পাঠ্যবইয়ের পুরোনো নিয়মকে বুড়ো আঙুল, আবিষ্কৃত হলো কোষ বিভাজনের নতুন কৌশল

জীবনের বিকাশের সবচেয়ে আদিম এবং সাধারণ নিয়ম হচ্ছে কোষ বিভাজনছবি: শাটারস্টোক

স্কুলের বিজ্ঞানের বইয়ে আমরা সবাই কোষ বিভাজনের কথা পড়েছি। একটি কোষ মাঝখান থেকে ভাগ হয়ে দুটি কোষে পরিণত হয়। এটাই জীবনের বিকাশের সবচেয়ে আদিম এবং সাধারণ নিয়ম। কিন্তু জার্মানির ড্রেসডেন ইউনিভার্সিটির ফিজিকস অব লাইফ ক্লাস্টারের একদল বিজ্ঞানী সম্প্রতি এমন এক আবিষ্কার করেছেন, যা জীববিজ্ঞান বইয়ের এত দিনের চেনা হিসাবনিকাশ একেবারে উল্টে দিয়েছে!

বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, ডিম পাড়া প্রাণীদের বড় ভ্রূণকোষগুলো আসলে পাঠ্যবইয়ে লেখা সাধারণ নিয়মে বিভাজিত হয় না; বরং তারা সম্পূর্ণ অজানা ও বিস্ময়কর এক কৌশল ব্যবহার করে।

বইয়ের নিয়মে গলদ কোথায়

সাধারণ কোষগুলো বিভাজিত হওয়ার সময় তাদের ঠিক মাঝখানে অ্যাকটিন নামে প্রোটিন দিয়ে তৈরি একটি আংটি বা রিং তৈরি হয়। এটি অনেকটা প্যান্টের ফিতার মতো কাজ করে। চারপাশ থেকে টান দিয়ে কোষটিকে মাঝখান থেকে চেপে দুভাগ করে ফেলে। একে বলা হয় পার্স স্ট্রিং মডেল।

কিন্তু হাঙর, প্লাটিপাস, পাখি বা সরীসৃপদের ডিমের ভ্রূণের কোষগুলো হয় অনেক বড়। এর ভেতর থাকে বিশাল আকৃতির কুসুম। কোষ এত বড় হওয়ার কারণে সেই অ্যাকটিন প্রোটিনের রিংটি পুরোপুরি বন্ধ হতে পারে না। তাহলে এই বিশাল কোষগুলো কীভাবে ভাগ হয়? বছরের পর বছর ধরে বিজ্ঞানীরা এই প্রশ্নের উত্তর হাতড়ে বেড়িয়েছেন।

আরও পড়ুন
সাধারণ কোষগুলো বিভাজিত হওয়ার সময় তাদের ঠিক মাঝখানে অ্যাকটিন নামে প্রোটিন দিয়ে তৈরি একটি আংটি বা রিং তৈরি হয়। এটি অনেকটা প্যান্টের ফিতার মতো কাজ করে।

এই রহস্য সমাধানে গবেষক দলের প্রধান অ্যালিসন কিকুথ বেছে নিলেন জেব্রাফিশের ভ্রূণ। কারণ এদের ভ্রূণ খুব দ্রুত বড় হয় এবং কোষের ভেতর প্রচুর কুসুম থাকে। অ্যালিসন লেজার রশ্মি ব্যবহার করে কোষের সেই অ্যাকটিনের ফিতাটি মাঝখান থেকে কেটে দিলেন।

অবাক করা ব্যাপার হলো, ফিতাটি কেটে যাওয়ার পরও সেটি সংকুচিত হয়ে ভেতরের দিকে এগোতে থাকে! মানে ফিতাটি শুধু দুই প্রান্তে আটকে থাকে না, বরং পুরো পথজুড়েই সে কোনো না কোনো সমর্থন পায়।

গবেষকেরা দেখলেন, কোষের কঙ্কাল বা সাইটোস্কেলিটনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাইক্রোটিবিউল এই ফিতাকে চারপাশ থেকে ধরে রাখে। এটি প্রমাণ করার জন্য তাঁরা রাসায়নিক পদার্থ এবং ছোট্ট তেলের বিন্দু ব্যবহার করে মাইক্রোটিবিউলগুলোর কাজে বাধা দেন। দেখা গেল, মাইক্রোটিবিউলের সাহায্য ছাড়া অ্যাকটিনের ফিতাটি মুহূর্তেই ভেঙে পড়ছে! অর্থাৎ, কোষ বিভাজনের সময় এই মাইক্রোটিবিউলগুলোই মেকানিক্যাল সাপোর্ট বা যান্ত্রিক খুঁটি হিসেবে কাজ করে।

