ব্যায়াম করলেই কাবু হবে ক্যানসার!
ক্যানসার রোগীদের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে চিকিৎসকরা বরাবরই ব্যায়াম করার পরামর্শ দিয়ে আসছেন। শরীর ফিট থাকলে রোগীরা মানসিকভাবে ভালো বোধ করেন, দৈনন্দিন কাজকর্মেও গতি পান। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত ব্যায়ামকে কখনোই ক্যানসারের চিকিৎসা হিসেবে গণ্য করা হতো না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ধারণাটা ছিল, ক্যানসার হঠাতে হলে সার্জারি, রেডিয়েশন থেরাপি বা কড়া ওষুধের কোনো বিকল্প নেই।
তবে দিন বদলাচ্ছে। কানাডার অ্যালবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাইনসিওলজির১ অধ্যাপক কেরি কর্নিয়া শোনাচ্ছেন নতুন আশার বাণী। এ বছর বেশ কিছু জোরালো প্রমাণ মিলেছে যে, নিয়মিত ব্যায়াম করলে ক্যানসার রোগীদের বেঁচে থাকার সময় বাড়ে এবং রোগ ফিরে আসার ঝুঁকি কমে। অধ্যাপক কর্নিয়ার মতে, ‘বর্তমানে আমরা রোগীদের যেসব ওষুধ দিচ্ছি, ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যায়াম অনেকটা সেগুলোর মতোই। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও ভালো কাজ করে’।
কেরি কর্নিয়ার নেতৃত্বে কোলন ক্যানসার রোগীদের ওপর একটি বিশাল গবেষণা চালানো হয়। সেই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয় নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন নামে একটি জার্নালে। এই গবেষণায় ৮০০-এর বেশি রোগী অংশ নেন। তাদের স্টেজ ৩ এবং উচ্চ-ঝুঁকির স্টেজ ২ ক্যানসার ছিল। তাদের কাউকে শুধু শারীরিক পরিশ্রম সম্পর্কে নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছিল, আবার কাউকে দেওয়া হয়েছিল সুনির্দিষ্ট ব্যায়ামের রুটিন।
অধ্যাপক কর্নিয়ার মতে, ‘বর্তমানে আমরা রোগীদের যেসব ওষুধ দিচ্ছি, ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যায়াম অনেকটা সেগুলোর মতোই। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও ভালো কাজ করে’।
ফলাফল ছিল চমকে দেওয়ার মতো। ১০ বছর ধরে পর্যবেক্ষণের পর দেখা গেছে, যারা নিয়মিত রুটিন মেনে ব্যায়াম করেছেন, তাদের ক্যানসার ফিরে আসা, নতুন করে ক্যানসার হওয়া বা মৃত্যুর ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় ২৮ শতাংশ কমে গেছে!
আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজির সম্মেলনে যখন এই গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়, তখন উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানান। তবে সুখবর এখানেই শেষ নয়। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৯০ হাজারের বেশি ক্যানসার জয়ী মানুষের ওপর চালানো একটি দীর্ঘমেয়াদী সমীক্ষায় আরও বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে।
স্তন, প্রোস্টেট, কোলন, ফুসফুস, কিডনিসহ ১০ ধরনের ক্যানসার রোগীদের ওপর চালানো এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, রোগ ধরা পড়ার পর যারা মাঝারি থেকে ভারী ব্যায়াম করেছেন, তারা দীর্ঘদিন বেঁচে আছেন। সপ্তাহে ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি গতির ব্যায়াম করলে সবচেয়ে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।
প্রোস্টেট, কোলন, ফুসফুস, কিডনিসহ ১০ ধরনের ক্যানসার রোগীদের ওপর চালানো এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, রোগ ধরা পড়ার পর যারা মাঝারি থেকে ভারী ব্যায়াম করেছেন, তারা দীর্ঘদিন বেঁচে আছেন।
ব্যায়াম করলে শরীরের ভেতরে এমন কী জাদুর ছোঁয়া লাগে যে মরণব্যাধি ক্যানসারও পিছু হটে? এর পেছনে বিজ্ঞানীরা কয়েকটি কারণ খুঁজে পেয়েছেন:
১. ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণ: ব্যায়াম করলে শরীরের কোষগুলো ইনসুলিন হরমোনকে সহজে গ্রহণ করতে পারে। শরীরে ইনসুলিন ঠিকঠাক কাজ না করলে শরীর আরও বেশি ইনসুলিন তৈরি করতে থাকে। এতে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি ও বিভাজনে জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। ব্যায়াম এই প্রক্রিয়াটি রুখে দেয়।
২. মায়োকাইনসের প্রভাব: পেশি থেকে মায়োকাইনস নামে একধরনের প্রোটিন নিঃসৃত হয়। ল্যাবরেটরিতে দেখা গেছে, রক্তে মায়োকাইনসের মাত্রা বেশি থাকলে তা প্রোস্টেট ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি কমিয়ে দেয়। ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র আধা ঘণ্টা ভারী ব্যায়াম করলেই শরীরে মায়োকাইনসের মাত্রা বেড়ে যায়।
৩. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জাগরণ: ডেনমার্কের সেন্টার ফর ক্যানসার ইমিউন থেরাপির ইমিউনোলজিস্ট স্ট্রাটেন জানান, ‘ব্যায়াম আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে জাগিয়ে তোলে।’ ইঁদুরের ওপর চালানো পরীক্ষায় দেখা গেছে, ব্যায়ামের ফলে টিউমারের ভেতরে ইমিউন কোষের আনাগোনা বেড়ে যায় এবং টিউমারের বৃদ্ধি ৬০ শতাংশেরও বেশি কমে যায়। ব্যায়ামের সময় ন্যাচারাল কিলার সেল এবং টি-সেলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে, যা ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে ওস্তাদ।
পেশি থেকে মায়োকাইনস নামে একধরনের প্রোটিন নিঃসৃত হয়। ল্যাবরেটরিতে দেখা গেছে, রক্তে মায়োকাইনসের মাত্রা বেশি থাকলে তা প্রোস্টেট ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি কমিয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নামমাত্র হাত-পা নাড়লেই হবে না, হৃৎস্পন্দন বা হার্টবিট বাড়িয়ে দেয় এমন ব্যায়াম করতে হবে। স্ট্রাটেনের মতে, ইমিউন সিস্টেমকে উদ্দীপ্ত করতে হৃৎস্পন্দন বাড়ানো জরুরি।
কোলন ক্যানসারের গবেষণায় রোগীরা তাদের পছন্দমতো ব্যায়াম বেছে নিয়েছিলেন, তবে তাদের নিয়মিত তত্ত্বাবধান বা গাইড করা হয়েছিল। অধ্যাপক কর্নিয়া বলেন, ‘কাউকে শুধু ব্যায়াম করতে উপদেশ দিয়ে ছেড়ে দিলে হবে না, তারা যাতে সেটা নিয়মিত চালিয়ে যান, সেই সহায়তাও দিতে হবে’।
দিন শেষে কথা একটাই, ক্যানসার চিকিৎসায় এখন আর শুধু কেমোথেরাপি বা সার্জারিই শেষ কথা নয়। অনেক ক্যানসার সেন্টার এখন চিকিৎসার পাশাপাশি ব্যায়ামের রুটিন ও সহায়তা দেওয়াকে চিকিৎসার মানদণ্ড হিসেবে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে।