প্রাণীদের চোখে অদ্ভুত অপটিক্যাল ইলিউশন

প্রাণীরাও মানুষের মতো ধোঁকা খায়ছবি: ডিজাইন পিক্স এডিটোরিয়াল / গেটি ইমেজ

আমরা অনেকেই অপটিক্যাল ইলিউশন দেখতে খুব পছন্দ করি। চোখের সামনে যা দেখি, আসলে তা ঘটে না। এটাই বেশি মজা লাগে। তবে এই ইলিউশন শুধু মানুষের হয় না, বনের পশুপাখিদেরও হয়। ওরাও ধোঁকা খায় আমাদের মতোই। 

গবেষকেরা বলছেন, প্রাণীরা শুধু ধোঁকাই খায় না, কেউ কেউ তো রীতিমতো জাদুকর! বেঁচে থাকার লড়াইয়ে বা সঙ্গীকে পটানোর জন্য তারা এমন সব ইলিউশন বা ভ্রম তৈরি করে, যা দেখলে মানুষের চোখও কপালে উঠবে।

অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট বাওয়ারবার্ড পাখির কথাই ধরুন। পুরুষ পাখিটি তার সঙ্গীকে মুগ্ধ করার জন্য রীতিমতো আর্কিটেক্ট বনে যায়। সে পাথর বা শামুক দিয়ে একটা সুন্দর উঠোন সাজায়। মজার ব্যাপার হলো, সে ছোট পাথরগুলো সামনে রাখে এবং বড় পাথরগুলো রাখে পেছনের দিকে। একে বলে ফোর্সড পারসপেক্টিভ। এতে কোনো মেয়ে পাখি যখন সামনে থেকে তাকায়, তখন মনে হয় পুরো উঠোনটা সমান এবং পুরুষ পাখিটাকে তার আসল আকারের চেয়ে অনেক বড় ও শক্তিশালী দেখায়। সোজা কথায়, প্রেমিকার চোখে হিরো সাজার জন্য সে দৃষ্টিভ্রমের আশ্রয় নেয়!

অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট বাওয়ারবার্ড পাখি
ছবি: ইয়ান ডেভিস / ই-বার্ড

বিজ্ঞানের ভাষায় একটা বিখ্যাত ধোঁকা হলো এবিংহাউস ইলিউশন। একটা মাঝারি বৃত্তকে যদি ছোট ছোট বৃত্ত দিয়ে ঘিরে রাখা হয়, তবে মাঝখানের বৃত্তটাকে বিশাল মনে হয়। আবার ওই একই বৃত্তকে যদি বড় বড় বৃত্ত দিয়ে ঘেরা হয়, তবে তাকে পুঁচকে দেখায়।

আরও পড়ুন
অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট বাওয়ারবার্ড

গবেষকেরা দেখেছেন, গাপ্পি মাছ এই ধোঁকায় বোকা বনে যায়। খাবারের ছোট টুকরোর পাশে আরও ছোট টুকরো থাকলে সে ওটাকেই বড় খাবার ভেবে বেছে নেয়। কারণ পানির নিচে আলো আঁধারিতে তাদের পুরো দৃশ্যপট একসঙ্গে বুঝতে হয়।

অন্যদিকে ঘুঘু পাখিরা কিন্তু বেশ সেয়ানা। তাদের এই ইলিউশন দিয়ে ঠকানো যায় না। কারণ তারা খুঁটে খুঁটে ছোট দানা খায়, তাই তাদের চোখ খুঁটিনাটি ধরতে ওস্তাদ। ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মারিয়া সান্তাকা বলছেন, ‘কে ধোঁকা খাবে আর কে খাবে না, তা নির্ভর করে সে কোন পরিবেশে বড় হয়েছে তার ওপর।’

শুধু মানুষেরাই যে প্রোফাইল পিকচার সুন্দর করার চেষ্টা করে, তা নয়। ফিডলার কাঁকড়ারাও একই কাজ করে। মেয়ে কাঁকড়ারা বড় চিমটিওয়ালা পুরুষদের পছন্দ করে। তাই চালাক পুরুষ কাঁকড়াটা করে কী, তার চেয়ে ছোট চিমটিওয়ালা এক প্রতিবেশীর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

ফিডলার কাঁকড়া
ছবি: ভাল্টার জ্যাসিন্টো / গেটি ইমেজ

বড় জিনিসের পাশে দাঁড়ালে যেমন নিজেকে ছোট লাগে, তেমনি ছোট জিনিসের পাশে দাঁড়ালে নিজেকে বিশাল মনে হয়। কাঁকড়াটি এই সাইকোলজি ব্যবহার করে নিজেকে সঙ্গীর কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে!

মানুষের ওপর একটা পরীক্ষা আছে, রাবার হ্যান্ড ইলিউশন। চোখের সামনে একটা নকল রাবারের হাত রেখে যদি সুড়সুড়ি দেওয়া হয়, মস্তিষ্ক ভাবে ওটা বুঝি নিজেরই হাত। অবাক করা বিষয় হলো, অক্টোপাসও এই ধোঁকায় পা দেয়!

আরও পড়ুন
ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মারিয়া সান্তাকা বলছেন, ‘কে ধোঁকা খাবে আর কে খাবে না, তা নির্ভর করে সে কোন পরিবেশে বড় হয়েছে তার ওপর।’

পরীক্ষায় দেখা গেছে, অক্টোপাসের চোখের সামনে একটা নকল হাত রেখে সেটাতে চিমটি দিলে সে এমনভাবে রিয়েক্ট করে বা রং বদলায়, যেন তার নিজের হাতেই চিমটি লেগেছে। মানুষ আর অক্টোপাসের পরিবর্তন সম্পূর্ণ আলাদা হলেও মস্তিষ্কের এই ধোঁকা খাওয়ার পদ্ধতিটা কেমন যেন মিলে যায়।

প্রকৃতির সবচেয়ে বড় ইলিউশন হলো ক্যামোফ্লেজ বা ছদ্মবেশ। মাছ, সরীসৃপ বা অনেক প্রাণীর পেটের দিকটা হালকা রঙের আর পিঠের দিকটা গাঢ় রঙের হয়। সূর্যের আলো ওপর থেকে পড়ে বলে পিঠ উজ্জ্বল দেখায় আর পেট ছায়ায় থাকে। কিন্তু গায়ের রং উল্টো হওয়ায় আলো-ছায়া তারা প্রকৃতির সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে শিকারি প্রাণীরা বুঝতেই পারে না ওখানে কেউ আছে।

সরীসৃপের পেটের দিকটা হালকা রঙের আর পিঠের দিকটা গাঢ় রঙের হয়
ছবি: জেলি বিন ফর্টি-নাইন / গেটি ইমেজ

ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার জীববিজ্ঞানী জেনিফার কেলি বলেন, ‘মস্তিষ্ক সব সময় শর্টকাট খোঁজে। প্রতিটি তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা অনেক শক্তির কাজ। তাই মস্তিষ্ক চটজলদি একটা ধারণা করে নেয়।’

বনের পশুপাখিরা এই শর্টকাটকে কাজে লাগিয়েই কখনো শিকারি তাড়ায়, কখনো শিকার ধরে, আবার কখনো দিব্যি সংসার পাতে। প্রকৃতিতে সত্য দেখাটা জরুরি নয়, জরুরি হলো বেঁচে থাকা। আর টিকে থাকার এই লড়াইয়ে একটু-আধটু জাদুকরি তো জানতেই হয়!

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ 

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন