পান্ডা মাংস না খেয়ে বাঁশ খায় কেন

পান্ডা মাংসাশী প্রাণী হয়েও মাংস না খেয়ে বাঁশ খায় কেন?ছবি: এরিক কিলবি/ফ্লিকার/ক্রিয়েটিভ কমন্স

মোটাসোটা, অলস এবং বাঁশের ডাল চিবোতে চিবোতে দিন কাটিয়ে দেওয়া পান্ডা শ্রেণিবিন্যাসের দিক থেকে একেবারে খাঁটি একটি মাংসাশী প্রাণী। বাঘ, ভালুক ও সিংহ যে কার্নিভোরা বর্গের অন্তর্ভুক্ত, পান্ডাও ঠিক একই বর্গের। এর দাঁতের সারি মাংস কামড়ানোর উপযোগী, পাকস্থলী মাংস হজমের মতো এবং অন্ত্রের গঠনও সেই একই ছকে বাঁধা। অথচ সে এই শরীর নিয়েই বছরের পর বছর শুধু বাঁশ খেয়ে কাটিয়ে দেয়! বিজ্ঞানীদের কাছে এই বৈপরীত্য নতুন কোনো প্রশ্ন নয়; বরং দশকের পর দশক ধরে এটি একটি উন্মুক্ত ধাঁধা হয়ে আছে।

তৃণভোজীর শরীরে যেসব ফাইবার ব্যাকটেরিয়া গিজগিজ করে, পান্ডার শরীরে তাদের দেখা প্রায় মেলেই না
ছবি: গেটি ইমেজ

গরু বা ভেড়ার পেট খুলে দেখলে পাওয়া যাবে বহু প্রকোষ্ঠের এক জটিল কারখানা। এদের অন্ত্র দীর্ঘ। কিন্তু পান্ডার পেট খুললে এসবের কিছুই পাওয়া যাবে না। এর পাকস্থলী ছোট ও সরল এবং খাবার দ্রুত পার করিয়ে দেওয়ার উপযোগী, যা মূলত মাংসাশী প্রাণীরই গঠন। পান্ডার অন্ত্রের ভেতরের জীবজগৎও একই কথা বলে। সেখানে প্রাধান্য পায় ই-কোলাই ও স্ট্রেপ্টোকক্কাসের মতো ব্যাকটেরিয়া, যেগুলো মাংসাশী প্রাণীদের অন্ত্রেরই চেনা মুখ। অন্যান্য তৃণভোজীর শরীরে যেসব ফাইবার ব্যাকটেরিয়া গিজগিজ করে, পান্ডার শরীরে তাদের দেখা প্রায় মেলেই না।

আরও পড়ুন
গরু বা ভেড়ার পেট খুলে দেখলে পাওয়া যাবে বহু প্রকোষ্ঠের এক জটিল কারখানা। এদের অন্ত্র দীর্ঘ। কিন্তু পান্ডার পেট খুললে এসবের কিছুই পাওয়া যাবে না। এর পাকস্থলী ছোট ও সরল।

পান্ডা প্রতিদিন যতটা বাঁশ খায়, তার সিকি ভাগও সে আসলে হজম করতে পারে না। দিনে ১০ থেকে ২০ কিলোগ্রাম বাঁশ গলার নিচে চালান করার পরও এর বেশির ভাগ পুষ্টিগুণ শরীরে শোষিত না হয়ে সরাসরি মল হিসেবে বেরিয়ে যায়। হজমপ্রক্রিয়ার এই অদক্ষতা পান্ডা মোকাবিলা করে সহজ একটি পথে—শোষণ কম হলে বেশি খেয়ে তা পুষিয়ে নেওয়া! তাই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার দিনের বেশির ভাগ সময়টাই কাটে খাওয়ার পেছনে।

কিন্তু পান্ডা কেন এমন হলো? পান্ডার পরিপাকতন্ত্র এক গল্প বলে, ডিএনএ বলে আরেক গল্প। যদিও দুটি গল্পের সুর একই। পান্ডার জিনোমে গাছ হজমকারী এনজাইম তৈরির কোনো জিন কোনো দিনই ছিল না। অন্ত্রের নকশা তো বটেই, কোষীয় পর্যায়েও এই প্রাণী বাঁশ খাওয়ার জন্য তৈরি হয়নি। সে যা-ই করছে, প্রতিদিন শরীরের প্রতিটি টিস্যুর বিরুদ্ধে গিয়েই করছে।

পান্ডার জিনোমে গাছ হজমকারী এনজাইম তৈরির কোনো জিন কোনো দিনই ছিল না
ছবি: গেটি ইমেজ

আরও অদ্ভুত একটি জিনগত ঘটনা ঘটেছে এর স্বাদকোরকে। মাংসের স্বাদ চেনার কাজটি করে উমামি রিসেপ্টর। এটি Tas1r1 নামে একটি জিন, যা গ্লুটামিক অ্যাসিড ও অ্যামিনো অ্যাসিডের স্বাদ ধরতে পারে। কিন্তু দুটি জায়গায় মিউটেশন ঘটে জিনটি পান্ডার শরীরে এখন অকার্যকর; এটি পরিণত হয়েছে একটি ছদ্ম জিনে। গবেষণা বলছে, এই নিষ্ক্রিয়তা ঘটেছিল আনুমানিক ৪২ লাখ বছর আগে, যা ফসিল রেকর্ড থেকে পাওয়া পান্ডার খাদ্যাভ্যাস বদলের সময়ের কাছাকাছি। অর্থাৎ বাঁশ খাওয়া শুরু হয়েছে আগে, এবং স্বাদ হারানোর ঘটনা ঘটেছে পরে।

