বাংলাদেশে ক্যানসারের চিকিৎসায় প্রতিবন্ধকতা এবং সম্ভাবনা - ৩

ক্যানসার মানেই যেন মৃত্যুভয়! প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ অকালে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঘাতক ব্যাধির ছোবলে। কিন্তু এই ক্যানসার কোনো আধুনিক যুগের রোগ নয়? ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আজ থেকে প্রায় ১৭ লাখ বছর আগেও পৃথিবীতে ক্যানসারের অস্তিত্ব ছিল! এত প্রাচীন একটি রোগকে আমরা আজও কেন পুরোপুরি বশে আনতে পারলাম না? সর্বোপরি, কীভাবে দৈনন্দিন ছোট ছোট সতর্কতা আমাদের এই মৃত্যুর ফাঁদ থেকে বাঁচাতে পারে?

আমাদের শরীরে বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার

১. ফুসফুসের ক্যানসার

আমাদের শরীরে ফুসফুসের ক্যানসারই সবচেয়ে বেশি দেখতে পাওয়া যায়। এটি সব থেকে বেশি প্রতিরোধযোগ্য একটি ক্যানসারও বটে। এর মূল কারণ ধূমপান। আপনি যত দীর্ঘ সময় ধূমপান করুন না কেন, যেকোনো সময়ে ধূমপান ছেড়ে দেওয়া আপনার ক্যানসারের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। একজন অধূমপায়ী ব্যক্তি যদি ধূমপায়ীর সংস্পর্শে থাকেন, তবে পরোক্ষ ধূমপানের কারণে তাঁরও ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক গুণ বেড়ে যায়। ফুসফুসে ক্যানসারের লক্ষণ হলো দীর্ঘস্থায়ী কাশি, কাশিতে রক্ত, বুকের এক পাশে ব্যথা এবং শ্বাস নিতে অসুবিধা। এ ছাড়া অন্যান্য কারণের মধ্যে আছে ট্রাক থেকে বের হওয়া ডিজেলের ধোঁয়া, কারখানার ধোঁয়া এবং রান্নার চুলার ধোঁয়া।

২. মলাশয় বা কোলন ক্যানসার

অন্ত্র বা পরিপাকতন্ত্রের নিচের অংশে মলাশয় এবং মলদ্বার অবস্থিত। পরিবারের কারও এই ক্যানসার থাকলে আপনার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অন্ত্রের আলসার বা ঘা থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। যারা প্রতিদিন তাজা ফলমূল, শাকসবজি, পূর্ণ দানা এবং আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে এই ক্যানসার কম দেখা দেয়। এর লক্ষণ হলো, কালো বা রক্তযুক্ত মল, তলপেটে ব্যথা, মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন এবং রক্তস্বল্পতা ও দুর্বলতা। শুরুতে এই ক্যানসার শনাক্ত হলে কেমোথেরাপি বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নিরাময় সম্ভব। প্রয়োজনে কৃত্রিম মলাশয় স্থাপন করা হতে পারে।

আরও পড়ুন
যারা প্রতিদিন তাজা ফলমূল, শাকসবজি, পূর্ণ দানা এবং আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে মলাশয় বা কোলন ক্যানসার ক্যানসার কম দেখা দেয়।

৩. জরায়ুমুখের ক্যানসার

জরায়ুমুখের ক্যানসার ধীরগতিতে বৃদ্ধি পায়। যৌন সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ানো এইচপিভি ভাইরাসের কারণেই মূলত এটি হয়। টিকার মাধ্যমে এই ক্যানসার পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব। এইচআইভি আক্রান্ত নারীদের এই ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। শুরুতে এর কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। পরে অসময়ে যোনিপথ থেকে রক্তপাত এবং পিঠের নিম্নাংশে প্রচণ্ড ব্যথা হতে পারে। ভিনেগার পরীক্ষা, প্যাপ স্মিয়ার এবং এইচপিভি পরীক্ষার মাধ্যমে এটি শনাক্ত করা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ক্রায়োথেরাপি (বরফ শীতল করে কোষ ধ্বংস) বা এলইইপি পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। ক্যানসার অগ্রসর পর্যায়ে থাকলে জরায়ু অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে।

৪. মূত্রথলির ক্যানসার

মূত্রথলির ক্যানসারের মূল তিনটি কারণ হলো ধূমপান, বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শ এবং সিস্টোসোমিয়াসিস সংক্রমণ। মূত্রের সঙ্গে রক্ত, বারবার প্রস্রাবের বেগ এবং পিঠের নিচের দিকে ব্যথা এর লক্ষণ। টিউমার বা মূত্রথলির ক্যানসার আক্রান্ত অংশটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করে চিকিৎসা করা হয়। অনেক সময় কেমোথেরাপিও ব্যবহার করা হয়।

