কিছু প্রাণী কেন নিজের সন্তানকেই খেয়ে ফেলে
প্রকৃতিতে মা-বাবার ভালোবাসার নানা নিদর্শন রয়েছে। সন্তানকে বাঁচাতে জীবন দিয়ে দেওয়ার গল্পও আমরা প্রায়শই শুনি। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটা দেখেছেন কি? যে মা-বাবা সন্তানকে পরম স্নেহে বড় করছে, সেই আবার খিদে পেলে সন্তানকেই গপাগপ খেয়ে ফেলছে!
শুনতে গা শিউরে উঠলেও জীবজগতে এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। সুইডেনের ইউনিভার্সিটি অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেসের বিহেভিওরাল ইকোলজিস্ট আনিস বোস বলছেন, ‘স্বজাতি বা নিজের সন্তানকে খেয়ে ফেলার এই স্বভাব প্রাণিজগতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। প্রায় ১ হাজার ৫০০ প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে এই আচরণের দেখা মেলে। বালুচড়া গবি মাছ থেকে শুরু করে স্ট্যাগ বিটল, এমনকি আমাদের খুব পরিচিত পোষা প্রাণীদের মধ্যেও দেখা যায় এই আচরণ।’
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সন্তানের বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করাটাই তো প্রকৃতির নিয়ম। তাহলে কেন প্রাণীরা উল্টো নিজের বংশধরকেই ধ্বংস করে দেয়? এর পেছনে আছে প্রকৃতির এক নির্মম কিন্তু টিকে থাকার কৌশল।
সব প্রাণী কিন্তু এই কাজ করে না। হাতি বা তিমির মতো যেসব প্রাণী দীর্ঘ সময়ে মাত্র একটি বাচ্চার দেখভাল করে, তারা সাধারণত সন্তান খায় না। এই প্রবণতা বেশি দেখা যায় যাদের প্রজনন চক্র খুব দ্রুত এবং যারা একসঙ্গে অনেক বাচ্চার জন্ম দেয়।
সুইডেনের ইউনিভার্সিটি অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেসের বিহেভিওরাল ইকোলজিস্ট আনিস বোস বলছেন, ‘স্বজাতি বা নিজের সন্তানকে খেয়ে ফেলার এই স্বভাব প্রাণিজগতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে।'
বেশির ভাগ সময় মাছ, পোকা বা মাকড়সারা তাদের শত শত বাচ্চার মধ্য থেকে কয়েকটাকে খেয়ে ফেলে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ আছে।
খাবারের অভাব: খাবার কমে গেলে বাবা-মা কিছু সন্তানকে খেয়ে ফেলে, যাতে বাকিরা পর্যাপ্ত খাবার পায় এবং বেঁচে থাকতে পারে।
শক্তির অপচয় রোধ: কুকুর বা বিড়ালের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীরা অনেক সময় মৃত বা অসুস্থ বাচ্চা খেয়ে ফেলে। সন্তান জন্ম দেওয়াটা মায়েদের জন্য খুব ধকলের কাজ। মৃত বা দুর্বল বাচ্চাকে খেয়ে তারা সেই হারানো শক্তি কিছুটা পুনরুদ্ধার করে।
বাবার সন্দেহ: কিছু মাছের ক্ষেত্রে (ব্লুগিল সানফিশ) বাবা যদি গন্ধ শুঁকে বুঝতে পারে যে ডিম বা বাচ্চাগুলো তার নিজের নয়, তবে সে ওগুলো খেয়ে ফেলে! মজার ব্যাপার হলো, মায়েরা এটা হতে দিতে চায় না। তাই অনেক সময় মা মাছ ডিম পাহারা দেয়, যাতে বাবা মাছ সেগুলোকে খেয়ে ফেলতে না পারে।
সন্তান জন্ম দেওয়াটা কুকুর বা বিড়ালের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীর মায়েদের জন্য খুব ধকলের কাজ। মৃত বা দুর্বল বাচ্চাকে খেয়ে তারা সেই হারানো শক্তি কিছুটা পুনরুদ্ধার করে।
মাঝেমধ্যে প্রাণীরা পুরো এক ব্যাচ বাচ্চাকেই খেয়ে ফেলে। আনিস বোসের মতে, এটা অনেকটা গেমের রিস্টার্ট বাটনের মতো। ইঁদুর বা খরগোশের মতো ছোট স্তন্যপায়ীদের মধ্যে এটা দেখা যায়। মা যদি দেখে বাচ্চার সংখ্যা খুব কম, অথবা পরিবেশ খুব বিপজ্জনক, তখন সে সব বাচ্চা খেয়ে ফেলে। ওরা চায় এখনকার দুর্বল প্রচেষ্টাকে বাতিল করে শক্তি সঞ্চয় করতে, যাতে পরে পরিবেশ ভালো হলে নতুন করে এবং ভালোভাবে বেশি বাচ্চার জন্ম দিতে পারে।
আমাদের চোখে এটা চরম নিষ্ঠুরতা মনে হতে পারে। কিন্তু বন্য পরিবেশে টিকে থাকার জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর কৌশল। বিজ্ঞানীরা এখনো মাছ ও ইঁদুরের মতো প্রাণীদের ওপর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এসব গবেষণা থেকে প্রতিনিয়ত বেরিয়ে আসছে এমন সব অবাক করা কারণ।