৫ লাখ মানুষের প্রাণ নেওয়া এক রহস্যময় রোগ
১৯১৬ সালের শীতকাল। ইউরোপজুড়ে তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা। এরই মধ্যে খবর এল আরেক আতঙ্কের। ইনফ্লুয়েঞ্জা তখন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই, অনেকটা নিঃশব্দে মানুষের ওপর হানা দিল এক অদ্ভুত নতুন রোগ।
রোগটা বড়ই বিচিত্র। এতে আক্রান্ত হলে মানুষ জ্বরে ভোগে, তারপর একসময় গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। কেউ কেউ আর কোনো দিন জাগে না। আর যারা জাগে, তারা পরিণত হয় জীবন্ত মূর্তিতে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই রোগটি পরিচিত এনসেফালাইটিস লিথার্জিকা বা ঘুমের রোগ নামে।
ভিয়েনার এক ডাক্তার ও অদ্ভুত সব রোগী
ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকিয়াট্রিক-নিউরোলজিক্যাল ক্লিনিকে তখন কাজ করতেন ডাক্তার কনস্ট্যান্টিন ভন ইকোনোমো। তাঁর কাছে একের পর এক রোগী আসতে শুরু করল অদ্ভুত সব লক্ষণ নিয়ে। কারও মেনিনজাইটিস মনে হচ্ছে, তো কারও মনে হচ্ছে প্রলাপ বকছে। কিন্তু কোনো চেনা রোগের সঙ্গেই এদের লক্ষণগুলো ঠিকঠাক মিলছিল না।
সবার মধ্যে একটা লক্ষণ ছিল কমন, প্রচণ্ড ঘুম বা তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব। ডাক্তার ইকোনোমো বুঝতে পারলেন, এটা সাধারণ কোনো রোগ নয়। তিনি এর নাম দিলেন এনসেফালাইটিস লিথার্জিকা।
এই রোগের আক্রমণ ছিল অনেকটা ভৌতিক সিনেমার মতো। শুরুতে মনে হতো সাধারণ ফ্লু হয়েছে। হালকা জ্বর, মাথা ব্যথা, কাঁপুনি ও বমি ভাব। কিন্তু এরপরই শুরু হতো আসল আতঙ্ক। ২০১৭ সালের এক গবেষণাপত্রে এক হতভাগ্য কিশোরীর ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। মেয়েটি কনসার্ট দেখে হেঁটে বাড়ি ফিরছিল। হঠাৎ সে অনুভব করল তার শরীরের একপাশ অবশ হয়ে যাচ্ছে। বাড়ি পৌঁছানোর আধা ঘণ্টার মধ্যে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। আর ঠিক ১২ দিন পর ঘুমের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।
এনসেফালাইটিস লিথার্জিকা রোগের আক্রমণ দেখে শুরুতে মনে হতো সাধারণ ফ্লু হয়েছে। হালকা জ্বর, মাথা ব্যথা, কাঁপুনি ও বমি ভাব। কিন্তু এরপরই শুরু হতো আসল আতঙ্ক।
জীবন্ত ভূত নাকি জম্বি
এই রোগের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপটি ছিল সমিনোলেন্ট-অফথালমোপ্লিজিক। এতে আক্রান্ত রোগীরা অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমাত। তাদের ডেকে তোলা যেত, তারা জেগে কথাও বলত, কিন্তু তাদের ভেতরে কোনো প্রাণশক্তি থাকত না। তারা জানত তাদের চারপাশে কী ঘটছে, কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাত না। এই ফর্মে মৃত্যুহার ছিল ৫০ শতাংশেরও বেশি!
বিখ্যাত নিউরোলজিস্ট ও লেখক অলিভার স্যাক্স তাঁর বিখ্যাত অ্যাওয়েকেনিংস বইয়ে এই রোগীদের বর্ণনা দিয়েছেন মর্মান্তিক ভাষায়। ১৯৬০-এর দশকে নিউইয়র্কের বেথ আব্রাহাম হাসপাতালে তিনি এমন অনেক রোগীকে দেখেছিলেন, যারা ১৯২০-এর দশকে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে গিয়েছিল।
স্যাক্স লিখেছেন, ‘তারা সচেতন ছিল, কিন্তু পুরোপুরি জাগ্রত নয়। তারা সারাদিন চেয়ারে বসে থাকত নিশ্চল, নির্বাক হয়ে। তাদের কোনো এনার্জি ছিল না, কোনো ইচ্ছে ছিল না, কোনো ক্ষুধা বা আবেগ ছিল না। তারা ছিল ভূতের মতো অশরীরী।’
ভাবুন তো, একটা মানুষ বেঁচে আছে, দেখছে, শুনছে কিন্তু নিজের শরীরের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, কোনো অনুভূতি নেই। যেন পাথর হয়ে যাওয়া এক একটা মানুষ!
