বিজ্ঞানীরা কীভাবে দুই দিনের মধ্যে হান্টাভাইরাস পিসিআর পরীক্ষা তৈরি করলেন

সম্প্রতি এমভি হন্ডিউস নামে একটি প্রমোদতরীতে এক ভয়ংকর ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে। এর নাম হান্টাভাইরাস। ঘটনাটি আমাদের কোভিডের শুরুর দিনগুলোর কথাই মনে করিয়ে দেয়। একটি অপরিচিত জীবাণুতে আক্রান্ত হয়ে প্রমোদতরীর যাত্রীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন, কিন্তু কে আক্রান্ত আর কে সুস্থ, তা দ্রুত জানার মতো কোনো অনুমোদিত টেস্ট ছিল না। এই ভাইরাসে ইতিমধ্যে ১০ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন ৩ জন। যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে অন্তত ৪১ জন মানুষকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। কারণ এই ভাইরাসের লক্ষণ প্রকাশ পেতে ৪২ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তাঁদের মধ্যে ১৮ জনকে রাখা হয়েছে নেব্রাস্কার ওমাহার ন্যাশনাল কোয়ারেন্টিন ইউনিটে।

কিন্তু কী এই হান্টাভাইরাস? হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুরের মাধ্যমে ছড়ায়। তবে আন্দিজ হান্টাভাইরাস নামে এর যে ধরনটি এখন ছড়াচ্ছে, তা মানুষের শরীর থেকে মানুষের শরীরেও ছড়াতে পারে। এতে আক্রান্ত হলে জ্বর, পেশিতে ব্যথা এবং ফুসফুসে ভয়াবহ সংক্রমণ দেখা দেয়।

এই পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত একটি পিসিআর টেস্ট তৈরির কাজে নেমে পড়েন বিজ্ঞানীরা। মে মাসের ৯ ও ১০ তারিখের সাপ্তাহিক ছুটিতে দিনরাত এক করে কাজ করেন নেব্রাস্কা পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা। কীভাবে তাঁরা মাত্র এক উইকেন্ডে এই অসাধ্য সাধন করলেন, তা নিয়ে বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্টিফিক আমেরিকান-এর সঙ্গে কথা বলেছেন ওই ল্যাবের পরিচালক পিটার আইয়েন এবং উপপরিচালক এমিলি ম্যাককাচেন

হান্টাভাইরাস আশঙ্কায় এমভি হন্ডিয়াস থেকে আসা যাত্রীরা পৌঁছান নেব্রাস্কা মেডিকেল সেন্টারেছবি: গেটি ইমেজ

সায়েন্টিফিক আমেরিকান: আপনাদের ল্যাব কীভাবে এই হান্টাভাইরাস টেস্ট তৈরির কাজে যুক্ত হলো?

পিটার আইয়েন: আমরা ল্যাবরেটরি রেসপন্স নেটওয়ার্কের একটি অংশ। জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো জীবাণু দেখা দিলে দ্রুত তা শনাক্ত করা এবং ব্যবস্থা নেওয়াই পাবলিক হেলথ ল্যাব হিসেবে আমাদের কাজ। আমাদের এখানে, ওমাহার নেব্রাস্কায় ন্যাশনাল কোয়ারেন্টিন ইউনিট আছে। এখানে স্পেশাল প্যাথোজেন ট্রিটমেন্ট সেন্টারও আছে। এই সেন্টারে অত্যন্ত বিপজ্জনক সংক্রামক রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। যখন আমরা শুনলাম যে প্রমোদতরীর যাত্রীরা ওমাহায় আসছেন, তখন আমাদের প্রথম চিন্তাই ছিল এই ইউনিটকে ল্যাব থেকে কীভাবে সাপোর্ট দেওয়া যায়?

সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে আমরা সবার আগে সিডিসিকে ফোন করি। তাদের সক্ষমতা জানতে চাই। সিডিসির কর্মকর্তারা আমাদের জানালেন, যাঁদের শরীরে ভাইরাসের লক্ষণ দেখা গেছে, শুধু তাঁদের জন্যই অ্যান্টিবডি টেস্ট আছে। কিন্তু যাঁদের লক্ষণ প্রকাশ পায়নি, তাঁদের পরীক্ষা করার মতো কোনো পিসিআর টেস্ট তাদের কাছে নেই। এই কথা শোনার পরই আমরা কাজ শুরু করে দিই।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান: সিডিসি যে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করছে, তার সঙ্গে আপনাদের পিসিআর পরীক্ষার পার্থক্য কী?

