অক্টোবর মাস এলেই বিজ্ঞানীদের বুকে যেন একটা ধুকপুকানি শুরু হয়। কারণ, এটা নোবেল মাস। সুইডেনের স্টকহোম থেকে একটা ফোন কলের অপেক্ষায় হয়তো রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায় বিশ্বের অনেক বড় বিজ্ঞানীর। নোবেল কমিটি আবার দুনিয়ার সবচেয়ে বড় লুকোচুরি খেলোয়াড়। কে কে এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন, তা তারা আগামী ৫০ বছর টুঁ শব্দ করে কাউকে জানতে দেবে না! কিন্তু মানুষের কৌতূহল কি আর সিন্দুকের ভেতর আটকে রাখা যায়? ক্ল্যারিভেট সাইটেশন, ল্যাস্কার অ্যাওয়ার্ড বা ব্রেকথ্রু প্রাইজের মতো বড় পুরস্কারগুলোর দিকে নজর রাখলেই মোটামুটি একটা আঁচ পাওয়া যায়, এবার হাওয়া কোন দিকে বইছে। চলুন, অনুমান করার চেষ্টা করি, ২০২৬ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নোবেল কে বা কারা পেতে যাচ্ছেন।
বিশ্বজুড়ে এখন ডায়াবেটিস ও অতিরিক্ত ওজনের মহামারি চলছে। বিজ্ঞানীরা ওজেম্পিক বা ওয়েগোভির মতো এমন ওষুধ তৈরি করেছেন, যা শরীরের GLP-1 নামে হরমোনের মতো কাজ করে।
জিএলপি-১ ড্রাগস
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ২০২৬ সালে নোবেল পেতে পারে, এমন গবেষণার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নাম শোনা যাচ্ছে জিএলপি-১ ড্রাগসের। কী এই জিনিস? আমরা খেতে বসলে একটা নির্দিষ্ট সময় পর আমাদের পেট ভরে যায়। তখন মস্তিষ্কে একটা সংকেত যায়, ‘পেট ভরে গেছে। আর খাওয়ার দরকার নেই।’ এই সংকেতটাই পাঠাই জিএলপি-১ হরমোন।
বিশ্বজুড়ে এখন ডায়াবেটিস ও অতিরিক্ত ওজনের মহামারি চলছে। বিজ্ঞানীরা ওজেম্পিক বা ওয়েগোভির মতো এমন ওষুধ তৈরি করেছেন, যা শরীরের GLP-1 নামে হরমোনের মতো কাজ করে। এগুলো ক্ষুধা কমাতে, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করতে এবং ওজন কমাতে সাহায্য করে। এই যুগান্তকারী চিকিৎসার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে জোয়েল হ্যাবেনার, সভেতলানা মোজসভ ও জেনস জুল হোলস্টের। তাঁদের গবেষণার সঙ্গে ড্যানিয়েল ড্রাকারসহ আরও কয়েকজন বিজ্ঞানীর কাজও যুক্ত।
আমরা খেতে বসলে একটা নির্দিষ্ট সময় পর আমাদের পেট ভরে যায়। তখন মস্তিষ্কে একটা সংকেত যায়, পেট ভরে গেছে। আর খাওয়ার দরকার নেই। এই সংকেতটাই পাঠাই জিএলপি-১ হরমোন।
GLP-1 নিয়ে তাঁদের গবেষণার স্বীকৃতি অবশ্য আগেই মিলেছে। ২০২৪ সালে জোয়েল হ্যাবেনার, সভেতলানা মোজসভ ও জেনস জুল হোলস্টের সঙ্গে ড্যানিয়েল ড্রাকার ও জেফ্রি ফ্রিডম্যান পান প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ড ফর টেকনিক্যাল অ্যান্ড সায়েন্টিফিক রিসার্চ। একই বছর হ্যাবেনার, মোজসভ ও হোলস্ট যৌথভাবে পান ট্যাং প্রাইজ ইন বায়োফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্স। GLP-1 আবিষ্কার, এর কার্যকারিতা বোঝা এবং ডায়াবেটিস ও স্থূলতার চিকিৎসায় এর প্রয়োগের পথ তৈরি করার জন্য তাঁদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