কোষ বিভাজনের চক্রটি মূলত দুটি ধাপে ঘটে—এম-ফেজ এবং ইন্টারফেজ। যখন ডিএনএ আলাদা হয় তখন এম-ফেজ। আর যখন কোষটি বড় হয় এবং ডিএনএর অনুলিপি তৈরি করে তখন ইন্টারফেজ। বিজ্ঞানীরা কোষের ভেতর চৌম্বকীয় পুঁতি ঢুকিয়ে একটি দারুণ বিষয় আবিষ্কার করেন।

আরও পড়ুন
মাইক্রোটিবিউলের সাহায্য ছাড়া অ্যাকটিনের ফিতাটি মুহূর্তেই ভেঙে পড়ছে! অর্থাৎ, কোষ বিভাজনের সময় এই মাইক্রোটিবিউলগুলোই মেকানিক্যাল সাপোর্ট বা যান্ত্রিক খুঁটি হিসেবে কাজ করে।

তাঁরা দেখলেন, ইন্টারফেজ দশায় কোষের ভেতরের জেলি বা সাইটোপ্লাজম বেশ শক্ত হয়ে যায়, যা অ্যাকটিনের ফিতাকে শক্তভাবে ধরে রাখে। কিন্তু এম-ফেজ দশায় সাইটোপ্লাজম একেবারে তরল হয়ে যায়, যাতে ফিতাটি সহজেই ভেতরের দিকে ঢুকতে পারে

কিন্তু সাইটোপ্লাজম তরল হয়ে গেলে তো ফিতাটির ধসে পড়ার কথা। বিজ্ঞানীরা দেখলেন, এম-ফেজ দশায় ফিতাটি আসলেই একটু অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং কিছুটা পিছিয়ে আসে। কিন্তু ভ্রূণকোষের বিভাজন এত দ্রুত ঘটে যে, ফিতাটি পুরোপুরি ধসে পড়ার আগেই কোষটি আবার ইন্টারফেজ দশায় চলে যায় এবং সাইটোপ্লাজম শক্ত হয়ে ফিতাটিকে আটকে ফেলে!

এই পুরো প্রক্রিয়াটি মেকানিকদের ব্যবহৃত র‍্যাচেট টুলের মতো কাজ করে। র‍্যাচেট দিয়ে নাট খোলার সময় যেমন একটু ঘুরিয়ে আবার আটকে রাখা যায়, কোষটিও ঠিক সেভাবেই কাজ করে। এক টানে বা এক চক্রে বিভাজিত না হয়ে, কোষটি সাইটোপ্লাজমের কখনো শক্ত, কখনো নরম হওয়ার এই অদ্ভুত চক্র ব্যবহার করে ধাপে ধাপে বিভাজনের কাজ শেষ করে।

আরও পড়ুন
ভ্রূণকোষের বিভাজন এত দ্রুত ঘটে যে, অ্যাকটিনের ফিতাটি পুরোপুরি ধসে পড়ার আগেই কোষটি আবার ইন্টারফেজ দশায় চলে যায় এবং সাইটোপ্লাজম শক্ত হয়ে ফিতাটিকে আটকে ফেলে!

নতুন পথের দিশা

এই গবেষণার অন্যতম লেখক জ্যান ব্রুগেস বলেন, ‘এই র‍্যাচেট কৌশলটি কোষ বিভাজন নিয়ে আমাদের এত দিনের ধ্যানধারণা একেবারেই পাল্টে দিয়েছে।’

এই আবিষ্কার শুধু জেব্রাফিশ নয়, বরং ডিম পাড়া সব বিশাল প্রাণীর ভ্রূণকোষ কীভাবে কাজ করে, তার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রকৃতি যে কত নিখুঁতভাবে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোষের ভেতরের অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে, এটি তারই এক দুর্দান্ত প্রমাণ! কে জানে, এই গবেষণার সূত্র ধরে হয়তো ভবিষ্যতে আমাদের জীববিজ্ঞান বইয়ের পাতাগুলো নতুন করে লিখতে হবে।

লেখক: ফ্রন্টেন্ড ডেভলপার, সফটভেঞ্চ

সূত্র: সায়েন্স ডেইলি

আরও পড়ুন