পৃথিবীতে কত প্রজাতির পোকামাকড় আছে
আপনি হয়তো মনে মনে বিশ্বাস করেন, এই বিশাল পৃথিবীটা কেবল মানুষের দখলে। কিন্তু শুধু সংখ্যার নিরিখে হিসাব কষলে আপনাকে বেশ বিনয়ের সঙ্গেই মেনে নিতে হবে, আমাদের এই নীল গ্রহটা আসলে পোকামাকড়ের একচেটিয়া সাম্রাজ্য!
একটু চারপাশের পরিবেশটার দিকে খেয়াল করলেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে। এই মুহূর্তে পৃথিবীর বুকে হাজার হাজার কোটি পিঁপড়া গিজগিজ করছে। রাতে আলো জ্বেলে ঘুরে বেড়ানো মায়াবী জোনাকিরই রয়েছে অন্তত ২ হাজার ৪০০টি আলাদা প্রজাতি! সংখ্যাগুলো শুনে আপনার চোখ কপালে উঠতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে এগুলো একেবারেই সাধারণ হিসাব। গত ৪০ বছর ধরে বিজ্ঞান জগতে একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা ছিল, পৃথিবীতে পোকামাকড়ের প্রজাতির সংখ্যা হয়তো বড়জোর ৬০ লাখের কাছাকাছি। কিন্তু বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি গবেষণা পুরো হিসাবটাই উল্টে দিয়েছে। নতুন এই গবেষণা বলছে, পৃথিবীতে ৬০ লাখ নয়, বরং ১ কোটি ৪০ লাখ থেকে শুরু করে ২ কোটি প্রজাতির পোকামাকড় বসবাস করছে! সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এর মধ্যে মাত্র সামান্য কিছু প্রজাতির সঙ্গেই মানুষের পরিচয় ঘটেছে।
এই মুহূর্তে পৃথিবীর বুকে হাজার হাজার কোটি পিঁপড়া গিজগিজ করছে। রাতে আলো জ্বেলে ঘুরে বেড়ানো মায়াবী জোনাকিরই রয়েছে অন্তত ২ হাজার ৪০০টি আলাদা প্রজাতি!
পোকামাকড়ের এই বিপুল বৈচিত্র্যের পেছনের রহস্যটা বেশ চমকপ্রদ। এর অন্যতম বড় কারণ হলো এদের রূপান্তর প্রক্রিয়া। জীবনের একেকটি ধাপে এরা একেক রকম পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। যেমন ধরুন, কোনো একটি পতঙ্গ জীবনের শুরুতে শুঁয়োপোকা হিসেবে গাছের পাতা সাবাড় করছে, আবার কিছুদিন পরই খোলস পাল্টে সুন্দর প্রজাপতি বা মথ হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে এবং ফুলের মধু পান করছে। একই জীবনে দুটি ভিন্ন বাসস্থান ও খাদ্যাভ্যাস! পাশাপাশি, পোকামাকড় আকারে এতটাই ছোট হয় যে, তারা খুব সহজেই লোকচক্ষুর অন্তরালে নিজেদের বিশাল বিশাল কলোনি গড়ে তুলতে পারে, যেখানে পৌঁছানো বিজ্ঞানীদের জন্যও বেশ কঠিন।
টানা চার দশক ধরে বিজ্ঞানীরা ওই ৬০ লাখ প্রজাতির হিসাবটিকেই ধ্রুব সত্য বলে মেনে আসছিলেন। কারণ, লুকিয়ে থাকা এই খুদে প্রাণীগুলোর নিখুঁত পরিসংখ্যান বের করা রীতিমতো অসাধ্য সাধনের মতো কঠিন কাজ।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো এবং ইউনিভার্সিটি অব কানেকটিকাটের পতঙ্গবিদ ও এই গবেষণার সহ-লেখক রবার্ট কোলওয়েল এই চ্যালেঞ্জের কথা জানাতে গিয়ে একটি উদাহরণ দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আসল সমস্যাটা হলো, বেশির ভাগ পোকামাকড়ই বেশ দুর্লভ। আপনি যদি বিশাল কোনো এলাকা জুড়ে ফাঁদও পাতেন, তবুও নিত্যনতুন প্রজাতির দেখা পেতেই থাকবেন।’
পাশাপাশি, পোকামাকড় আকারে এতটাই ছোট হয় যে, তারা খুব সহজেই লোকচক্ষুর অন্তরালে নিজেদের বিশাল বিশাল কলোনি গড়ে তুলতে পারে, যেখানে পৌঁছানো বিজ্ঞানীদের জন্যও বেশ কঠিন।
কোস্টারিকার একটি জঙ্গলে তারা টানা ৬৯ ট্র্যাপ-ইয়ার (ফাঁদ পাতার একটি বিশেষ পরিমাপ) ধরে ফাঁদ পেতে প্রায় ১৬ লাখ পোকামাকড় সংগ্রহ করেছিলেন। এত বিশাল আয়োজনের পরও তারা নিশ্চিত ছিলেন, ওই জঙ্গলের অনেক পতঙ্গই তাদের ফাঁদে ধরা পড়েনি। বিজ্ঞানীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটা এখানে এটা নয় যে তারা কী কী দেখলেন, বরং আসল চ্যালেঞ্জ হলো তারা ঠিক কতটা জিনিস মিস করে গেলেন, তার নিখুঁত পরিসংখ্যান বের করা।