আরও পড়ুন
পান্ডার জিনোমে গাছ হজমকারী এনজাইম তৈরির কোনো জিন কোনো দিনই ছিল না। অন্ত্রের নকশা তো বটেই, কোষীয় পর্যায়েও এই প্রাণী বাঁশ খাওয়ার জন্য তৈরি হয়নি।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, বাঁশে অ্যামিনো অ্যাসিড এতই কম থাকে যে এই রিসেপ্টরটির আর কোনো কাজই ছিল না। তাই এটি ধরে রাখার জন্য ছিল না তেমন কোনো চাপ। জিন হারানোর পর মাংসের প্রতি পান্ডার আকর্ষণও কমে যায়, আর এভাবেই তাদের নিরামিষাশী জীবনযাপন আরও পাকাপোক্ত হয়ে বসে। স্বাদ অনুভব না করলে স্বভাবতই মাংসের দিকে ফেরার তাড়না খুব কমই থাকে।

পান্ডার থাবা দেখলে প্রথমে আলাদা কিছু মনে হবে না; এটি অন্য যেকোনো ভালুকের থাবার মতোই দেখতে। তবে এর কবজির কাছে একটি ছোট হাড় আছে, যার নাম রেডিয়াল সিসাময়েড। এটি সময়ের সঙ্গে লম্বা হয়ে একটি বাড়তি আঙুলের কাজ করে। মানুষের মতো বিপরীতমুখী বুড়ো আঙুল পান্ডার নেই, সেই জায়গাটাই পূরণ করে এই হাড়টি। এটি একটি ছদ্ম-বুড়ো আঙুল হিসেবে কাজ করে, যার সাহায্যে পান্ডা বাঁশের ডাল বেশ দক্ষতার সঙ্গে ধরে রাখতে এবং চেপে ভাঙতে পারে।

পান্ডার থাবা দেখলে প্রথমে আলাদা কিছু মনে হবে না; এটি অন্য যেকোনো ভালুকের থাবার মতোই দেখতে
ছবি: আইস্টক

এই হাড় আসলে কোনো নতুন আঙুল নয়, এটি একটি পুরোনো কবজির হাড়; যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লম্বা হয়েছে। এটি দিয়ে পান্ডা বাঁশের ডাল হাতের তালু ও এই হাড়ের মাঝে ভুট্টার মতো ধরে রেখে চিবোতে পারে। কিন্তু এই অভিযোজনের শুরুটা বাঁশ খাওয়ার জন্যই হয়েছিল কি না, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে এখনো মতভেদ আছে। পান্ডার এক বিলুপ্ত আত্মীয় সিমোসিয়নের ফসিলেও একই রকম বাড়তি আঙুল পাওয়া গেছে। অথচ সেই প্রাণীটি বাঁশ খেত না, গাছে চড়ে শিকার ধরত। তার থাবায় এই হাড়টি সম্ভবত গাছের ডাল চেপে ধরার কাজেই লেগেছিল, খাবারের জন্য নয়। পান্ডা পরে এই একই হাতিয়ারকে নিজের বাঁশ খাওয়ার কাজে লাগিয়েছে!

আরও পড়ুন
পান্ডার থাবা দেখলে প্রথমে আলাদা কিছু মনে হবে না; এটি অন্য যেকোনো ভালুকের থাবার মতোই দেখতে। তবে এর কবজির কাছে একটি ছোট হাড় আছে, যার নাম রেডিয়াল সিসাময়েড।

এই হাড়টির ইতিহাস আসলে পান্ডার বাঁশ-নির্ভরতার চেয়েও পুরোনো। প্রায় ৬০ লাখ বছর আগের প্রাচীন পান্ডা আইলুরার্কটোসের ফসিলেও এই বাড়তি আঙুল পাওয়া গেছ। সেটি আকারে আধুনিক পান্ডার চেয়েও বড় ছিল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, লাখ লাখ বছর পেরিয়ে গেলেও হাড়টি আর লম্বা হয়নি; বরং সামান্য ছোট হয়ে এসেছে। কারণটা খুবই সহজ, এই হাড়কে শুধু বাঁশ ধরার কাজই করতে হয় না, হাঁটার সময় শরীরের ভারও বহন করতে হয়। ফলে এই দুই কাজের মাঝে শরীরে একটি চমৎকার আপস তৈরি হয়ে গেছে। গবেষকেরা এটিকে চলাফেরা ও খাওয়ার চাহিদার মধ্যে তৈরি হওয়া এক টানাপোড়েনের ফল হিসেবেই দেখছেন।

লাখ লাখ বছর পেরিয়ে গেলেও রেডিয়াল সিসাময়েড হাড়টি আর লম্বা হয়নি; বরং সামান্য ছোট হয়ে এসেছে
ছবি: রেডিট

এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে রাখলে কোনো পরিচ্ছন্ন সমাধান চোখে পড়ে না, মেলে শুধু কয়েকটি টুকরো সমঝোতা। অন্ত্র মাংসাশীর, জিনোমে বাঁশ হজমের ক্ষমতা নেই, স্বাদকোরক মাংসের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছে—এর মধ্যেই পান্ডা বেঁচে আছে, স্রেফ খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে নিজের শরীরের সীমাবদ্ধতা ঢেকে রেখে। প্রায় ২০ লাখ বছর, কিংবা কিছু গবেষণা অনুযায়ী তার চেয়েও কম সময় ধরে এই ব্যবস্থা চলছে। কারণ, চীনের পাহাড়ি বনে বাঁশের কোনো অভাব নেই। খাবারের এই প্রাচুর্যই পান্ডার হজমপ্রক্রিয়ার অদক্ষতাটুকু সযত্নে ঢেকে দিয়েছে।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সায়েন্স ডেইলি ও ইউরেক্যালার্ট

আরও পড়ুন