যে প্রজাপতির আছে ২২৯ জোড়া ক্রোমোজোম

সিডার বন ও পাথুরে এলাকায় পলিওমেটাস আটলান্টিকার দেখা মেলেছবি: মুরাদ হারজাল্লাহ/আইন্যাচারালিস্ট

উত্তর আফ্রিকার পাহাড়ি বনভূমিতে উড়ে বেড়ানো ছোট্ট এক প্রজাপতি এখন বিজ্ঞানীদের বিস্ময়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বাহারি রং বা অদ্ভুত আচরণের জন্য নয়, বরং নিজের শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক অবিশ্বাস্য জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে আলোচনায় এসেছে এই প্রজাপতি। এর নাম অ্যাটলাস ব্লু।

সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, এই ক্ষুদ্র প্রজাপতির শরীরে ২২৯ জোড়া ক্রোমোজোম রয়েছে! এখন পর্যন্ত আর কোনো প্রাণীর মধ্যে এত বেশি ক্রোমোজোম পাওয়া যায়নি। মানুষের শরীরে যেখানে মাত্র ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম থাকে, সেখানে এত ছোট একটি প্রজাপতির শরীরে এত বিপুলসংখ্যক ক্রোমোজোমের উপস্থিতি গবেষকদেরও অবাক করেছে।

ক্রোমোজোম কী? সহজ কথায়, এটি জীবদেহের কোষে থাকা এমন এক বিশেষ গঠন, যা ডিএনএ বহন করে। জীবের শরীর তৈরি ও পরিচালনার প্রায় সব নির্দেশনাই থাকে এর ভেতরে। মানুষের চোখের রং, উচ্চতা কিংবা শরীরের নানা বৈশিষ্ট্য যেমন ডিএনএর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, তেমনি অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম কাজ করে।

সাধারণত প্রাণীদের ক্রোমোজোম সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। যেমন ফলের মাছির আছে মাত্র ৪ জোড়া, কুকুরের ৩৯ জোড়া। সেই তুলনায় অ্যাটলাস ব্লু প্রজাপতির ক্রোমোজোম সংখ্যা সত্যিই অবিশ্বাস্য।

আরও পড়ুন
সহজ কথায়, ক্রোমোজোম জীবদেহের কোষে থাকা এমন এক বিশেষ গঠন, যা ডিএনএ বহন করে। জীবের শরীর তৈরি ও পরিচালনার প্রায় সব নির্দেশনাই থাকে এর ভেতরে।

এই প্রজাপতির বৈজ্ঞানিক নাম পলিওমেটাস আটলান্টিকা (Polyommatus atlantica)। এরা মূলত মরক্কো ও উত্তর-পূর্ব আলজেরিয়ার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে বাস করে। সিডার বন ও পাথুরে এলাকায় এদের দেখা মেলে। মানুষের চোখে খুব একটা পড়ে না এই প্রজাতি। কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে এটি এখন এক রহস্যময় প্রাণী।

দীর্ঘদিন ধরেই গবেষকেরা বুঝতে পারছিলেন, এই প্রজাতির জিনগত গঠনে কিছু অস্বাভাবিকতা রয়েছে। তবে পুরো জিনোম বিশ্লেষণ করার আগে বিষয়টি পরিষ্কার ছিল না।

সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের পরই চমকে দেওয়ার মতো তথ্যটি সামনে আসে। গবেষকেরা দেখেন, প্রজাপতিটির ডিএনএ অনেক ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হয়ে আছে। অর্থাৎ মোট জিনগত তথ্য খুব বেশি না হলেও তা অসংখ্য ক্রোমোজোমে ছড়িয়ে গেছে।

বিষয়টি বোঝার জন্য একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ধরুন, একটি বড় বইকে কেউ ছিঁড়ে শত শত ছোট খাতায় ভাগ করে রাখল। তথ্য একই থাকছে, কিন্তু তা ছড়িয়ে যাচ্ছে অনেকগুলো অংশে। অ্যাটলাস ব্লু প্রজাপতির ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