এর পর ২০২৫ সালে আসে আরও বড় স্বীকৃতি। হ্যাবেনার, মোজসভ ও হোলস্টের সঙ্গে ড্যানিয়েল ড্রাকার ও লোটে বিরে নুডসেন যৌথভাবে পান ৩০ লাখ ডলারের ব্রেকথ্রু প্রাইজ ইন লাইফ সায়েন্সেস। পুরস্কারটি দেওয়া হয় GLP-1 আবিষ্কার ও এর শারীরবৃত্তীয় ভূমিকা উন্মোচন এবং ডায়াবেটিস ও স্থূলতার চিকিৎসায় এর সম্ভাবনা দেখানোর জন্য।
অর্থাৎ, হ্যাবেনার, মোজসভ ও হোলস্টের গবেষণার গুরুত্ব নিয়ে এর আগেই আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমহলে বড় ধরনের ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। এবার সেই তালিকায় নোবেল পুরস্কার যোগ হয় কি না, সেটিই দেখার বিষয়।
২০২৪ সালে জোয়েল হ্যাবেনার, সভেতলানা মোজসভ ও জেনস জুল হোলস্টের সঙ্গে ড্যানিয়েল ড্রাকার ও জেফ্রি ফ্রিডম্যান পান প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ড ফর টেকনিক্যাল অ্যান্ড সায়েন্টিফিক রিসার্চ।
নারকোলেপসি
রাস্তায় হাঁটছেন, কিংবা হয়তো কারও সঙ্গে খুব সিরিয়াস আড্ডা দিচ্ছেন। হঠাৎ করেই আপনি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন! নারকোলেপসি রোগে আক্রান্ত রোগীরা ঠিক এভাবেই ভোগেন। তাঁদের মস্তিষ্ক বুঝতে পারে না কখন জাগতে হবে আর কখন ঘুমাতে হবে।
বিজ্ঞানী ইমানুয়েল মাইনট এবং মাসাশি ইয়ানাগিসাওয়া এই রোগের কারণ খুঁজে বের করেছেন। তাঁরা দেখেছেন, আমাদের মস্তিষ্কে ওরেক্সিন নামে একটা রাসায়নিক পদার্থ আছে। এই পদার্থটা ঠিক অ্যালার্ম ঘড়ির মতো কাজ করে। এটি আমাদের জাগিয়ে রাখে। নারকোলেপসি রোগীদের মস্তিষ্কে এই অ্যালার্ম ঘড়িটা নষ্ট হয়ে যায়। এই অভাবনীয় আবিষ্কারের জন্য ইমানুয়েল মাইনট সম্প্রতি বিখ্যাত ল্যাস্কার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। এই পুরস্কারকে অনেকেই আমেরিকান নোবেল বলেন। তাই স্টকহোম থেকে তাঁর কাছে ফোন গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
বিজ্ঞানী ইমানুয়েল মাইনট এবং মাসাশি ইয়ানাগিসাওয়া নারকোলেপসি রোগের কারণ খুঁজে বের করেছেন। তাঁরা দেখেছেন, আমাদের মস্তিষ্কে ওরেক্সিন নামে একটা রাসায়নিক পদার্থ আছে।
কার-টি সেল থেরাপি
ক্যানসার চিকিৎসার সবচেয়ে বড় মুশকিল হলো, কেমোথেরাপি দেওয়ার সময় ভালো কোষ ও খারাপ কোষের কোনো পার্থক্য থাকে না। কিন্তু বিজ্ঞানী কার্ল জুন এবং মিশেল স্যাডেলাইন একটা দারুণ বুদ্ধি বের করেছেন। তাঁরা মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধক টি-সেল বাইরে বের করে আনেন। এরপর ল্যাবরেটরিতে সেগুলোকে ক্যানসার কোষ চেনার প্রশিক্ষণ দেন। ব্যাপারটা অনেকটা কুকুরকে চোরের গন্ধ শুঁকিয়ে ছেড়ে দেওয়ার মতো। এই প্রশিক্ষিত কোষগুলোকে যখন আবার রোগীর শরীরে ঢোকানো হয়, তখন তারা শুধু ক্যানসার কোষগুলোকেই খুঁজে খুঁজে ধ্বংস করে। ক্যানসার চিকিৎসায় এই কার-টি সেল থেরাপি এক নতুন যুগের সূচনা করেছে।