পিটার আইয়েন: অ্যান্টিবডি টেস্ট মূলত দেখে, শরীর ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করেছে কি না। লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার কয়েক দিন পর শরীরে এই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। এ জন্যই সিডিসি শুধু লক্ষণ থাকা ব্যক্তিদের রক্তের এই টেস্ট করছে।

অন্যদিকে, পিসিআর টেস্ট এমনভাবে নকশা করা, যা শরীরে ভাইরাসের পরিমাণ খুব কম থাকলেও তা ধরতে পারে। অর্থাৎ লক্ষণ প্রকাশের আগেই এটি ভাইরাস শনাক্ত করতে পারে। আমরা জানি, হান্টাভাইরাসের কিছু ধরনে লক্ষণ প্রকাশের আগেই রক্তে অল্প পরিমাণ ভাইরাস থাকে। তাই পিসিআর টেস্ট করে আমরা অনেক দ্রুত বলে দিতে পারি, ওই ব্যক্তির শরীরে ভাইরাস আছে।

আরও পড়ুন
অ্যান্টিবডি টেস্ট মূলত দেখে, শরীর ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করেছে কি না। লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার কয়েক দিন পর শরীরে এই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান: কোভিডের মতো এই পিসিআর টেস্টেও কি নাক থেকে নমুনা নেওয়া হয়?

এমিলি ম্যাককাচেন: না, এ ক্ষেত্রে রক্ত নেওয়া হয়। এরপর আমরা একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওই রক্তের নমুনা থেকে ভাইরাসের আরএনএ আলাদা করি। সেখানে যদি আন্দিজ হান্টাভাইরাসের আরএনএ থাকে, তবে আমরা সেটাকে পিসিআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বহুগুণ বাড়িয়ে নিই, যাতে সহজেই তা শনাক্ত করা যায়। মূল ধারণাটা কোভিডের মতোই, শুধু নমুনার উৎসটা আলাদা। কারণ এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের একটা ভাইরাস।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান: এই পিসিআর টেস্ট তৈরি করতে আপনাদের কত দিন সময় লেগেছে?

পিটার আইয়েন: কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। প্রয়োজনীয় রাসায়নিক জোগাড় করা এবং পরীক্ষার সঠিক নিয়মকানুন তৈরি করা—সব মিলিয়ে বেশ কঠিন কাজ। মে মাসের ৯ ও ১০ তারিখের সাপ্তাহিক ছুটিতে আমরা টানা কাজ করেছি। শনিবার সকাল পর্যন্ত আমাদের কাজ শুরু করার মতো রাসায়নিকও ছিল না।

আমাদের টেস্টটা ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা প্রমাণের জন্য আন্দিজ হান্টাভাইরাসের আরএনএ দরকার ছিল। পিসিআর টেস্ট তৈরির জন্য অন্যান্য রাসায়নিক দরকার ছিল। আরএনএ আলাদা করার জন্য কিট লাগত। একটি বৈধ টেস্ট তৈরির কাজ শুরু করার আগেই আমাদের এসব জোগাড় করতে হয়েছিল। শনিবার বিকেলের দিকে আমরা বুঝতে পারি, আমাদের কাছে কী কী আছে এবং আমরা কীভাবে এগোব।

এমিলি রোববার গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করেছে। আমি এই ল্যাবের সিএলআইএ ডিরেক্টর। টেস্টটি সব শর্ত পূরণ করছে কি না, তা যাচাই করে আমাকে চূড়ান্ত সই করতে হয়। রোববার রাত ৯টার দিকে আমি সই করি। আর সোমবার রাত আড়াইটার দিকে যাত্রীরা আমাদের ইউনিটে এসে পৌঁছান।

আরও পড়ুন
আমাদের টেস্টটা ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা প্রমাণের জন্য আন্দিজ হান্টাভাইরাসের আরএনএ দরকার ছিল। পিসিআর টেস্ট তৈরির জন্য অন্যান্য রাসায়নিক দরকার ছিল।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান: সিএলআইএ বৈধতা বলতে কী বোঝায়, একটু বুঝিয়ে বলবেন কি?