আরও পড়ুন
গবেষকেরা দেখেন, প্রজাপতিটির ডিএনএ অনেক ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হয়ে আছে। অর্থাৎ মোট জিনগত তথ্য খুব বেশি না হলেও তা অসংখ্য ক্রোমোজোমে ছড়িয়ে গেছে।

গবেষকদের ধারণা, গত প্রায় ৩০ লাখ বছরের মধ্যে এই পরিবর্তন ঘটেছে। এই সময় খুব বেশি দীর্ঘ নয়। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ডিএনএর কিছু অংশ অপেক্ষাকৃত দুর্বল থাকায় সেগুলো বারবার ভেঙে নতুন ক্রোমোজোম তৈরি করেছে। ধীরে ধীরে এই ভাঙন ও পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া বহুবার ঘটতে ঘটতেই তৈরি হয়েছে এত বিপুলসংখ্যক ক্রোমোজোম।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রজাপতিটির যৌন ক্রোমোজোমগুলো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। অর্থাৎ পরিবর্তনগুলো এলোমেলোভাবে হয়নি। বরং নির্দিষ্ট কিছু জিনগত অঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে এই পুনর্গঠন ঘটেছে। বিজ্ঞানীরা এটিকে র‍্যাপিড জিনোম রিস্ট্রাকচারিং বা দ্রুত জিনগত পুনর্বিন্যাসের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

এখন বড় প্রশ্ন হলো, এত বেশি ক্রোমোজোম কি প্রজাপতিটির জন্য কোনো সুবিধা তৈরি করেছে?

বিজ্ঞানীরা এখনো এ বিষয়ে নিশ্চিত নন। তবে কিছু গবেষক মনে করেন, বেশিসংখ্যক ছোট ক্রোমোজোম থাকার ফলে জিনগত বৈচিত্র্য বাড়তে পারে। এতে পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও বাড়ে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন বা আবাসস্থলের সংকটের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এরা অন্য প্রজাতির তুলনায় কিছুটা বেশি অভিযোজনক্ষম হতে পারে।

আবার অন্য একদল বিজ্ঞানীর মতে, অতিরিক্ত জিনগত বিভাজন দীর্ঘ মেয়াদে অস্থিতিশীলতাও তৈরি করতে পারে। কারণ, যত বেশি অংশে তথ্য ছড়িয়ে থাকবে, সেগুলোর সমন্বয় করাও তত বেশি জটিল হবে। ফলে এটি সুবিধা নাকি অসুবিধা, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।

আরও পড়ুন
কিছু গবেষক মনে করেন, বেশিসংখ্যক ছোট ক্রোমোজোম থাকার ফলে জিনগত বৈচিত্র্য বাড়তে পারে। এতে পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও বাড়ে।

বর্তমানে এই প্রজাপতির আবাসস্থলও হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড় ও অতিরিক্ত পশুচারণের কারণে উত্তর আফ্রিকার সিডার বন ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে প্রজাতিটির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তবে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ এখানেই শেষ নয়। পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণীর মধ্যেও এমন অস্বাভাবিক ক্রোমোজোম বিন্যাস রয়েছে কি না, তাঁরা এখন তা খুঁজে দেখার চেষ্টা করছেন। হয়তো এখনো অনেক প্রজাতি বিজ্ঞানীদের অজানাই রয়ে গেছে।

অ্যাটলাস ব্লু প্রজাপতির এই আবিষ্কার আবারও মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সবচেয়ে বড় বিস্ময় অনেক সময় সবচেয়ে ছোট জীবের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। মানুষের চোখে তুচ্ছ মনে হওয়া একটি ক্ষুদ্র প্রজাপতিও বিজ্ঞানের বহু পুরোনো ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: লাইভ সায়েন্স ও নেচার ডটকম

আরও পড়ুন