কার্ল জুন ও মিশেল স্যাডেলাইনও তাঁদের কাজের জন্য বেশ কিছু বড় স্বীকৃতি প্যেছেন। ২০২৪ সালে এই দুই বিজ্ঞানী যৌথভাবে পান ব্রেকথ্রু প্রাইজ ইন লাইফ সায়েন্সেস। একই বছর কার-টি সেল থেরাপির উন্নয়নে অবদানের জন্য তাঁরা পান ওয়ারেন আলপার্ট ফাউন্ডেশন প্রাইজ এবং ভিনফিউচার প্রাইজও। এরপর ২০২৫ সালে কার্ল জুন, মিশেল স্যাডেলাইন, ব্রুস লেভিন ও ইসাবেল রিভিয়ের যৌথভাবে পান রিচার্ড এন. মারকিন প্রাইজ ইন বায়োমেডিক্যাল টেকনোলজি। আর ২০২৬ সালে স্যাডেলাইন একাই পান রস প্রাইজ ইন মলিকিউলার মেডিসিন। অর্থাৎ, CAR-T সেল থেরাপির পেছনে থাকা এই গবেষণার গুরুত্ব নিয়ে নোবেলের আগেই একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার এসেছে। ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকাতেও তাই কার্ল জুনের নাম উঠে এসেছে।
কার্ল জুন ও মিশেল স্যাডেলাইনও তাঁদের কাজের জন্য বেশ কিছু বড় স্বীকৃতি প্যেছেন। ২০২৪ সালে এই দুই বিজ্ঞানী যৌথভাবে পান ব্রেকথ্রু প্রাইজ ইন লাইফ সায়েন্সেস।
গাট মাইক্রোবায়োম
আমাদের পেটের ভেতর আস্ত একটা শহর আছে। সেখানে বাস করে কোটি কোটি ক্ষুদ্র বাসিন্দা। এদের আমরা বলি ব্যাকটেরিয়া বা অণুজীব। আগে একটা সাধারণ ধারণা ছিল, ব্যাকটেরিয়া মানেই রোগবালাই।
বিজ্ঞানী জেফরি গর্ডন প্রমাণ করলেন অন্য কথা। আমাদের পেটের ভেতরের এই অণুজীবগুলো শুধু খাবার হজমেই সাহায্য করে না। বরং আমাদের ওজন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, এমনকি মনমেজাজ কেমন থাকবে তাও নিয়ন্ত্রণ করে। বলা যায়, এরা আমাদের শরীরের অদৃশ্য পাহারাদার। এই অণুজীবদের জীবনযাপন আর আমাদের স্বাস্থ্যের সঙ্গে এদের গভীর সম্পর্ক আবিষ্কার করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন এক দিগন্ত খুলে দিয়েছেন জেফরি গর্ডন।
তিনি অবশ্য ইতিমধ্যে অনেকগুলো বড় পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১৮ সালে তিনি পান রয়্যাল সোসাইটির মর্যাদাপূর্ণ কপলি মেডেল। ২০১৯ সালে পান ফ্রন্টিয়ার্স অব নলেজ অ্যাওয়ার্ড। এরপর ২০২১ সালে পান বালজান প্রাইজ ফর মাইক্রোবায়োম ইন হেলথ অ্যান্ড ডিজিজ। ২০২৩ সালে জেফরি গর্ডন, ই. পিটার গ্রিনবার্গ ও বনি এল. ব্যাসলার যৌথভাবে পান প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ড ফর টেকনিক্যাল অ্যান্ড সায়েন্টিফিক রিসার্চ। ২০২৬ সালে তিনি পেয়েছেন গ্যাবেই অ্যাওয়ার্ড ইন বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড মেডিসিন। অর্থাৎ, মানুষের শরীরের অণুজীবসমাজ নিয়ে তাঁর গবেষণা গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক কাজ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে আসছে।
