশী অকেজো করে দেয়। একে বলা হয় ডেথ গ্রিপ।

এই ডেথ গ্রিপের পর পিঁপড়া মারা যায়। এ পর্যায়ে এসে জম্বি ফাঙ্গাস পিঁপড়ার পুরো দেহ দখল করে নেয় এবং পরিবেশের প্রতিকুলতা থেকে নিজে বাঁচার জন্য দেহের বাইরের কাঠামোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে ছত্রাকটি পোষক দেহে বেড়ে উঠতে পারে প্রয়োজনমতো। বেশ কিছুটা সময় এভাবে অতিবাহিত হয়ে গেছে—এমন কোনো নমুনা পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, নিজ খোলসের ভেতরে পিঁপড়াটির নিজস্ব কিছু আর অবশিষ্ট নেই। ছত্রাকটি আক্ষরিক অর্থেই এর ভেতরের প্রায় সবটা দখল করে নিয়েছে।

আরও পড়ুন

পরবর্তী চার থেকে দশ দিনের ভেতর যথেষ্ট বেড়ে উঠে এ ছত্রাক। এরপর পিঁপড়ার মাথা ছেদ করে ছত্রাকের দেহ (ফ্রুট বডি) বেরিয়ে আসে বাইরে। 

এ যেন এক মৃত্যুচক্র। প্রথমে একটিকে জম্বি বানিয়ে নেওয়া। পরিপূর্ণভাবে বেড়ে ওঠা ওর ভেতরে। তারপরের কাজ কী? বুঝতেই পারছেন—বংশবৃদ্ধি। হ্যাঁ, তাই করে জম্বি ফাঙ্গাস।

এ যেন এক মৃত্যুচক্র। প্রথমে একটিকে জম্বি বানিয়ে নেওয়া। পরিপূর্ণভাবে বেড়ে ওঠা ওর ভেতরে। তারপরের কাজ কী? বুঝতেই পারছেন—বংশবৃদ্ধি। হ্যাঁ, তাই করে জম্বি ফাঙ্গাস

পরিপূর্ণভাবে বেড়ে ওঠা ছত্রাক অনেকগুলো স্পোর জন্ম দেয়। সেগুলো গাছের পাতা থেকে ছড়িয়ে দেয় মাটিতে। আবার কোনো পিঁপড়া তার অজান্তেই মাটি থেকে স্পোর তুলে নিলে ফের শুরু হয় এই মৃত্যুচক্র।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, একধরনের ছত্রাক আছে, যারা এই জম্বি ফাঙ্গাসের বিরুদ্ধে কাজ করে। দমন করে এদের বেড়ে ওঠা। বিজ্ঞানীরা এদের নাম দিয়েছেন ‘অ্যান্টি-জম্বি ফাঙ্গাস’ ফাঙ্গাস। এই অ্যান্টি-জম্বি যখন জম্বি ফাঙ্গাসকে আক্রমণ করে, দেখা গেছে, মাত্র সাড়ে ৬ শতাংশ জম্বি ছত্রাক এদের আক্রমণ থেকে বেঁচে নিজের মতো করে বেড়ে উঠতে পারে। এ জন্যই আসলে কার্পেন্টার প্রজাতির পিঁপড়ারা এখনো পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়নি।

আরও পড়ুন

এ ছাড়াও আরেকটা ব্যাপার আছে। এতদিন ধরে আক্রমণের শিকার পিঁপড়ারা ধীরে ধীরে জেনে গেছে, কোনো আক্রান্ত পিঁপড়াকে ব্যবহার করে জম্বি ফাঙ্গাস চাইলে পুরো কলোনি দখল করে নিতে পারে। কাজেই কালের আবর্তে পিঁপড়ারা এই ছত্রাকে আক্রান্ত যেকোনো সদস্যকে শনাক্ত করতে শিখে গেছে। এমনিতে পিঁপড়ারা বেশ সামাজিক প্রাণী হলেও আত্মরক্ষার জন্য কলোনির কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য সুস্থ সদস্যরা তাকে কলোনি থেকে অনেক দূরে কোথাও রেখে আসে। তাতে রক্ষা পায় পুরো কলোনি।

পুরো ব্যাপারটির মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভুতুড়ে জিনিসটি হলো, জম্বি ফাঙ্গাস ঠিক কী ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করে পোষকদেহ পুরোপুরি দখল করে নেয় এবং মন তথা মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করে— গবেষকরা এখনো সুনির্দিষ্টভাবে সেটি বের করতে পারেননি। এ নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।

সূত্র: হাউ ইট ওয়ার্কস, ওয়্যার্ড ডটকম, দি আটলান্টিক ডটকম, ব্রিটানিকা, উইকিপিডিয়া