বাংলাদেশে ক্যানসারের চিকিৎসায় প্রতিবন্ধকতা ও সম্ভাবনা - ১

ক্যানসার মানেই যেন মৃত্যুভয়! প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ অকালে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঘাতক ব্যাধির ছোবলে। কিন্তু এই ক্যানসার কোনো আধুনিক যুগের রোগ নয়? ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আজ থেকে প্রায় ১৭ লাখ বছর আগেও পৃথিবীতে ক্যানসারের অস্তিত্ব ছিল! এত প্রাচীন একটি রোগকে আমরা আজও কেন পুরোপুরি বশে আনতে পারলাম না? সর্বোপরি, কীভাবে দৈনন্দিন ছোট ছোট সতর্কতা আমাদের এই মৃত্যুর ফাঁদ থেকে বাঁচাতে পারে?

বেশ কয়েক দিন ধরেই আপনার খাবারের রুচি একেবারেই চলে গেছে। কোনো খাবারেই আগ্রহ পাচ্ছেন না। আপনার এমন অবস্থা দেখে বাসায় আজ বিরিয়ানি রাঁধা হয়েছে। কারণ বাসার মানুষ জানেন, দুনিয়ার সবকিছু একদিকে, আর আপনার প্রিয় বিরিয়ানি আরেক দিকে। কিন্তু আজ সেই প্রিয় বিরিয়ানিতেও যেন আপনার অরুচি! এটাও কি সম্ভব?

প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতায় এখন দিনের বেশির ভাগ সময় আপনার বিছানায় কাটে। আয়নার সামনে চুল আঁচড়াতে গিয়ে লক্ষ করলেন, মুঠো মুঠো চুল যেন উঠে আসছে! হাতে-পায়ে, গলায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুটি গুটি কী সব দেখা যাচ্ছে!

ক্যানসারের কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশের লসিকাগ্রন্থিতে এমন ফোলা থাকতে পারে

আপনার শরীরের এমন অবস্থা দেখে বাসার মানুষ একজন নামকরা চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি আপনার লক্ষণগুলো শুনে প্রয়োজনীয় কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দিলেন। সেগুলোর ভেতরে কয়েকটি আবার বেশ সময়সাপেক্ষ, রিপোর্ট আসতে কদিন দেরি হতে পারে। আপনি প্রচণ্ড মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ে রিপোর্টের জন্য এই দুর্বিষহ দিনগুলোয় অপেক্ষা করলেন।

আরও পড়ুন
ঐতিহাসিক নথিপত্র অনুসারে, আমাদের জানা সবচেয়ে প্রাচীন ক্যানসারের যে নমুনা পাওয়া যায়, সেটি প্রায় ১৭ লাখ বছরের পুরোনো!

কদিন পর রিপোর্ট এলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। সবকিছু দেখে তিনি গম্ভীর মুখে জানালেন, আপনার ক্যানসার হয়েছে! অতিদ্রুত কেমোথেরাপি না নিলে হয়তো অল্প কিছুদিনের ভেতর আপনার মৃত্যু হবে! এভাবেই বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার মানুষের অকালমৃত্যু ঘটাচ্ছে, একেকটি পরিবারকে শেষ করে দিচ্ছে। ক্যানসারের ব্যয়বহুল চিকিৎসা করাতে গিয়ে বহু মানুষ নিঃস্ব হয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। আমরা অকালে আমাদের প্রিয়জনদের হারাচ্ছি।

ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি তিনজনের একজন মারাত্মক এবং ঝুঁকিপূর্ণ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। প্রতি চারজনে একজন ক্যানসারে মৃত্যুবরণ করে। সেই প্রাচীনকাল থেকেই ক্যানসারের অস্তিত্ব এই পৃথিবীতে রয়েছে।

২২৫০ বছরের পুরোনো মানুষের মমির শরীরে বিজ্ঞানীরা ক্যানসারের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন
ছবি: রিসার্চ ডটঅর্গ

ঐতিহাসিক নথিপত্র অনুসারে, আমাদের জানা সবচেয়ে প্রাচীন ক্যানসারের যে নমুনা পাওয়া যায়, সেটি প্রায় ১৭ লাখ বছরের পুরোনো! এখন প্রশ্ন হলো, এত প্রাচীন একটা রোগকে কেন আমরা আজও বশে আনতে পারলাম না?