বিজ্ঞানী জেফরি গর্ডন অবশ্য ইতিমধ্যে অনেকগুলো বড় পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১৮ সালে তিনি পান রয়্যাল সোসাইটির মর্যাদাপূর্ণ কপলি মেডেল। ২০১৯ সালে পান ফ্রন্টিয়ার্স অব নলেজ অ্যাওয়ার্ড।
ডিএনএ সিকোয়েন্সিং
মানুষের শরীরের প্রতিটি কোষে থাকা ডিএনএর মধ্যে লেখা আছে আমাদের জিনগত তথ্য। সেই তথ্য পড়তে পারা মানে শরীরের কোন বৈশিষ্ট্য কীভাবে তৈরি হচ্ছে, কোনো রোগের পেছনে কোন জিনের পরিবর্তন আছে তা সরাসরি জানা। কিন্তু একসময় ডিএনএর এই বিশাল জিনগত তথ্য পড়া ছিল অত্যন্ত ধীর ও ব্যয়বহুল কাজ। ২০০০ সালের দিকে মানুষের পুরো জিনোম পড়তে সময় লাগত প্রায় এক দশক, খরচ হতো ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি।
সেই চিত্র বদলে দেন ডেভিড ক্লেনারম্যান ও শংকর বালাসুভ্রমণিয়ান। তাঁরা এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করেন, যাকে বলা হয় নেক্সট-জেনারেশন ডিএনএ সিকোয়েন্সিং বা NGS। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ডিএনএ অংশের জিনগত ক্রম পড়া যায়। ফলে একই সময়ে কোটি কোটি ডিএনএ অংশ বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়। মানুষের পুরো জিনোম পড়তে আগে যে বছরের পর বছর লাগত, এখন তা কয়েক ঘণ্টা বা এক দিনের মধ্যেই করা সম্ভব। খরচও নেমে এসেছে অবিশ্বাস্যভাবে। এই প্রযুক্তির কারণেই ক্যানসার ও বিরল জেনেটিক রোগ শনাক্ত করা, ভাইরাসের জিনোম পড়া এবং নতুন ভাইরাসের ধরন দ্রুত শনাক্ত করা অনেক সহজ হয়েছে।
একসময় ডিএনএর বিশাল জিনগত তথ্য পড়া ছিল অত্যন্ত ধীর ও ব্যয়বহুল কাজ। ২০০০ সালের দিকে মানুষের পুরো জিনোম পড়তে সময় লাগত প্রায় এক দশক, খরচ হতো ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি।
এই আবিষ্কারের স্বীকৃতিও এসেছে একের পর এক। ২০২০ সালের মিলেনিয়াম টেকনোলজি প্রাইজ, ২০২২ সালের ব্রেকথ্রু প্রাইজ ইন লাইফ সায়েন্সেস, ২০২৪ সালের কানাডা গার্ডনার ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ও নোভো নরডিস্ক প্রাইজ পেয়েছেন ক্লেনারম্যান ও বালাসুভ্রমণিয়ান।
২০২৬ সালটি তাঁদের জন্য আরও বিশেষ। এ বছর ক্লেনারম্যান, বালাসুভ্রমণিয়ান ও পাসকাল মায়ের যৌথভাবে পেয়েছেন প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ড ফর টেকনিক্যাল অ্যান্ড সায়েন্টিফিক রিসার্চ। একই বছর ক্লেনারম্যান ও বালাসুভ্রমণিয়ান পেয়েছেন উইলিয়াম বেট হার্ডি প্রাইজও। এমনকি ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে প্রকাশিত পূর্বাভাসেও তাঁদের নাম উঠে এসেছে।