এই ধাঁধার জট খুলতে রবার্ট কোলওয়েল, ইউনিভার্সিটি অব কেনটাকির ইমেরিটাস অধ্যাপক মাইকেল শার্কি এবং কর্নেল ইউনিভার্সিটির জীববৈচিত্র্য বিজ্ঞানী লরা মেলিসা গুজমান একটি বিশেষ পথ বেছে নেন। তারা মাইক্রোগ্যাস্ট্রিনি নামে পরাশ্রয়ী বোলতার একটি উপগোষ্ঠীর ওপর গভীর মনোযোগ দেন। এই বোলতাদের জীবনচক্র প্রকৃতির এক অদ্ভুত ও ভয়ংকর রূপের নিদর্শন। এরা অন্য শুঁয়োপোকার শরীরের ভেতর নিজেদের ডিম পেড়ে আসে। ডিম ফুটে লার্ভা বের হওয়ার পর তারা সেই জীবন্ত শুঁয়োপোকার ভেতরের অংশ খেয়েই বড় হতে থাকে এবং একসময় শুঁয়োপোকাটির শরীর ফুঁড়ে পূর্ণাঙ্গ বোলতা হিসেবে বেরিয়ে আসে। কোস্টারিকার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এরিয়া দে কনজারভেশন গুয়ানাকাস্টে পাওয়া এই বোলতাগুলো নিয়েই বিজ্ঞানীরা তাদের মহাযজ্ঞ শুরু করেন।
ডিম ফুটে লার্ভা বের হওয়ার পর বোলতারা সেই জীবন্ত শুঁয়োপোকার ভেতরের অংশ খেয়েই বড় হতে থাকে এবং একসময় শুঁয়োপোকাটির শরীর ফুঁড়ে পূর্ণাঙ্গ বোলতা হিসেবে বেরিয়ে আসে।
উড়ন্ত এই পতঙ্গগুলোকে বিজ্ঞানীরা একধরনের পরিমাপক কাঠি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, যাতে তারা বুঝতে পারেন তাদের অন্যান্য ফাঁদগুলো ঠিক কতটা অসম্পূর্ণ। তারা তিন ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। প্রথম দুটি ছিল তাঁবুর মতো দেখতে ম্যলেইজ ট্র্যাপ। এর একটি জঙ্গলের একেবারে কেন্দ্রে এবং অন্যটি প্রান্তসীমার দিকে বসানো হয়েছিল। আর তৃতীয় পদ্ধতিটি ছিল সরাসরি শুঁয়োপোকা সংগ্রহ করে ল্যাবে নিয়ে আসা এবং সেখান থেকে কোন প্রজাতির বোলতা জন্ম নিচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা।
এই তিন পদ্ধতির তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা কয়েকটি পরিসংখ্যানগত মডেল দাঁড় করান, যার মাধ্যমে তারা হিসাব করেন, আবিষ্কৃত বোলতার তুলনায় ঠিক কত সংখ্যক বোলতা এখনো লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে গেছে। এই মডেল থেকেই বেরিয়ে আসে সেই চমকপ্রদ তথ্য, আমাদের হিসাবের বাইরে আরও অন্তত ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ প্রজাতির পতঙ্গ পৃথিবীতে লুকিয়ে আছে।
বিজ্ঞানী লরা মেলিসা গুজমান জানিয়েছেন, এই অজানা প্রজাতিগুলোর বেশির ভাগই আকারে খুব ছোট, বিরল এবং অত্যন্ত বিশেষায়িত। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, একই জঙ্গলের ভেতর ফাঁদ পাতার পরও তাদের খুঁজে পাওয়া ৭৫ শতাংশ পরাশ্রয়ী বোলতা কেবল তিনটি পদ্ধতির যেকোনো একটিতেই ধরা পড়েছিল। অর্থাৎ, এদের আচরণ ও বাসস্থান এতটাই নির্দিষ্ট যে, কেবল এক ধরনের ফাঁদ পাতলে এদের অস্তিত্ব টেরই পাওয়া যাবে না।
মানুষের নানা খামখেয়ালিপনার কারণে বিশ্বজুড়ে দ্রুত হারে পোকামাকড় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এই বিশাল সংখ্যার অনুমান বিজ্ঞানীদের বাকি পতঙ্গগুলোকে রক্ষা করার কাজে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করবে।
গুজমানের মতে, এদের অনেকেই হয়তো অন্য পোকার শরীরে নিজেদের জীবনচক্র শেষ করে। অর্থাৎ, এরা এমন এক খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ, যার সম্পর্কে মানুষের এখনো কোনো ধারণাই নেই। আবার কিছু পোকা হয়তো জঙ্গলের একদম মগডালে বা ক্যানোপিতে বাস করে, যেখানে বিজ্ঞানীদের পৌঁছানোর সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।
পৃথিবীর সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় প্রাণীগোষ্ঠী এই পোকামাকড়ের সংখ্যা যদি অনুমানের চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেশি হয়, তবে তা আমাদের জীববৈচিত্র্য নিয়ে এত দিনের জানাশোনাকে পুরোপুরি বদলে দেবে। মানুষের নানা খামখেয়ালিপনার কারণে বিশ্বজুড়ে দ্রুত হারে পোকামাকড় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। নতুন এই বিশাল সংখ্যার অনুমান বিজ্ঞানীদের বাকি পতঙ্গগুলোকে রক্ষা করার কাজে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করবে। গুজমানের মতে, ‘কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব সম্পর্কে না জানলে আমরা তাকে রক্ষা করতে পারব না। তাই আমাদের এই সুন্দর গ্রহের জীববৈচিত্র্যকে বুঝতে হলে, ঠিক কতগুলো প্রাণী এখানে বাস করে, তা জানাটা সবচেয়ে বেশি জরুরি।’