এমিলি ম্যাককাচেন: সিএলআইএ হলো কেন্দ্রীয় সরকারের একটি নিয়ম। ১৯৮৮ সালে এটি তৈরি হয়। এর কাজ হলো, নেব্রাস্কার কোনো ল্যাবে যে টেস্ট হচ্ছে, তার মান এবং ফলাফল যেন দেশের অন্য যেকোনো জায়গার টেস্টের মতোই নিখুঁত হয়, তা নিশ্চিত করা।

এই নিয়মের অধীনে নতুন কোনো টেস্ট বানাতে গেলে কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। যেমন, আপনাকে এর নির্ভুলতা, সংবেদনশীলতা এবং নিখুঁত হওয়ার হার পরীক্ষা করতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ম মানতে হলে খুব শক্তভাবে এই পরীক্ষাগুলো করতে হয়।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান: সিডিসি শুরুতে বলেছিল, একজন মার্কিন যাত্রীর পরীক্ষার ফল সামান্য পজিটিভ এসেছে, পরে অবশ্য তাঁর ফল নেগেটিভ আসে। এই প্রাথমিক টেস্টটা কি আপনারা করেছিলেন?

এমিলি ম্যাককাচেন: না। ওই যাত্রীরা নেব্রাস্কায় আসার আগেই নেদারল্যান্ডসে ওই টেস্ট করা হয়েছিল। আমরা ওই টেস্টের তথ্য এবং নমুনার উৎস জানার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু এখনো সফল হইনি।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান: নেব্রাস্কা ইউনিট বা দেশের অন্য জায়গায় যাঁরা কোয়ারেন্টিনে আছেন, আপনারা কি নিয়মিত তাঁদের সবার টেস্ট করছেন?

পিটার আইয়েন: সবার টেস্ট করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আমি শতভাগ নিশ্চিত নই। আমার ধারণা, রক্ত নেওয়ার জন্য এই মানুষদের সম্মতি লাগে। ল্যাব হিসেবে আমাদের হাতে যখন কোনো নমুনা আসে, আমরা টেস্ট করি। কেউ টেস্টের অনুরোধ করলেই আমরা প্রস্তুত। আমরা শুধু ওমাহার কোয়ারেন্টিন ইউনিট নয়, দেশের অন্য যেসব জায়গায় সম্ভাব্য আক্রান্তরা আছেন, তাদের জন্যও টেস্টের প্রস্তাব দিয়েছি এবং কিছু টেস্ট করেছিও।

আরও পড়ুন
আমার ধারণা, রক্ত নেওয়ার জন্য এই মানুষদের সম্মতি লাগে। ল্যাব হিসেবে আমাদের হাতে যখন কোনো নমুনা আসে, আমরা টেস্ট করি। কেউ টেস্টের অনুরোধ করলেই আমরা প্রস্তুত।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান: প্রয়োজন হলে আপনারা কি এই টেস্টের উৎপাদন আরও বাড়াতে পারবেন?

এমিলি ম্যাককাচেন: আমরা আশা করি এর উৎপাদন বাড়ানোর দরকার পড়বে না। তবে বৈধতা যাচাইয়ের সময়ই আমরা এমন সব যন্ত্রপাতি বেছে নিয়েছি, যাতে দরকার পড়লে উৎপাদন বাড়ানো যায়। হ্যাঁ, এটা করা সম্ভব।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান: সিডিসির সঙ্গে আপনাদের যোগাযোগ কেমন চলছে?

পিটার আইয়েন: আমি বলব সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। সিডিসিতে এখন অনেক ধরনের জটিলতা চলছে, তবে তারা আমাদের সঙ্গে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার চেষ্টা করছে। আমাদের মধ্যে যোগাযোগ আছে, কথা হচ্ছে। আমরা একে অপরকে সাধ্যমতো সাহায্য করার চেষ্টা করছি।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান: আপনারা কি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন?

এমিলি ম্যাককাচেন: ব্যক্তিগতভাবে আমি রাখছি না। তবে কয়েক দিন আগে নেব্রাস্কা মেডিকেল সেন্টারকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি কোলাবরেটিং সেন্টার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

পিটার আইয়েন: এটি একটি আন্তর্জাতিক ঘটনা। তাই আমাদের আলোচনার অংশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে রাখা খুব জরুরি মনে হয়।

অনুবাদ: শিউলী সুলতানা

আরও পড়ুন