আরও পড়ুন
ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি তিনজনের একজন মারাত্মক এবং ঝুঁকিপূর্ণ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। প্রতি চারজনে একজন ক্যানসারে মৃত্যুবরণ করে।

ইতিহাসের পাতায় ক্যানসার

পৃথিবীজুড়ে ক্যানসার নামে এক ভয়াবহ ব্যাধি বিস্তার লাভ করেছে। এই ঘাতক ব্যাধির ছোবলে প্রতিমুহূর্তে হারিয়ে যাচ্ছে শত-সহস্র সম্ভাবনাময় প্রাণ। হৃদ্‌রোগজনিত জটিলতার পরেই এই ক্যানসারই আধুনিক সময়ে মানুষের সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর কারণ।

শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই বসবাসকারী পুরুষদের অর্ধেক এবং নারীদের এক-তৃতীয়াংশ ক্যানসারের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তৃতীয় বিশ্বে সংখ্যাটা হয়তো আরও অনেক বেশি। এখানকার বেশির ভাগ মানুষই হাসপাতালে গিয়ে ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

অনেকেই বলেন, ক্যানসার আসলে বর্তমান সময়ের। তবে ক্যানসারের ইতিহাসটা কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীন মিসরের হাজার বছরের পুরোনো বেশ কিছু মমির হাড়েও পাওয়া গেছে ক্যানসারের অস্তিত্ব। চিলির আতাকামা মরুভূমিতে মমি হয়ে যাওয়া লাশের হাড়েও মিলেছে অস্টিওসারকোমা’র (হাড়ের ক্যানসার) চিহ্ন।

কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধিকেই সাধারণভাবে ক্যানসার বলা হয়
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

এমনকি খ্রিষ্টপূর্ব ১৬০০ অব্দের দলিল-দস্তাবেজে উল্লেখিত অদ্ভুত কিছু রোগের লক্ষণ দেখে গবেষকেরা নিশ্চিত হয়েছেন, ক্যানসার সেই আমলেও ছিল। গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাসের ৪৪০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের লেখা থেকে জানা যায়, পারস্যের এক প্রচণ্ড ক্ষমতাশালী রানি স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন রোগের একটি হলো এই ক্যানসার। মানুষ কিংবা অন্যান্য প্রাণীর গঠনের মূল একক কোষ। এই কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধিকেই সাধারণভাবে ক্যানসার বলা হয়। ইটের পর ইট সাজিয়ে যেমন দালান তৈরি হয়, ঠিক তেমনিভাবে কোষের পর কোষ দিয়ে আমাদের এই মানবদেহের কাঠামো তৈরি হয়। একটি কোষ থেকেই তৈরি হয় আরেকটি কোষ। সুস্থ সাধারণ মানবদেহে এই প্রক্রিয়াটি সুচারুভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ন্ত্রিত পরিবর্তন ঘটলে ক্যানসারের আশঙ্কা হাজার গুণ বেড়ে যায়।

আরও পড়ুন
মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন রোগের একটি হলো এই ক্যানসার। মানুষ কিংবা অন্যান্য প্রাণীর গঠনের মূল একক কোষ। এই কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধিকেই সাধারণভাবে ক্যানসার বলা হয়।

ক্যানসার ও টিউমার

দেহের বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ কোনো অংশে এই ধরনের অনিয়ন্ত্রিত কোষের বৃদ্ধি হলে সেটি টিউমার হিসেবে আমাদের চোখে ধরা দেয়। ক্যানসার শব্দটির উৎপত্তির সঙ্গেও তাই জড়িয়ে আছে টিউমারের নাম।

ক্যানসার শব্দের উৎপত্তি গ্রিক শব্দ Karkinos থেকে। এর অর্থ কাঁকড়া। মানবদেহ থেকে টিউমার কেটে সরানোর পর তা দেখতে অনেকটা কাঁকড়ার মতো মনে হয়েছিল বলেই এমন নাম দেওয়া হয়েছিল। মানবদেহে এটি একবার বিস্তার লাভ করলে কাঁকড়ার মতোই আটকে থাকে। ফলে এই নাম দেওয়া অনেকটাই সার্থক হয়েছে।