যকৃতের ক্যানসারে পেটের ডান দিকের ওপরের অংশে ব্যথা, পেট ফুলে ওঠা এবং চরম ক্লান্তি হতে পারে
ছবি: রজওয়েল পার্ক কমপ্রিহেনসিভ ক্যানসার সেন্টার

৫. যকৃত বা লিভার ক্যানসার

যকৃতের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। হেপাটাইটিস ভাইরাস বা অ্যালকোহলের কারণে সৃষ্ট সিরোসিস থেকে এই ক্যানসার হতে পারে। এটি পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এই ক্যানসারে ত্বক ও চোখের রং হলুদ হয়ে যায়। পেটের ডান দিকের ওপরের অংশে ব্যথা, পেট ফুলে ওঠা এবং চরম ক্লান্তি হতে পারে। হেপাটাইটিস বি টিকা গ্রহণ এবং অ্যালকোহল বর্জন করে এই ক্যানসার অনেকাংশে প্রতিরোধ করা যায়।

আরও পড়ুন
যকৃতের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। হেপাটাইটিস ভাইরাস বা অ্যালকোহলের কারণে সৃষ্ট সিরোসিস থেকে এই ক্যানসার হতে পারে।

৬. স্তন ক্যানসার

নারীরা সবচেয়ে বেশি স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি শনাক্ত করা গেলে শতভাগ সফল চিকিৎসা সম্ভব। স্তনের ত্বকের নিচে শক্ত, ব্যথামুক্ত ও অসমতল মাংসপিণ্ড বা দলা অনুভব করা এই ক্যানসারের লক্ষণ। বায়োপসি বা ম্যামোগ্রাফির মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা যায়। নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, শিশুকে বুকের দুধ পান করানো এবং ধূমপান পরিহার স্তন ক্যানসার থেকে সুরক্ষা দেয়।

৭. পাকস্থলী বা খাদ্যনালির ক্যানসার

আলসার সৃষ্টিকারী এইচ. পাইলোরি (H. Pylori) নামে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে সাধারণত পাকস্থলীর ক্যানসার হয়। অতিরিক্ত লবণ মাখানো সংরক্ষিত খাবার, প্রক্রিয়াজাত লাল মাংস এবং ভাজা খাবার এর ঝুঁকি বাড়ায়।

এইচ. পাইলোরি ব্যাকটেরিয়া
ছবি: উইকিপিডিয়া

৮. প্রোস্টেট ক্যানসার

৫০-৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী পুরুষদের মধ্যে প্রোস্টেট ক্যানসার বেশি দেখা যায়। এটি খুব ধীরগতিতে বৃদ্ধি পায়। প্রস্রাবের প্রবাহ শুরু বা বন্ধ করতে সমস্যা, রাতে বারবার প্রস্রাবের বেগ, প্রস্রাবে বা বীর্যে রক্ত এবং পিঠের নিচের দিকে তীব্র ব্যথা হলে বুঝতে হবে এই ক্যানসার হতে পারে। রক্তে পিএসএ পরীক্ষার মাধ্যমে এটি শনাক্ত করা যায়।

আরও পড়ুন
আলসার সৃষ্টিকারী এইচ. পাইলোরি নামে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে সাধারণত পাকস্থলীর ক্যানসার হয়। অতিরিক্ত লবণ মাখানো সংরক্ষিত খাবার, প্রক্রিয়াজাত লাল মাংস এবং ভাজা খাবার এর ঝুঁকি বাড়ায়।

৯. ত্বকের ক্যানসার

হালকা রঙের ত্বকের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি সচরাচর দেখা যায়। এর দুটি প্রধান ধরন রয়েছে—নন-মেলানোমা এবং মেলানোমা। এর মধ্যে প্রথমটি সহজেই নিরাময়যোগ্য। তবে দ্বিতীয়টি মারাত্মক ও দ্রুত বর্ধনশীল। রোদ থেকে বাঁচতে টুপি ও ফুলহাতা পোশাক ব্যবহার করলে ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি কমে।

১০. ক্যাপোসিস সারকোমা

এটি একধরনের ত্বকের ক্যানসার। এইচআইভি বা এইডস আক্রান্ত ব্যক্তিদের এটি বেশি হয়। এতে মুখের ভেতরে বা দেহের যেকোনো জায়গায় ব্যথামুক্ত লাল, বাদামি বা বেগুনি রঙের ছোপ ছোপ কালশিটে দাগ দেখা যায়। অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ড্রাগ দিয়ে এর চিকিৎসা করা হয়।

লেখক: চিকিৎসক ও বিজ্ঞান লেখক, মাগুরা সদর হাসপাতাল, মাগুরা।

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান, 

ডেভিডসনস ক্লিনিক্যাল মেডিসিন, 

জার্নালস অব আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটি

সিদ্ধার্থ মুখার্জি/দ্য এম্পারর অব অল ম্যালাডিজ

আরও পড়ুন