যন্ত্রণার নতুন রূপ
কোভিড-১৯ এর মতো এই রোগেরও নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্ট বা রূপ দেখা দিতে শুরু করল। ১৯১৯-২০ সালের দিকে ইতালি ও সুইডেনে এক নতুন ধরনের এনসেফালাইটিস লিথার্জিকা ছড়িয়ে পড়ল। এবার আর শুধু ঘুম নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হলো ইনসোমনিয়া ও প্রচণ্ড ব্যথা। মরফিন দিয়েও সেই ব্যথা কমানো যেত না।
রোগীদের শরীরে দেখা দিত অদ্ভুত সব খিঁচুনি। কারও হাত-পা বেঁকে যেত, কারও পেটের পেশি লাফালাফি করত। দিনের পর দিন তারা চোখের পাতা এক করতে পারত না। শরীর শক্ত হয়ে যেত, নড়াচড়া করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলত তারা।
স্যাক্স লিখেছেন, ‘তারা সচেতন ছিল, কিন্তু পুরোপুরি জাগ্রত নয়। তারা সারাদিন চেয়ারে বসে থাকত নিশ্চল, নির্বাক হয়ে। তাদের কোনো এনার্জি ছিল না, কোনো ইচ্ছে ছিল না, কোনো ক্ষুধা না।’
রহস্যময় অন্তর্ধান
যাঁরা এই রোগের প্রাথমিক ধাক্কা সামলে বেঁচে গিয়েছিলেন, তাঁদের ভোগান্তি সেখানেই শেষ হয়নি। কয়েক বছর পর তাঁদের শরীরে দেখা দিতে শুরু করল পারকিনসন্স রোগের মতো লক্ষণ। হাত-পা কাঁপা, কথা জড়িয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট ও মানসিক সমস্যা। ধারণা করা হয়, পরবর্তী সময়ে পারকিনসন্স রোগে আক্রান্তদের প্রায় ৫০ শতাংশই ছিলেন এই ঘুমের রোগ থেকে বেঁচে ফেরা মানুষ।
কিন্তু এই রোগ এল কোথা থেকে? আর গেলই বা কোথায়? তৎকালীন অনেক বিজ্ঞানী ভাবতেন, ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু ভাইরাসের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র আছে। কারণ, দুটো মহামারি প্রায় একই সময়ে ঘটেছিল। কিন্তু আমেরিকার বিভিন্ন শহরের ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ফ্লু এবং এই ঘুমের রোগের মধ্যে সরাসরি কোনো মিল নেই। তারা আলাদাভাবেই ছড়িয়েছিল।
আধুনিক বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এর পেছনে হয়তো এন্টেরোভাইরাস গোত্রের কোনো ভাইরাসের হাত ছিল। পোলিও ভাইরাসও এই গোত্রের। আক্রান্ত রোগীর কফ বা থুথু থেকে এটি ছড়াতে পারে। কিন্তু নিশ্চিত করে আজও কেউ বলতে পারে না এর আসল কালপ্রিট কে।
১৯১৬ থেকে শুরু হয়ে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত দাপিয়ে বেড়ানোর পর, প্রায় ৫ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়ে এই রোগটি হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেল। যেন কোনো জাদুবলে পৃথিবী থেকে মুছে গেল এনসেফালাইটিস লিথার্জিকা।
আধুনিক বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এনসেফালাইটিস লিথার্জিকা রোগের পেছনে হয়তো এন্টেরোভাইরাস গোত্রের কোনো ভাইরাসের হাত ছিল। পোলিও ভাইরাসও এই গোত্রের।
রোগটি চলে যাওয়া অবশ্যই খুশির খবর। কিন্তু ভয়ের ব্যাপার হলো, আমরা জানি না কেন এটি হয়েছিল বা কেনই বা চলে গেল। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, যতক্ষণ না এর সঠিক কারণ জানা যাচ্ছে, ততক্ষণ আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না যে ভবিষ্যতে কোনো এক ফ্লু মহামারির হাত ধরে এই ঘুমের অভিশাপ আবারও ফিরে আসবে কি না।
আবার যদি ফিরে আসে, তবে আধুনিক বিজ্ঞান কি পারবে মানুষকে এই রোগের হাত থেকে বাঁচাতে? নাকি আমরা আবারও দেখব হাজার হাজার জীবন্ত মূর্তি? উত্তরটা সময়ের হাতেই তোলা থাক।