পরে কালক্রমে কার্সিনোমা শব্দটি দিয়ে টিউমারকে বোঝানো হতো। আর এই কার্সিনোমা শব্দটি থেকেই ক্যানসার শব্দের উৎপত্তি। কিন্তু টিউমার ও ক্যানসারের মধ্যেও রয়েছে অনেক পার্থক্য।

বিভিন্ন প্রভাবকের কারণে আমাদের শরীরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে ওঠা ক্যানসার কোষ

টিউমারকে সাধারণত দুভাবে ভাগ করা যায়—বিনাইন টিউমার ও ম্যালিগন্যান্ট টিউমার। বিনাইন প্রাথমিক পর্যায়ের টিউমার। এটি শরীরের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে, সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে না। এ ধরনের টিউমারকে অপারেশন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের মাধ্যমে সারিয়ে তোলা সম্ভব। তবে ম্যালিগন্যান্ট টিউমারের উৎপত্তিস্থল থেকে তার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে ধীরগতিতে হলেও পরে দাবানলের মতো দেহের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে মেটাস্ট্যাসিস বলা হয়। এক কোষ থেকে আরেক কোষ হয়ে মানবদেহের এক অংশ থেকে আরেক অংশে ক্যানসারের কোষগুলো রক্ত এবং লসিকার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন
বিনাইন টিউমার শরীরের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে, সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে না। এ ধরনের টিউমারকে অপারেশন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের মাধ্যমে সারিয়ে তোলা সম্ভব।

কিছু কিছু টিউমারের নাম শুনতে বিনাইন মনে হলেও সেগুলো আসলে ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যানসারাস। যেমন মেসোথেলিওমা, মেলানোমা, লিম্ফোমা, সেমিনোমা, ডিসজার্মিনোমা ইত্যাদি।

প্রতিবার কোষ বিভাজনের সময় নতুন তৈরি হওয়া ক্যানসার কোষের কয়েকটি আগের কোষগুলো থেকে জিনগতভাবে আলাদা হয়ে যায়। এর মাধ্যমে প্রতিবার বিভাজনের ফলে বিচিত্র ধরনের ক্যানসার কোষ তৈরি হয়। ক্যানসার কোষের এই অসাধারণ জিনগত বৈচিত্র্যের কারণেই কেমোথেরাপির মাধ্যমেও একে ধ্বংস করা খুব কঠিন।

তবে ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য প্রাচীনকাল থেকেই সার্জনরা বেছে নিয়েছেন বিভিন্ন ধরনের অপারেশন। সুনিপুণ দক্ষতায় টিউমারকে কেটে বাদ দিয়ে তা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে, এমন চিন্তা থেকেই শুরু হয় টিউমার অপারেশন। কিন্তু অ্যানেসথেসিয়া (রোগীকে অজ্ঞান করতে ব্যবহৃত ওষুধ) এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে অপারেশনের পরে রোগী কিছু ক্ষেত্রে টিউমার থেকে মুক্তি পেলেও অপারেশন-পরবর্তী নানা জটিলতায় ভুগে মারা যেতেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে অ্যানেসথেসিয়া এবং অ্যান্টিবায়োটিক অপারেশনে অভূতপূর্ব সাফল্য আনে। কিন্তু তারপরেও শুধু অপারেশন করে ক্যানসার নির্মূল করা সম্ভব হয়নি, কারণ ক্যানসার সৃষ্টির পেছনের কারণটা তখনো ভালো করে জানা যায়নি।

লেখক: চিকিৎসক ও বিজ্ঞান লেখক, মাগুরা সদর হাসপাতাল, মাগুরা।

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান, 

ডেভিডসনস ক্লিনিক্যাল মেডিসিন, 

জার্নালস অব আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটি

সিদ্ধার্থ মুখার্জি/দ্য এম্পারর অব অল ম্যালাডিজ

আরও পড়ুন